kalerkantho


মালয়েশিয়া থেকেই স্লিপার সেল নিয়ন্ত্রণ করত রানা

পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মালয়েশিয়া থেকেই স্লিপার সেল নিয়ন্ত্রণ করত রানা

গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রেদোয়ানুল আজাদ রানা মালয়েশিয়ায় থেকেই নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) স্লিপার সেল নিয়ন্ত্রণ করত। এ স্লিপার সেলের সদস্যরাই রাজীব হত্যার পর লেখক অভিজিৎ রায়সহ অন্তত ১১টি হত্যা ও হামলা চালায়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রানার কাছ থেকে এবং তার ল্যাপটপ থেকে এ ধরনের তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। গ্রেপ্তারের পর রানাকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এক মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে সিটিটিসি।  

গত সোমবার রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম এলাকা থেকে রানা ও তার সহযোগী আশরাফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। সূত্র বলেছে, রানা জিজ্ঞাসাবাদে সিটিটিসিকে জানিয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে দেশে আল-কায়েদার মতাদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করছে এবিটি। বিদেশি জঙ্গিদের হয়ে বাংলাদেশে ভূমিকা রাখতেই মূলত এবিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সংগঠনটি শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে ইন্টারনেটে প্রচারকে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করে। ২০১৩ সালে একজন ব্লগারকে প্রথম হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তার অংশ হিসেবে ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পল্লবীতে রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়। এরপর এবিটি আলোচনায় আসে।

তারাও তা-ই চেয়েছিল। রাজীব হত্যার পর তারা অন্য ব্লগার, লেখক ও প্রকাশককে ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে। সংগঠনের সিদ্ধান্তে স্লিপার সেল গঠন করা হয়। রানার নেতৃত্বে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে স্লিপার সেল হত্যা মিশন শুরু করে।

রাজীবকে খুনের পর মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে রানা সিটিটিসিকে জানিয়েছে, ২০১৩ সালের শেষ দিকে ভুয়া পাসপোর্ট বানিয়ে মালয়েশিয়ায় যায় সে। তাকে মালয়েশিয়া পালিয়ে যেতে সংগঠনের কয়েকজন বড় ভাইয়ের পাশাপাশি বিমানবন্দর ও পাসপোর্ট অফিসের কিছু লোকজন সহযোগিতা করে।

এ বিষয়ে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখছেন। ইতিমধ্যে রানা এ ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।

সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় প্রায় চার বছর ধরে জঙ্গি তত্পরতা চালানোর বিষয়ে রানা সিটিটিসিকে বলেছে, মালয়েশিয়া থেকেও সে এবিটির স্লিপার সেলকে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের নির্দেশনা দিত। তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই এ পর্যন্ত ব্লগার, লেখকসহ ১১ জনকে হত্যা বা বিভিন্ন হামলা চালানো হয়। মালয়েশিয়া থেকে সে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে মালয়েশিয়ায় থেকেই সে দেশে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, চার বছর ধরে রানাকে খোঁজা হচ্ছিল। গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে ল্যাপটপ, পেনড্রাইভ, আইপ্যাডসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। ল্যাপটপ ও পেনড্রাইভে মিলেছে তার চার বছরের জঙ্গি তত্পরদার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিশেষ করে রাজীবসহ গত চার বছরে যে ১১ জন ব্লগার, লেখক ও প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে তার সব খবরই রানার জানা ছিল। তার কাছ থেকে বিশেষ করে রাজীব হত্যার আগে তার ও স্লিপার সেলের সদস্য নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাত ছাত্রকে নিয়ে প্রথম কবে বৈঠক করেছিল, হত্যা মিশনে কে কী ধরনের ভূমিকা পালন করবে, হত্যার পর তারা কিভাবে আত্মগোপনে থাকবে তার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ল্যাপটপ থেকে জানা গেছে এবিটির কার কার সঙ্গে রানার যোগাযোগ ছিল। ইন্টারনেটে সংগঠনের কোন কোন নেতার সঙ্গে সে যোগাযোগ রাখত, স্লিপার সেলের সদস্যদের কাকে কী ধরনের নির্দেশ দিত, এবিটির তাত্ত্বিক নেতা জসিম উদ্দিন রাহমানী ও চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার সঙ্গে কী ধরনের কথা হতো, পাকিস্তানে পলাতক এবিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ইজাজের সঙ্গে তার কী ধরনের সম্পর্ক ছিল, ২০১৪ সালে মালয়েশিয়া গিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল সে, এবিটির আরেক সদস্য অস্ট্রেলিয়ায় পলাতক থাকা জুন্ননের সঙ্গে যোগাযোগ করে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার তথ্যও জানা যাচ্ছে। ২০১৫ সালে এবিটি নিষিদ্ধ ঘোষণার পর শীর্ষ নেতাদের কে কোথায় ছিল সে বিষয়েও রানা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে। রিমান্ডে রানাকে আরো অনেক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

রিমান্ড : সিটিটিসি সূত্র জানিয়েছে, ব্লগার রাজীব হত্যা মামলায় রানাসহ দুজনকে উত্তরা পশ্চিম থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। অন্য আসামি হলো আশরাফুল ইসলাম। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকার মহানগর হাকিম মাজহারুল ইসলামের আদালতে রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয়। শুনানি  শেষে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামিরা উত্তরা পশ্চিম থানাধীন বায়তুল নূর মসজিদের সামনে জড়ো হয়ে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গোপন বৈঠকে করছিল। সেখান থেকে পরে অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজন পালিয়ে যায়। ২০১৩ সালে রাজীব খুন হওয়ার পর আসামি রানা মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যায়। সেখান থেকে দেশে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত সে। পালিয়ে যাওয়া আসামিদের গ্রেপ্তার ও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্যই আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।


মন্তব্য