kalerkantho


মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা

অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার প্রত্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার প্রত্যয়

ফুল হাতে গতকাল শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে লাখো মানুষ। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

হাজার হাজার মানুষের হাতে ফুলের অর্ঘ্য, বুকে কালো ব্যাজ। তাদের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসছিল ভাষার গান।

খালি পায়ে সারিতে ধীরগতিতে থেমে থেমে এগোলেও মুখে বিরক্তি প্রকাশ পায়নি কারোরই। শহীদ মিনারের কাছে যেতেই সবার চেহারায় প্রকাশ পায় শ্রদ্ধা-ভালোবাসার আরো বিনম্র ভাব। ফুলে ফুলে ভরা বেদিতে নিজের হাতে ফুলের ডালি নয়, যেন নিজের অন্তর নিংড়ানো অর্ঘ্য নিবেদন করছিল সবাই। রাতের স্তব্ধতা ভেঙে, রক্তঋণের টানে একুশের প্রথম প্রহরেই পুষ্পার্ঘ্য হাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় ছিল হাজার হাজার মানুষের। ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই পথে পথে ছিল প্রভাতফেরি। রাতভর জেগে নিজের বাসায় ফুলের মালা গেঁথে পথে নামে প্রবীণ, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী, এমনকি শিশুসন্তান নিয়ে দম্পতিও। শ্রদ্ধার ডালি নিয়ে তারা ভাষাশহীদদের জানায় অতল শ্রদ্ধা। রাত জেগে, প্রভাতফেরি করে এভাবে এত সময় নিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর দৃশ্য দেখে বিমোহিত ইতালি, ফ্রান্স, চীন, জাপান, ভারত, কোরিয়াসহ নানা দেশ থেকে আসা নানা বর্ণের নানা ভাষার মানুষ।

ইতালির নাগরিক ফ্রাংকো শামাসিসা ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন খালি পায়ে।

চোখ ছিল তাঁর শহীদ মিনারের দিকে। এত মানুষ আর কোথাও কি এভাবে শ্রদ্ধা জানায়! নিজেকে প্রশ্ন করে নিজেই বিস্মিত তিনি। জার্মানির জুলুইজ মাসখানেক আগে এসেছেন বাংলাদেশ ঘুরতে। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের দৃশ্য দেখে বললেন, ভাষার প্রতি এত শ্রদ্ধা আর কোনো জাতির নেই। ইতালির নাগরিক ফাদার জিওয়া ১০ বছর ধরে আছেন বাংলাদেশে। বাংলা ভাষাটা শিখে নিয়েছেন এখানে আসার আগেই। তাঁর ভাষায়, ‘বাংলা ভাষার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁদের জন্য আমি গর্বিত। আমি প্রতিবছর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে এখানে আসি। ’ ভারত থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে আসা ১৭ তরুণ ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিবেদন করে শ্রদ্ধা।

জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার প্রত্যয়ে গতকাল একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়েছে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধার অর্ঘ্য, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বর্ণমালার মেলাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। ঢাকার বাইরে রাজশাহীতে গড়ে তোলা হয় মানব শহীদ মিনার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও দিবসটি পালিত হয়েছে। ইউনেসকো এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে ‘বহুভাষায় শিক্ষা’। গতকাল মঙ্গলবার ছিল সাধারণ ছুটি। ভাষাশহীদদের স্মরণে অর্ধনমিত ছিল জাতীয় পতাকা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরসহ বিদেশে বাংলাদেশের সব মিশনেই বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিদের নির্মিত প্রতিটি শহীদ মিনারেও ভরে ওঠে মানুষের শ্রদ্ধার ফুল। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে এই প্রথম বাংলাদেশের একুশের প্রথম প্রহরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ভাষাপ্রেমীরা ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ভাস্কর্যে’ ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

আলোচনা অনুষ্ঠানে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করাসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বানও উচ্চারিত হয়। একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় পাঠ্য বই সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করার দাবিও। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে গতকাল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গতকাল রাজধানীর সব পথ যেন মিশেছিল শহীদ মিনারে। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, নীলক্ষেত, আজিমপুর ও পলাশী মোড়ে অবস্থান নেয় হাজার হাজার মানুষ। মধ্যদুপুর পর্যন্ত চলে শ্রদ্ধা নিবেদন। রোভার স্কাউট ও বিএনসিসি সদস্যরা শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে আলপনা তৈরি করে লেখে, ‘অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি’। মানুষের কালো পোশাকের সঙ্গে ছিল কালো ব্যাজ, কারো হাতে ছিল টগবগে লাল ফুলও। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি’—এই গানে মথিত হয়েছে চারপাশ। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শহীদ মিনারে নিবেদন করে বিনম্র শ্রদ্ধা। রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিল দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইশা। রাইশা বাবার কাছে গল্প শুনে নিজেই মালা তৈরি করে মিনারে এনেছিল।

কেন্দ্রীয় আয়োজনের পাশাপাশি সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পাড়া-মহল্লায় তৈরি স্থায়ী-অস্থায়ী শহীদ মিনারেও ভাষাশহীদদের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছে শ্রদ্ধাবনত জাতি।

একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বেদিতে ফুল দেন। পরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, ঢাকার দুই মেয়র, তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশপ্রধান এবং বিদেশি কূটনীতিকরা। শ্রদ্ধা জানান বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, অ্যাটর্নি জেনারেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। হুইলচেয়ারে বসে একদল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ভাষাশহীদদের প্রতি। পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে ১৪ দল, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, ফায়ার ব্রিগেড ও সিভিল ডিফেন্স, জাসদ সমর্থক ছাত্রলীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি শহীদ বেদিতে ফুল দেয়।

রাত ১টা ২৭ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষের মিছিল কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে রাখা হয় ওই সময়। তবে খালেদা জিয়া দলীয় নেতাদের নিয়ে শহীদ মিনারের মূল বেদিতে উঠে ফুল দেওয়ায় এ নিয়ে পরে অনেকে সমালোচনা করেন। কালো ব্যাজ বুকে নিয়ে খালেদা জিয়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে ফুল দিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

সিইসি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা ভোর সাড়ে ৫টার দিকে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বিচারপতিরা ফুল দিতে যান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের জাতীয় জীবনে মাঝে মাঝে কিছু বাধা আসে। আমরা এই বাধা মোকাবিলা করার প্রেরণা পাই একুশে থেকে। সেই দিন আমাদের ভাষাশহীদরা যে জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁদের সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করতে হবে। শুদ্ধ করে বাংলা ভাষাকে শিখতে হবে। ’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘ভাষা আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে তত দিন শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ দিবস পালন অব্যাহত থাকবে। ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের ধারণা রাখতে হবে এবং জানতে হবে, যার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম অতীত জেনে নিজেরা সমৃদ্ধ হবে। ’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, ‘একুশ আমাদের অহংকার, একুশ আমাদের চেতনা। এ চেতনা ধারণ করতে হবে আমাদের মাঝে। সেই সঙ্গে সঠিক বাংলা জানতে হবে এবং সর্বস্তরে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ে তুলতে হবে। ’

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো।

গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতিও হয়েছে।

একুশের প্রথম প্রহর থেকে গতকাল মধ্য দুপুর পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। দুপুর ১২টার দিকে শ্রদ্ধা জানান বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী ভ্রমণ দলের ১৭ জন সদস্য। অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে যায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।

বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা : এ ছাড়া শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, বাংলাদেশ জুড়িশিয়াল সার্ভিস কমিশন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, একুশে ল ইয়ার্স কাউন্সিল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবদল, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, বাসদ (মার্কসবাদী), ছায়ানট, খেলাঘর, ইসলামী ব্যাংক, আনসার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি আলিয়া মাদরাসা ঢাকা, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুল, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, বিসিএস কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তর, রেলপথ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা ও প্রকৌশল অধিদপ্তর, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউট, বদরুন্নেসা কলেজ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, জাতীয় জাদুঘর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ রাখাইন স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন, উর্দুভাষী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশসহ অসংখ্য ব্যক্তি ও সংগঠন।


মন্তব্য