kalerkantho


নতুন প্রজন্মের প্রতি প্রধানমন্ত্রী

ইংরেজি ঢঙে বাংলা বলা ছাড়তে হবে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ইংরেজি ঢঙে বাংলা বলা ছাড়তে হবে

বাংলা ভাষা ব্যবহারে শব্দের বানান ও উচ্চারণ যাতে সঠিকভাবে হয়, সে বিষয়ে সবাইকে আরো সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে  নতুন প্রজন্মের ইংরেজি ঢঙে বাংলা বলার প্রবণতা ছাড়াতে কী করা যায়, সেই পথ বের করতে শিক্ষাবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কথ্য ভাষা বলব, ঠিক আছে। দয়া করে আমাদের ভাষার যে প্রচলিত ধারা সেটাকে এভাবে বিকৃত করে বাংরেজি বলে ফেলছি; এটা যেন আর না হয়। এদিকে একটু বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। ’

ইংরেজি ঢঙে বাংলা বলার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এটা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে, যেন ওইভাবে কথা না বললে তাদের মর্যাদাই থাকে না। এই জায়গা থেকে আমাদের ছেলে-মেয়েদের বেরিয়ে আসতে হবে। যখন যেটা বলবে, সেটা সঠিকভাবে বলবে, সঠিকভাবে উচ্চারণ করবে, সঠিকভাবে ব্যবহার করবে।

ভাষাশহীদ দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে বাংলা শুদ্ধভাবে ব্যবহারের ওপর জোর দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় পাস করা শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভাইয়েরা জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়ে এই ভাষা আমাদের উপহার দিয়ে গেছে। এর মর্যাদা আমাদের রক্ষা করতে হবে। আমাদের ছেলে-মেয়েদের এই ভাষা শিখতে হবে। ’

প্রমিত বাংলার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্বও তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলার কথ্য ভাষায় বৈচিত্র্য আছে এবং সেটা থাকা উচিত। ’ এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে আঞ্চলিক উচ্চারণের প্রয়োগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, “জাতির পিতার সাতই মার্চের ভাষণ শোনেন, দেখবেন সেখানে গোপালগঞ্জের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আমি বাংলা বিভাগের ছাত্রী ছিলাম। বাংলা বিভাগের শিক্ষকরা বলতেন, ‘উনি এভাবে বললেন কেন?’ আমি বলতাম, ‘স্যার, উনি যখন কথা বলেন, জনগণের জন্য কথা বলেন। জনগণের জন্য সহজে উপলব্ধি করার মতো করেই তিনি বলতেন। ’”

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় ইউনেসকোর সহায়তার জন্য জাতিসংঘ সংস্থাটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দ্রুত এই ইনস্টিটিউটের কাজ শুরু করেছিলাম এবং গবেষণা শুরু করেছি এবং অনেক ভাষার নমুনা এখানে সংরক্ষণ করা আছে। ইউনেসকো এই প্রতিষ্ঠানকে ক্যাটাগরি দুইয়ে উন্নীত করেছে। ’

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই ইনস্টিটিউট একদিন তাদের গবেষণা, ভাষা সংরক্ষণ, ভাষা সম্পর্কে আরো জ্ঞান সংরক্ষণ করবে। প্রতিটি ভাষার উৎস কী, কিভাবে বিকশিত হলো, কিভাবে ভাষা বিভিন্ন জাতির কাছে এলো, তা নিয়ে গবেষণার আধার হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সেভাবে এই ইনস্টিটিউটকে গড়ে তুলতে চাই। আশা করি, বিশ্বের বুকে একদিন এই ইনস্টিটিউট আলাদা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবে। ’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘অন্য ভাষার প্রতি বৈরিতা নয়। মাতৃভাষা শিখতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে আমরা অন্য ভাষাও শিখব। জীবন-জীবিকার জন্য অনেক সময় অন্য ভাষা শিখতে হয়। ’ জ্ঞান পিপাসা ও প্রযুক্তির চাহিদা মেটাতেও অন্য ভাষা শেখার কথা বলেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা অন্য ভাষা শিক্ষার বিরোধী নই। অন্য ভাষা শিখতে হবে। কিন্তু মাতৃভাষা ভুললে চলবে না। ’

বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস ব্যাপকভাবে প্রচারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা বাঙালি, আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে সংগ্রাম করে প্রতিটি দাবি অর্জন করতে হয়েছে। কোনো কিছু সহজে আসে নাই। ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক এসেছে। কিন্তু এ দেশের মানুষ কাউকে মেনে নেয়নি। ’

বাংলাদেশের সব অর্জনে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই মাটির সন্তান হিসেবে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানই মনে হয় একজন, যিনি এই দেশে এই মাটির সন্তান হয়ে এই দেশকে শুধু স্বাধীনই করেন নাই, এই দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। আর তারপর আমি একজন, অভাগা আছি। আর এর বাইরে যারাই যখন এসেছে—আপনারা যদি একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন, তারা কিন্তু এই বাংলার মাটিতে জন্মগ্রহণ করেনি। আশপাশের দেশে জন্মগ্রহণ করে আমাদের দেশে এসেছে। এটা হলো বাস্তবতা। সেই জন্য স্বাভাবিকভাবে এই মাটির সন্তান হিসেবে, আমাদের এই মাটির প্রতি টান আছে। মাটির টানটা কিন্তু বড় টান। ’

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, এইচ এম এরশাদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে তাঁর যে এই বক্তব্য, তা স্পষ্ট। জিয়ার শৈশব কেটেছে ভারতে, কৈশোর কেটেছে পাকিস্তানে। এরশাদের জন্ম ভারতের কোচবিহারে। খালেদা জিয়ার জন্ম ভারতের জলপাইগুড়িতে।

জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়ে আরো সক্রিয় হওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষাভাষীর স্থান ষষ্ঠ, সেই হিসাবে জাতিসংঘের একটি ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ করে কি না—এ ব্যাপারে আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। যদিও এটা কার্যকর করতে অনেক রকম সমস্যা আছে। তবু আমরা আমাদের দাবিটা তুলে রেখেছি। আমরা দাবিটা একদিন বাস্তবায়ন করতে পারব। ’

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক জিন্নাত ইমতিয়াজ আলী, বাংলাদেশে ইউনেসকোর আবাসিক প্রতিনিধি বিয়েত্রিস কালদান বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ইউনেসকোর লিঙ্গুয়াপ্যাক্স ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা আনভিটা অ্যাবি। স্বাগত বক্তব্য দেন শিক্ষাসচিব সোহবার হোসেন। সূত্র : বাসস ও বিডিনিউজ।


মন্তব্য