kalerkantho


জাপার সাবেক এমপি কাদের গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জাপার সাবেক এমপি কাদের গ্রেপ্তার

গাইবান্ধা-১ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টানা ছয় দিন গৃহবন্দি করে রাখার পর গতকাল মঙ্গলবার বগুড়ার বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গাইবান্ধায় নিয়ে গেছে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

সুন্দরগঞ্জের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজনের জবানবন্দির ভিত্তিতে ডা. কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকার বাসায় ডা. কাদের খানকে গত বৃহস্পতিবার থেকে গৃহবন্দি করে রেখেছিল পুলিশ। এ ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথম দিকে কিছু না বললেও পরে জানানো হয়, জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। সেই নজরদারির মাঝেই গতকাল বগুড়া জেলা পুলিশের সহায়তায় ডা. কাদের খানকে তাঁর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় গাইবান্ধা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা শনাক্ত হয়েছে—পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হকের এমন বক্তব্যের পরদিন এই গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকালও দিনভর পুলিশ ঘিরে রাখে ডা. কাদের খানের বগুড়ার বাসা। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে সাদা পোশাকের একদল পুলিশ মাইক্রোবাসে এসে কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে সরাসরি ভবনের চারতলায় উঠে যায়। এই তলাতেই কাদের খান বসবাস করেন। পুলিশের দলটি ২০ মিনিটের মধ্যে কাদের খানকে সঙ্গে নিয়ে নেমে এসে মাইক্রোবাসে উঠে চলে যায়।

এ সময় সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি পুলিশের কর্মকর্তারা। পরে পুলিশের আরেকটি দল বাড়িটিতে তল্লাশি চালায়। গাইবান্ধা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এমপি লিটন হত্যায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডা. কাদের খানকে গাইবান্ধায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর আগে তাঁর তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ’

সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান বলেন, ‘এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই ডিবি পুলিশের সহায়তায় ডা. কাদের খানকে আটক করা হয়েছে। ’ গতকাল রাত সাড়ে ৯টার পর কাদের খানকে গাইবান্ধার এসপি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।  

সুন্দরগঞ্জের ছাপোড়হাটি গ্রামের ডা. কাদের পেশায় একজন চিকিৎসক। তিনি বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক উত্তরের খবর পত্রিকার প্রকাশক। তাঁর স্ত্রী নাছিমা বেগমও একই পেশার। বগুড়ায় এই চিকিৎসক দম্পতির নিজ বাসায়ই গড়ে তোলা হয়েছে ‘গরীব শাহ ক্লিনিক’। কাদের খান গত বুধবার গাইবান্ধা থেকে বগুড়ার বাসায় আসেন। পরদিন সকাল থেকেই তাঁর বাসা ও ক্লিনিকের সামনে অবস্থান নেয় পুলিশ।

গাইবান্ধা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইও-১ মাহবুব হোসেন ও বগুড়া সদর থানার ওসি এমদাদ হোসেন গত শনিবার রাতে কাদের খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানতে চান তিনি গাইবান্ধা-১ আসনে আসন্ন উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন কি না। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেন যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও তিনি তা দাখিল করবেন না।

উত্তরের খবর পত্রিকার সম্পাদক আবদুস সালাম বাবু জানান, কাদের খানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে কারণ জানতে চাইলে তাঁরা কোনো কথা বলেননি।

কাদের খানের স্ত্রী নাছিমা বেগম বলেন, ‘সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান, বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আমিরুল ইসলাম ও সদর থানার ওসি এমদাদুলসহ অন্তত ৩০ জন পুলিশ সদস্য বিকেলে বাসায় এসে ডা. কাদেরকে ধরে নিয়ে গেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো পরোয়ানা দেখাতে পারেনি। তারা বলছে, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ’

গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নের শাহবাজ মাস্টারপাড়ার নিজ বাড়িতে এমপি লিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই হত্যাকাণ্ড তদন্তে মাঠে নামে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও পিবিআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষায়িত দল। সুন্দরগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মীসহ ১২৮ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের মধ্য থেকে ২৩ জনকে ওই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জের সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আহসান হাবীব মাসুদ, জামায়াতের হাজি ফরিদ উদ্দিন, শিবির ক্যাডার আশরাফুল ইসলাম, জহিরুল ইসলামসহ ১২ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। সর্বশেষ গ্রেপ্তার করা হলো জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ডা. আবদুল কাদের খানকে।

এদিকে এক সপ্তাহ ধরে কাদের খানকে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতা চলছিল। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সুন্দরগঞ্জের খানপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে তাঁকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। পরে তাঁকে ফেরত দিয়ে যাওয়া হয়। এ ব্যাপারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেনি। এরপর গত ছয় দিন তাঁকে বগুড়ার বাড়িতে পুলিশের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। ডা. কাদের গত সোমবার তাঁর ব্যক্তিগত দুটি পিস্তল সুন্দরগঞ্জ থানায় নিকটজনের মাধ্যমে জমা দেন। এরপর যেকোনো সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে—এমন খবর প্রচার হলেও পুলিশের কোনো সূত্র তথ্য দিতে বা খবরের সত্যতা স্বীকারে অস্বীকৃতি জানায়।

গতকাল বিকেলে বগুড়ায় ডা. কাদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর সন্ধ্যায় আদালত ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা ভিড় জমান। এ সময় গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম জানান, কাদের খানের ঘনিষ্ঠজন ও ক্যাডার হিসেবে পরিচিত মেহেদী, শাহীন ও হান্নানকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের জবানবন্দির ভিত্তিতেই এমপি লিটন খুনের সঙ্গে কাদের খানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ডা. কাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বুধবার প্রেস ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত জানানো হবে জানিয়ে তিনি এ প্রসঙ্গে আর কিছু বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একটি সূত্র সন্ধ্যায় জানায়, কাদের খানের ক্যাডারদের স্বীকারোক্তি ও তদন্তের ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন এই সাবেক সংসদ সদস্যকে মূল সন্দেহভাজন হিসেবে গণ্য করছে। তাঁর জমা দেওয়া ব্যক্তিগত অস্ত্রের গুলি ও এমপি লিটন হত্যায় ব্যবহৃত গুলির মধ্যে মিল রয়েছে কি না সে বিষয়টিও যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও গাইবান্ধা জেলা সভাপতি সাবেক এমপি আব্দুর রশিদ সরকার বলেন, ‘কাদের খান বর্তমানে দলের কোনো পদে বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নেই। ’


মন্তব্য