kalerkantho


ব্লগার হত্যার ‘প্রথম চক্রান্তকারী’ জঙ্গি রানা গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ব্লগার হত্যার ‘প্রথম চক্রান্তকারী’ জঙ্গি রানা গ্রেপ্তার

গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় কর্মী ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক জঙ্গি রেদোয়ানুল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে গতকাল সোমবার রাজধানীর উত্তরা থেকে। বছর তিনেক মালয়েশিয়ায় পালিয়ে থাকার পর সেখানেই ধরা পড়লে সম্প্রতি তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। পরে নজরদারির মাধ্যমে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। আশরাফ নামে তাঁর এক সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

২০১৩ সালে রাজীবকে হত্যার পর অভিযুক্ত সব আসামি ধরা পড়লেও রানা গোপনে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। ওই হত্যা মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে, রানা নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রথম সারির নেতা। রাজীব হত্যার পর লেখক অভিজিৎ রায়সহ অন্তত ১১টি হত্যা ও হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে রানার নাম উঠে আসে। সিটিটিসি ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন রানা এবিটির শীর্ষ জঙ্গি চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হকের ঘনিষ্ঠ। এবিটির আধ্যাত্মিক নেতা জসিমউদ্দিন রাহমানীর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে রানাই প্রথম খুনি দলটি গঠন করেন। এই দলের সাতজন মিলে রাজীবকে হত্যা করে।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, এবিটির শীর্ষস্থানীয় নেতা রানা ও তাঁর সহযোগীকে উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ব্লগার রাজীব হত্যা মামলায় রানা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন ও মনিপুর স্কুলের শিক্ষক হত্যাচেষ্টা মামলার চার্জশিটভুক্ত তিনি। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছিল। মনিরুল জানান, রানাকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড চাওয়া হবে।

মনিরুল ইসলাম আরো জানান, রানা মালয়েশিয়ায় থাকা অবস্থায় আইএসের মতবাদ গ্রহণ করেন। সেখান থেকে সিরিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এতে ব্যর্থ হয়ে ফিলিপাইনে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মালয়েশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তত্পরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৪ সালে ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান রানা। সেখানে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হওয়ার পর তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক ছাত্র রানার পরিকল্পনায়ই ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের পল্লবী এলাকায় গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে ওই ঘটনায় রানা ও এবিটির সংশ্লিষ্টতা মেলে। তবে ঘটনার পর থেকেই রানা পলাতক ছিলেন। তিনি মালয়েশিয়া ছাড়াও মধ্যপ্রচ্যের কয়েকটি দেশেও আত্মগোপনে ছিলেন। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজীব হত্যা মামলার রায়ে রানা ও ফয়সাল নাঈম দ্বীপকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। রাজীব হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণকারী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রকে এর আগে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ব্লগার হত্যার ঘটনা তদন্তে জিয়া ও রানার সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসে। একের পর এক হত্যায় তাঁদের পরিকল্পনার তথ্য পান তদন্তকারীরা।

রানাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ডিএমপি। সিটিটিসি ইউনিট সূত্রে জানা যায়, রানার গ্রামের বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞার উত্তর জয়লস্করপুরে। তাঁর বাবার নাম আবুল কালাম আজাদ। মায়ের নাম মমতাজ বেগম। ঢাকার বারিধারা এলাকার একটি বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন রানা। ১৯৮৮ সালের ২৬ আগস্ট জন্ম নেওয়া রানা ২০০৭ সালে নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরের বছর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। আর নর্থসাউথে পড়ার সময়ই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন। ওই সময়ই এবিটির আধ্যাত্মিক নেতা মাওলানা জসিমউদ্দিন রাহমানীর সঙ্গে পরিচয় হয় রানার। এরপর ঘনিষ্ঠতা হয় এবিটির সামরিক কমান্ডার চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার সঙ্গে। রানা ও জিয়া মিলে সারা দেশে গড়ে তোলেন বেশ কিছু স্লিপার সেল।

সূত্র মতে, রানা তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও আরবিতেও দক্ষ। গোয়েন্দাদের ফাঁকি দিয়ে রানা স্লিপার সেলের সদস্যদের পরিচালনা করতে পারদর্শী ছিলেন। একসময় গোয়েন্দারা জানতে পারেন, রানা মালয়েশিয়ায় আত্মগোপনে আছেন। তাঁকে ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেয় বাংলাদেশ পুলিশ। মালয়েশিয়ায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায়ও দেশে অবস্থানকারী স্লিপার সেলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর।  

অনেক ঘটনায় রানার নাম : সূত্র মতে, পলাতক থেকেই রানা নির্দেশনা দিতেন বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের। তাঁর নির্দেশনায়ই ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় খুন হন বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়। এরপর আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে রানা ও তার স্লিপার সেলের সদস্যরা। ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু, ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস, ৭ আগস্ট গোড়ানে ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়, ৩১ আগস্ট শাহবাগে প্রকাশক ও লেখক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়। একই দিন লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের মালিক আহমেদুর রশিদ চৌধুরী টুটুলকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায় এবিটির সদস্যরা। এরপর ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ রাজধানীর কলাবাগান এলাকার বাসায় ঢুকে জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু মাহবুব তনয়কে হত্যা করা হয়। ব্লগার ও বুয়েটের ছাত্র দীপককে হত্যা করা হয় ২০১৪ সালে। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল ব্লগার নাজিমুদ্দিন সামাদকেও হত্যা করে এবিটি। সব কটি ঘটনার পরই পরিকল্পনাকারী হিসেবে রানার নাম উঠে আসে।

২০১৩ সালের ১০ মার্চ রাজীব হায়দার হত্যার ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় নর্থ সাউথের পাঁচ ছাত্র। তারা জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বড় ভাই’ রেদওয়ানুল আজাদ রানা ও সাদমানের নির্দেশনায় তারা রাজীব হায়দারকে হত্যা করে। রাহমানীর বক্তব্য ও লেখা পড়ে এবং রানার নির্দেশনায় তারা ‘ইসলামরোধীদের’ হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।


মন্তব্য