kalerkantho


বিশ্বস্বীকৃতি নেই কেন একুশে গ্রন্থমেলার?

আজিজুল পারভেজ   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিশ্বস্বীকৃতি নেই কেন একুশে গ্রন্থমেলার?

বাঙালির আবেগ ও চেতনার একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলাও অন্যতম প্রধান ভাষা হিসেবে বিশ্বসভায় অধিষ্ঠিত।

ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। তবে ভাষা আন্দোলনের চেতনার স্মারক যে অমর একুশে গ্রন্থমেলা সারা দেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে, তারই কোনো বৈশ্বিক স্বীকৃতি মেলেনি আজও।

ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিএ) বর্ষপঞ্জিতে রয়েছে নানা দেশের বইমেলার নাম ও সময়সূচি। লাটভিয়ার রিগা, মরক্কোর ক্যাসাব্লাংকা থেকে শুরু করে লন্ডন, ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার খবর রয়েছে তাদের কাছে। আছে পড়শি কলকাতা, মার্কেজের শহর বোগোটা বইমেলার বৃত্তান্তও। অথচ ভাষা আন্দোলনের শহর ঢাকায় মাসব্যাপী চলা অমর একুশে গ্রন্থমেলার ঠাঁই হয়নি আইপিএর পঞ্জিতে। জাতিসংঘের শিক্ষা-সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও মেলেনি একুশে গ্রন্থমেলার। তবে জামদানি ও বাউলগানের পর ইউনেসকোর ‘ইনট্যানজিবল’ বা স্পর্শাতীত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে পহেলা বৈশাখের বর্ণাঢ্য আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রা।

আন্তর্জাতিক বইমেলার যেসব সময়সূচি আইপিএর ওয়েবসাইটে রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগেরই ব্যাপ্তি তিন থেকে সাত দিন; দু-একটি মেলা ১০ থেকে ১২ দিন চলে।

আর অমর একুশে বইমেলা চলে মাসজুড়ে। এ মেলার জন্য দেশের লেখক-প্রকাশকরা সারা বছর প্রস্তুতি নেন। ফেব্রুয়ারি মাসের অপেক্ষায় থাকে পাঠকরাও। প্রতিবছর মেলা থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন লেখক, পাঠক। কলেবর, প্রকাশনার সংখ্যা, বিক্রি, ব্যাপ্তি, আনুষ্ঠানিকতা, উচ্ছ্বাস, বিশেষ করে দর্শকসংখ্যার দিক থেকে একুশের গ্রন্থমেলা অনন্য।

অথচ এটি নিছক একটি বইমেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি জাতিসত্তা বিকাশের ইতিহাস, মায়ের ভাষার মর্যাদার জন্য প্রাণ বিসর্জনের গৌরবময় ইতিহাস, যা অন্য কোনো জাতির নেই। ফ্রাংকফুর্ট বা লন্ডন বইমেলার মতো অমর একুশের বইমেলাও কেবল প্রকাশক, বিক্রেতা ও লেখক-বুদ্ধিজীবীদের গুরুগম্ভীর মিলনস্থল নয়। এতে রয়েছে বাঙালির প্রাণের টান, শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনও একুশের বইমেলা। রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী প্রতিবছর মেলাটির উদ্বোধন করেন। পুরো এক মাস সৃজনশীল জ্ঞানের মেলায় মেতে থাকে একটি জাতির এক বৃহৎ অংশ। জাতীয় গণমাধ্যমেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে থাকে এই মেলার খবর প্রচার। মাসব্যাপী এ বইমেলা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষী লেখক ও বইপ্রিয় মানুষের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। বইমেলায় প্রবেশের জন্য হাজার হাজার মানুষ লাইন দেয়।

বাংলা একাডেমি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আয়োজন করে আসছে এ মেলা। ১৯৭৪ সালে প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারার উদ্যোগে শুরু হওয়া এ মেলা এখন একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল পরিসরে বিস্তৃত হয়েছে। মাসব্যাপী এ মেলায় প্রকাশিত হয় কয়েক হাজার বই। বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্য মতে, গত বছর প্রকাশিত হয়েছে তিন হাজার ৪৪৪টি নতুন বই। ২০১৫ সালে বেরিয়েছিল তিন হাজার ৭০০টি; ২০১৪ সালে দুই হাজার ৯৫৯টি আর ২০১৩ সালে তিন হাজার ৭০টি নতুন বই। মূলত দেশের সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যের বই প্রকাশিত হয় এই এক মাসে। বইয়ের পাশাপাশি বছরের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুক্তচিন্তার প্রকাশনা ‘লিটলম্যাগ’ প্রকাশিত হয় এই মেলায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে। মেলায় রয়েছে ১০০টির মতো লিটল ম্যাগাজিনের স্টল। পাশাপাশি ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যাঁরা বই প্রকাশ করেছেন তাঁদের জন্য ব্যবস্থা থাকছে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে।

বাংলা একাডেমির সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, গত বছর মেলায় বই বিক্রি হয় প্রায় ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকার। ২০১৫ সালে হয়েছিল ২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার। প্রকাশকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এই হিসাব। রাজস্ব দেওয়ার ভয়ে প্রকাশকরা প্রকৃত তথ্য দেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত হিসাব আরো বেশি হবে বলে ধারণা করা হয়।

এবার একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মোট ৪০৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৬৩টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে দর্শকের জন্য উন্মুক্ত হয় বইমেলা।

একুশে গ্রন্থমেলায় সঙ্গে থাকে সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা আয়োজন। এবার যুক্ত হয়েছে ‘সম্প্রীতির জন্য সাহিত্য’ শীর্ষক চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে চলছে নাটক মঞ্চায়ন। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান, উপস্থিত বত্তৃদ্ধতা ও সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। দর্শকদের ভিড় সামলানোর জন্য যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হয় কর্তৃপক্ষকে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলা এলাকায় আড়াই শ ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রন্থমেলা সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত।

 

এত সব আয়োজন যে মেলাকে ঘিরে, তারই কোনো অস্তিত্ব নেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, এ মেলার কোনো তথ্য লিপিবদ্ধ নেই প্রকাশনা ও মেলাবিষয়ক বৈশ্বিক কোনো সংস্থার কাছে।

৬০টি দেশের ৭০টির মতো প্রতিষ্ঠান জেনেভাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিএ) সদস্য। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতিও ২০০২ সাল থেকে এ সংগঠনের সদস্য। আইপিএর মাধ্যমে একুশে বইমেলার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে এ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে গত বছর মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু আইপিএর গ্লোবাল ইনডেক্সে এখনো এই মেলার তথ্য স্থান পায়নি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বইমেলার গ্লোবাল ইনডেক্সে অমর একুশে গ্রন্থমেলার নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের মেলাটি শুধুই বাংলাদেশের বইয়ের মেলা। এখানে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন দেশের বইয়ের প্রবেশ নেই। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার বইয়েরও এ মেলায় অনুমোদন নেই। ফলে এর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়নি। তবে সময়ের ব্যাপ্তির দিক থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদের মেলা। বিশ্বের আর কোনো মেলা ২৮ দিন ধরে চলে না। ’

আন্তর্জাতিকভাবে এ মেলাকে উপস্থাপনের কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান শায়ক বলেন, ‘একুশের বইমেলার একটি নিজস্ব চরিত্র ও ঐতিহ্য থাকায় এই মেলাকে যেহেতু আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া সম্ভব নয়, তাই আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি আন্তর্জাতিক মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমাদের সংগঠন আইপিএর সদস্য হওয়ায় আমরা এ ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা চেয়েছি। গত বছর সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে, এ বছর অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নেতৃত্বে আমরা বৈঠক করেছি আইপিএর সঙ্গে। তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। আশা করছি, শিগগির একটি আন্তর্জাতিক বইমেলা বাংলাদেশে আয়োজন করতে পারব। ’

অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. জালাল ফিরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বইমেলাটি সারা বিশ্বের মধ্যে একটি অসাধারণ আয়োজন। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এত দীর্ঘ সময়ে, এত বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে এবং নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়া মেলা বিশ্বের আর কোথাও নেই। এই মেলায় বাইরের যারাই আসছেন তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করছেন। কলকাতা বইমেলা কমিটির সচিব এসেও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিককালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বইসংশ্লিষ্টদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তারা জানতে চাচ্ছে, এই মহাযজ্ঞ কিভাবে আমরা সম্পন্ন করছি। ’ এই মেলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইউনেসকোর মতো সংস্থা এই মেলাকে বিশেষ স্বীকৃতি দিতে পারে। এত দিন না দিলেও একসময় বিশ্বের সংস্থাগুলো স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হবে বলে আশা করি। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমি থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না জানাতে চাইলে তিনি বলেন, এ রকম কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই।

জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা, কায়রো, তাইপে, ক্যাসাব্লাংকা, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ায় আন্তর্জাতিক বইমেলা বসে। মার্চ-এপ্রিলে ব্রাসেলস, লন্ডন, লিপজিগ (জার্মানি), প্যারিস, ব্যাংকক, বোলোগনায় (ইটালি) বইমেলা হয়। এগুলোর মধ্যে শুধু ব্যাংকক বইমেলাই ১২ দিনের। বাকি সব বইমেলা তিন থেকে চার দিনের। বুদাপেস্ট, কুইবেক, জেনেভা, বোগোটা বইমেলাও চার থেকে পাঁচ দিনের বেশি হয় না। নামে আন্তর্জাতিক হলেও এসব মেলায় সব দেশের সব ভাষার বই পাওয়া যায় না। স্থানীয় ভাষার পাশাপাশি বড়জোর ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বই থাকে। তাহলে আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি পেতে অমর একুশে বইমেলার ঘাটতি কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তরে এক বিশিষ্ট প্রকাশক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দীর্ঘ মেয়াদ, মানুষের অংশগ্রহণ ও বই প্রকাশকের দিক থেকে হয়তো আমাদেরটি বিশ্বের বড় মেলা। কিন্তু মানের দিক দিয়ে এটি কোন পর্যায়ে আছে সেটাও দেখতে হবে। এখানে অনেক বই বের হয়, কিন্তু মানসম্পন্ন কয়টি? অনেক লোকসমাগম হয়, কিন্তু কতজন বই কেনে? আমাদেরটা বাংলা বইয়ের মেলা হলেও এখানে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা বইও নিষিদ্ধ। ভিন্ন ভাষার বইও খুব একটা বের হয় না। এ অবস্থায় আমাদের ভাবতে হবে, বাংলা সিনেমার মতো বাংলা বইয়ের প্রটেকশন আমরা অব্যাহত রাখব, নাকি বিশ্বায়নের পথে এগিয়ে যাব। ’


মন্তব্য