kalerkantho


আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

ভাষার মর্যাদা রক্ষার নেতৃত্বে বাংলাদেশ

মেহেদী হাসান   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাষার মর্যাদা রক্ষার নেতৃত্বে বাংলাদেশ

বাঙালির ভাষার দাবি আদায়ের রক্ত ঝরানো দিনটি আজ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থায় (ইউনেসকো) বিশ্বের সব মাতৃভাষা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালনের অঙ্গীকারও করেছিল ঢাকা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে ২০০৮ সালকে ভাষা বর্ষ ঘোষণা করা হয়। আর এর মধ্য দিয়ে দিবসটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।

বিশ্বের বিকাশমান ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় গবেষণার জন্য ২০১০ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কাজ শুরু করে। তবে এ বিষয়ে পুরোদমে ভূমিকা রাখতে আরো কিছুটা সময় লাগবে বলে জানা গেছে। গত বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও লিথুয়ানিয়ার ভাষা ইনস্টিটিউটের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি প্রটোকলের আওতায় ভাষা, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে সহযোগিতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বাংলায় অনুবাদ করে ‘লিথুয়ানিয়ার ইতিহাস’ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া এ ইনস্টিটিউট বাংলা ভাষা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলো প্রবাসীদের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে প্রতিবছর।

ইউনেসকোর উদ্যোগে বড় পরিসরে এদিনে অনুষ্ঠান হয় সংস্থাটির সদর দপ্তর ফ্রান্সের প্যারিসে। বাংলাদেশের বাইরে ভারত, চিলি, রাশিয়া, ফিলিপাইন, মিসর, কানাডাসহ বিশ্বের সর্বত্রই দিবসটি পালিত হয়। এদিনে সারা বিশ্ব নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি সম্মান জানায় ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো রক্ষার উপায় নিয়ে আলোচনা করে। একই সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে এসে যায় ভাষার অধিকার রক্ষায় বাঙালির আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস।

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে কানাডায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের জন্য দেশটির পার্লামেন্টে বেশ কয়েকবার বিল উঠেছে। তবে সেগুলো আইনে পরিণত না হলেও ২০১৫ সালে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া ও মানিটোবা—এ দুটি প্রদেশ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্‌যাপনের ঘোষণা অনুমোদন করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানকে ঘিরে ঢাকায় বিদেশি অতিথিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। ২০১৫ সালের ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। এ বছর এসেছেন নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোর্গে ব্রেন্ডে। এ ছাড়া প্রতিবছরই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপনকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশি সাংবাদিকদের নিয়ে সফর আয়োজন করে। এরই অংশ হিসেবে এ বছর বাংলাদেশ সফর করছেন সাতজন বিদেশি সাংবাদিক।

ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখনো ছয় হাজার ৯০০ ভাষা টিকে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি উদ্যোগ না নিলে আগামী শতাব্দীতেই এর প্রায় ৯ শতাংশ ভাষাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে উন্নত দেশগুলো ভাষার ব্যাপারে আগের চেয়ে আরো সচেতন হয়েছে। উদ্যোগী হয়েছে তাদের জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে। বিশেষ করে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো তাদের সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশেরও বিভিন্ন অঞ্চলে বিপন্ন ভাষাগুলো রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টরা তাগিদ দিয়ে আসছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদ্দেশ্য ছিল সব ভাষার জন্য সম্মান ও স্বীকৃতি আদায়। আমরা আমাদের ভাষার জন্য সংগ্রামের স্বীকৃতি পেয়েছি। এখন অন্যান্য ভাষার জন্য কাজ করতে হলে অন্যদের ক্ষেত্রেও আমাদের যথেষ্ট উদারতা ও জোরালো ভূমিকা থাকতে হবে। ’ 

তিনি বলেন, ‘অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আমরা যে সেই চেষ্টা করিনি তা নয়। নেপালের সঙ্গে কিছুটা চেষ্টা করেছি। হয়তো অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও চেষ্টা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সফল হতে হলে অন্যের ভাষার প্রতি আমাদের অসীম শ্রদ্ধা দেখাতে হবে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘ভাষার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা নেতৃত্ব দিয়েছি। এ অনন্য অর্জন বাঁচিয়ে রাখতে ভাষার প্রতি আমাদের আরো উদার হতে হবে। কূটনৈতিক পর্যায়ে থেকেও আরো উদ্যোগ নিতে হবে। ’

বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি প্রসঙ্গে এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা কোনটি হবে তা নির্ভর করে বিশ্বের কতসংখ্যক মানুষ কতটি দেশে সেই ভাষা ব্যবহার করে তার ভিত্তিতে। আমরা কয়েক বছর ধরে হয়তো বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির কথা বলছি না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের দাবি থেকে সরে এসেছি। এটি আমাদের প্রাণের দাবি। আমার বিশ্বাস, বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হলে আমরা সবাই আনন্দিত হব। ’

উল্লেখ্য, প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলার অবস্থান সপ্তম। পৃথিবীবাসীর ৩.০৫ শতাংশ বা ২১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বাংলায় কথা বলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি কূটনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের বড় সফলতা। এর ফলে এ দেশের ভাবমূর্তি, সম্মান বেড়েছে।

তিনি বলেন, ভাষার জন্য বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস আরো ব্যাপকভাবে দেশের বাইরে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইউনেসকো ও জাতিসংঘেরও দায়দায়িত্ব আছে। বিশেষ করে বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো শুধু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান না করে বাংলা ভাষার জন্য এ দেশের সংগ্রামের ইতিহাসকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে বিশ্বের কাছে আরো পরিচিত করে তুলতে যে ধরনের গবেষণা ও প্রকাশনা দরকার তা তেমন একটা নেই। বিশেষ করে অনুবাদে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। বাংলাকে বিশ্বে জানান দিতে এ দেশের প্রকাশনাগুলোকে যেমন অন্য ভাষায় অনুবাদ করে বিদেশে প্রচারের ব্যবস্থা থাকতে হবে, তেমনি বিদেশি প্রকাশনাগুলোও বাংলায় অনুবাদ করে এ দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। আর এর মধ্য দিয়েই ভাষাকে কেন্দ্র করে এ দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি আরো বৈশ্বিক রূপ পাবে এবং বাংলা আরো সমৃদ্ধ হবে। ’

ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের শহুরে শিক্ষিত শ্রেণির সন্তানদের অনেকে ভালো ইংরেজি ও হিন্দি বলতে পারে; কিন্তু মাতৃভাষা বাংলায় ততটা সাবলীল নয়। বাংলার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করতে পারলেই এর প্রতি সবার আগ্রহ বাড়বে। ’

তিনি বলেন, ‘উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলার অবস্থা আরো নাজুক। ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোতে ভালো কোনো বই প্রকাশিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে জাপানের মতো দেশগুলোতে সেগুলোর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। আমাদের দেশে এমনটি দেখা যায় না। শুধু সাহিত্য নয়, জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বাংলার ব্যবহার এবং দেশি ও বিদেশি ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা থাকা উচিত। ’


মন্তব্য