kalerkantho


ওসির দায়িত্বে এএসপি

গুলশান থানার ঘটনায় পুলিশে সন্দেহ, গুঞ্জন

আপেল মাহমুদ ও এস এম আজাদ   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গুলশান থানার ঘটনায় পুলিশে সন্দেহ, গুঞ্জন

থানার ওসি হিসেবে ইন্সপেক্টর বা পরিদর্শকের পরিবর্তে সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) দায়িত্ব দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত স্থগিত আছে, এক ঘটনায় সেটি নিয়ে গুঞ্জন চলছে কনস্টেবল থেকে শুরু করে পরিদর্শক পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে। গত বছর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে থানায় এএসপি পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

পরে ওসির দায়িত্বরত পরিদর্শকসহ নিচু স্তরের কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের মুখে সে বছরের ২ নভেম্বর ওই আদেশ স্থগিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে গত সপ্তাহে গুলশান থানার ওসি সিরাজুল ইসলামের এএসপি হিসেবে পদোন্নতি হওয়ার পরও তাঁকে আগের পদেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। তাঁরা বলছেন, দাবির মুখে এএসপিদের ওসি হিসেবে পদায়নের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হলেও তা বাতিল হয়নি। তাঁদের সন্দেহ, গুলশান থানায় পরীক্ষামূলক দায়িত্ব দিয়ে সারা দেশেই ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে। এমনটি ঘটলে পরিদর্শক, উপপরিদর্শক (এসআই), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ও কনস্টেবলদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়বে বলে তাঁরা মনে করছেন।  

জানা যায়, কোনো নন-ক্যাডার পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদের ওপরের স্তরে যাওয়ার কোনো নজির  সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেই। তবে এএসপি বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হওয়ার চেয়ে থানার ওসি পদটিই বেশি আকর্ষণীয় নিচু স্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে। এ ছাড়া এএসপি বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে ওই কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগও সীমিত।

অন্যদিকে ক্যাডার কর্মকর্তারা এএসপি থেকে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পর্যন্ত হতে পারেন।

দায়িত্বশীল কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, গুলশান থানায় সিরাজুল ইসলামকে বিশেষভাবে ওসির দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো নতুন আদেশের বাস্তবায়ন না হলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বিষয়টি সন্দেহের চোখে দেখছেন। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, নতুন আদেশ না হলেও থানায় এএসপি নিয়োগে সুফল বয়ে আসবে বলে মনে করছেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, বিসিএস ক্যাডারভুক্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তা থানার দায়িত্বে থাকলে সেবার মান বাড়বে। একই সঙ্গে অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানি কমবে। এমন ভাবনা থেকেই থানার ওসি হিসেবে কিভাবে ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়ন করা যায় তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিবেচনা করা হচ্ছে পরিদর্শকসহ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের দাবিও।

নন-ক্যাডার পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন’ থানায় ওসি হিসেবে এএসপি নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছে। এ সংগঠনেরই সভাপতি গুলশান থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম। গুলশান থানার ওসি থাকা অবস্থায়ই সম্প্রতি তিনি এএসপি হিসেবে পদোন্নতি পান। এ পদকে মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) বলা হয়। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের এক আদেশে সিরাজুল ইসলামকে অন্যত্র বদলি না করে গুলশান থানার ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি হয়ে দাবির বিপক্ষে গিয়ে পদ নেওয়ায় সিরাজুল ইসলামের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সহকর্মীরা। সারা দেশের ওসিদের মধ্যে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে বিষয়টি নিয়ে।

বেশ কয়েকজন পরিদর্শক ও এসআই বলেন, দেশের প্রায় ১৫ হাজার এসআই ও পাঁচ হাজার পরিদর্শকের নেতা হিসেবে বিগত দিনে দায়িত্ব পালন করেছেন সিরাজুল ইসলাম। এএসপিদের যেন থানার দায়িত্ব না দেওয়া হয় সে জন্য তিনিও আন্দোলন করেছেন। অথচ তিনি কিভাবে গুলশান থানার ওসি হলেন তা জানেন না অনেক নন-ক্যাডার পুলিশ কর্মকর্তাই। কয়েকজন সন্দেহ করছেন, তাঁদের দাবি স্তিমিত করার জন্য সংগঠনের সভাপতিকেই ওসি করা হয়েছে।

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের এক থানার ওসি বলেন, ‘গুলশান থানার বিষয়টি সন্দেহজনক। মনে হচ্ছে, আমাদের দাবি পাশ কাটিয়ে কিছু করার চেষ্টা চলছে। এটা দুঃখজনক। কারণ কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যন্ত আমরা যারা আছি, আমাদের সম্মানজনক পদোন্নতি বা পোস্টিং একটাই—থানার ওসি। এএসপি যাঁরা হন তাঁরা শুরু থেকেই আমাদের বস। তাঁরা আইজিও হতে পারবেন। এ সিদ্ধান্ত আমাদের বঞ্চিত করার শামিল। ’

জানতে চাইলে গুলশান থানার ওসির দায়িত্বে থাকা সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা একটা বিশেষ অর্ডারে হয়েছে। ভালো অফিসার ওসি না দেওয়া পর্যন্ত এবং আমাকে অন্য কোথাও পোস্টিং না করা পর্যন্ত এখানে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। এটা আর কিছু নয়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এর আগে গুলশানের ওসি রফিকুল ইসলামও পদোন্নতি পাওয়ার পর এভাবে দায়িত্বে ছিলেন। আমি সংগঠনের সভাপতি বলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আবার অনেকে তদবির নিয়ে আসে, সেসব না রাখলে কী দিয়ে ঘায়েল করা যায় সেটা খোঁজে। ’

নন-ক্যাডার পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব শামীমুর রশিদ তালুকদার বলেন, ‘বিষয়টি এখনো তেমন পর্যায়ে যায়নি যে কথা বলব। আমরা শুনেছি, যত দিন পর্যন্ত গুলশানে নতুন ওসি নিয়োগ না হবে তত দিন এএসপি হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন কর্মকর্তা বদলি হয়ে এলে তিনি অন্যত্র বদলি হয়ে যাবেন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় আমাদের বলেছেন, আপাতত এএসপিদের থানার ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে না। আমরা সে ব্যাপারে আশাবাদী রয়েছি। ’

গত বছরের ২০ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের এক নির্দেশনায় ডিএমপির ৪৯ থানা, ঢাকা রেঞ্জের ৩০ থানা, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ৩০ থানা, রাজশাহী ও খুলনা রেঞ্জের ৩০-৩৫ থানায় পরিদর্শকের বদলে এএসপিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২৫ অক্টোবর পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার মতিঝিল, শাহবাগ ও গুলশান থানায় একজন করে এসি নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এতে তীব্র আপত্তি জানায়। থানাগুলোতে এএসপিদের দায়িত্বও বুঝিয়ে দেননি তখন সেখানকার ওসিরা। ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল আইজিপি এ কে এম শহীদুল হকের সঙ্গে দেখা করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানায়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে গণভবনে ডেকে পাঠান। পরে ২ নভেম্বর সিদ্ধান্তটি স্থগিত করার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘থানায় এএসপি নিয়োগ দেওয়া হলে পুলিশের সেবার মান বাড়বে—এমন ধারণা থেকেই পদায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ সিদ্ধান্ত এখনো আছে। ইন্সপেক্টরদের যে দাবি সেগুলোও বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। ’ ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, স্থগিত করার মানে বাতিল নয়। সব দিক বিবেচনায় যেটি ভালো হবে, সেটিই করা হবে।

এ বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের এক থানার ওসি (পরিদর্শক) বলেন, ‘এএসপি নিয়োগ হলেই সেবার মান বাড়বে এমনটি ঠিক নয়। যাঁরা বিসিএস দিয়ে আসছেন তাঁরা আমাদের কাছে আনাড়ি। থানায় কিভাবে পুলিশিং করতে হয় তা বুঝতেও তাঁদের অনেক সময় লাগবে। ইন্সপেক্টর এখন প্রথম শ্রেণির পদের চাকরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্ররা এখন ওসি হচ্ছেন। আমাদেরই প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়ে উন্নত সেবা নিশ্চিত করা যায় না? থানায় তিনজন ইন্সপেক্টর নিয়োগ দিয়ে সেই কাজ তো শুরু হয়েছে...। ’ একই রকম বক্তব্য ডিএমপির গুলশান বিভাগের এক থানার ওসিরও।

 


মন্তব্য