kalerkantho


মোহাম্মাদ আলী আকন্দ

আন্দোলনের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার তালিকায় ছিলেন

আলম ফরাজী, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আন্দোলনের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার তালিকায় ছিলেন

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ময়মনসিংহের বিভিন্ন থানায় আন্দোলন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

এ জন্য জারি হয়েছিল হুলিয়া, যেতে হয়েছিল কারাগারে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার সম্ভাব্য আসামিদের যে তালিকা করা হয়েছিল তাতেও নাম উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধেও ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। নাম তাঁর মোহাম্মাদ আলী আকন্দ। শিক্ষক, কবি, প্রবন্ধকার ও গবেষক হিসেবে এলাকায় তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।

মোহাম্মাদ আলীর জন্ম ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের ধূরুয়া গ্রামে, ১৯২৮ সালে। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি এমসি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এরপর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনে শরিক হন।

মোহাম্মাদ আলী আকন্দ জানালেন, বায়ান্নর ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় যে সম্মেলন হয় তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রকেই নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে নান্দাইলের ছিলেন মোহাম্মাদ আলী আকন্দ, ইলিয়াছ উদ্দিন (প্রয়াত), আবুবক্কর সিদ্দিক (প্রয়াত), আবুল খোরশেদ খান প্রমুখ। নান্দাইলে এসে তাঁরা বন্ধুবান্ধব ও স্কুল ছাত্রদের নিয়ে মাইকে (টিনের হর্ন) ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বাংলাদেশে উর্দু ঠাঁই নাই’ স্লোগান দিয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলেন। আন্দোলন চলাকালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রকে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল। তাদের মুক্তির দাবিতে ১১ ফেব্রুয়ারি আবার আমতলায় সমাবেশ হয়। তাতে সিদ্ধান্ত হয়, ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন পেশার লোকজনকে নিয়ে ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করা হবে। এরই মধ্যে পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। আন্দোলনের নেতারা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করেন। মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। গুলিতে বরকত, রফিক, সালাম, জব্বারসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো অনেক নিহত হয়। পুলিশ অনেকের লাশ গোপন করে ফেলে। ওই সময় আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে নান্দাইলের খালেক নেওয়াজও ছিলেন। তাঁকেও কারাগারে নেওয়া হয়। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে যাঁরা ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের নামে হুলিয়া জারি হয়। পরে অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়। তালিকা ধরে তাঁদের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মাদ আলী আকন্দও ছিলেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপে ও মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের সংসদ সদস্য পদ প্রত্যাহার করায় সরকার তাঁদের হুলিয়া প্রত্যাহার করে নেয় এবং গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দেয়।

মোহাম্মাদ আলী আকন্দ ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত আঠারবাড়ি এমসি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে নান্দাইল চণ্ডীপাশা উচ্চ বিদ্যালয়ে চলে যান। সেখানে শিক্ষকতা করেন ২৮ বছর। অবসরে যান ১৯৯১ সালে। ১৯৬৫ সালে তিনি ময়মনসিংহ সেশন কোর্টের সম্মানিত জুরি ছিলেন। বইয়ের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রয়ালটি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে তিনি এইচআর ফাউন্ডেশন ও সেবা ফাউন্ডেশন পুরস্কার পেয়েছেন।

এই ভাষাসংগ্রামী বলেন, ‘বায়ান্নর কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে উঠি। দেশের মানুষ জানুক আমিও একজন ভাষাসংগ্রামী। তাহলেই আমি তৃপ্ত। ’


মন্তব্য