kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা কোটায় না পেলে মেধায় নিয়োগ!

বিসিএসে কোটা শিথিল প্রসঙ্গ মন্ত্রিসভায় উঠছে আজ

আশরাফুল হক রাজীব   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মুক্তিযোদ্ধা কোটায় না পেলে মেধায় নিয়োগ!

বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্যপদগুলো মেধাতালিকায় অবস্থানকারী সাধারণ প্রার্থীদের দিয়ে পূরণ করা হবে, এসংক্রান্ত দুটি বিষয় আজকের মন্ত্রিসভা বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আজ সোমবার দুপুর ১২টায় সচিবালয়ে এ বৈঠক হবে। ২০১০ সাল থেকে বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রার্থী পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট পদ সংরক্ষণের (শূন্য রাখার) নিয়ম চালু রয়েছে।

কোটা সংরক্ষণের নিয়ম নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিথিলের সুপারিশ করেছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক কালের কণ্ঠকে জানান, পাবলিক সার্ভিস কমিশন মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল বা সংস্কারের সুপারিশ করেনি। কোটা শিথিলের সুপারিশ করেছে মাত্র। যেসব বিসিএস পরীক্ষায় কোটা পূরণ হয় না, সেসব পদ শূন্য থাকে। জনবল না থাকায় দেশের মানুষ সরকারের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। এসব শূন্যপদ পূরণের জন্য বিশেষ বিসিএস আয়োজন করতে অনেক সময় লেগে যায়। এ কারণে কমিশন কোটা সংরক্ষণের নিয়ম নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিথিলের সুপারিশ করেছে।

মন্ত্রিসভার একজন সিনিয়র সদস্য গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, আগামীকালের (সোমবারের) বৈঠকের এজেন্ডায় ‘বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড সংশোধন আইন, ২০১৭’, ‘বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ আইন, ২০১৭’, ‘প্রাণীকল্যাণ আইন, ২০১৭’ এবং ‘শিশু (সংশোধন) আইন, ২০১৭’ রয়েছে।

পিএসসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩৬তম বিসিএসে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় প্রায় এক হাজার ৬৩৮টি পদ শূন্য থাকবে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৪৯১টি, মহিলা কোটার ১৬৪টি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার ৮২টি পদ রয়েছে। অন্য পদগুলো পেশাগত ক্যাডার-সংশ্লিষ্ট। এককথায় ৩৬তম বিসিএসের জন্য বিজ্ঞাপিত দুই হাজার ১৮০টি পদের মধ্যে কোটা সংরক্ষণসংক্রান্ত প্রচলিত নিয়মের কারণে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে ৯০১টিসহ এক হাজার ৬৩৮টি পদে কোনো জনবল নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া ৩৫তম বিসিএসেও মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা, ক্ষুদ্র্র নৃগোষ্ঠী এবং জেলা কোটার ৩৭১টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পদ যাতে শূন্য রাখতে না হয়, সে জন্য কোটা সংরক্ষণের বিদ্যমান বিধান শিথিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে সাধারণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে পদগুলো পূরণ করা হবে। গত বছর সরকারি চাকরি থেকে শ্রেণিবিন্যাস তুলে দেওয়া

হয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির যে বিন্যাস ছিল, তা এখন বিলুপ্ত। এখন সরকারি চাকরির ধাপ নির্ধারণ হয় গ্রেড অনুযায়ী। এসব সরকারি চাকরির সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে পিএসসি। তবে এসব চাকরিতে নিয়োগ দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। জটিল কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে সংস্থাটি সময়মতো উপযুক্ত জনবল বাছাই করতে পারছে না। এক বছরের মধ্যে বিসিএস নিয়োগ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তাদের বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে। সম্প্রতি ৩৪তম বিসিএসের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিজ্ঞাপন প্রকাশের ৪৮ মাস পর। শুধু বিসিএস নয়, দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে গিয়েও দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হচ্ছে পিএসসিকে। এসব চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ১০ শতাংশ মহিলা কোটা এবং ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা অনুসরণ করতে হয়।

সম্প্রতি পিএসসি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে ২৮তম বিসিএসে ৯১টি, ২৯তম বিসিএসে ৪৫টি, ৩০তম বিসিএসে ৮৫টি, ৩১তম বিসিএসে ৩৬টি, ৩২তম বিসিএসে ১৩টি, ৩৩তম বিসিএসে প্রথম শ্রেণির ৯১টি, দ্বিতীয় শ্রেণির ৮৫টি এবং ৩৪তম বিসিএসে প্রথম শ্রেণির ৬২টি ও দ্বিতীয় শ্রেণির এক হাজার ২৪৬টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদের উপযুক্ত প্রার্থী মেধা কোটায় থাকার পরও তাতে নিয়োগের সুপারিশ করতে পারেনি পিএসসি। এ কারণে পিএসসি ৩৬তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পদ সংরক্ষণ না করে মেধা কোটা থেকে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশের সুযোগ চেয়েছে। শুধু বিসিএসেই নয়, সম্প্রতি সরকার প্রায় ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পদায়ন করেছে। মাত্র ১১ মাসের মধ্যে এ নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রার্থী না পাওয়ার পর তা সংরক্ষণ না করার কারণে। নার্স নিয়োগের সময় সরকার মুক্তিযোদ্ধা কোটার পদ সংরক্ষণের বিধান শিথিল করেছিল। পিএসসি গত বছরের ১১ অক্টোবর সার্কেল অ্যাডজুট্যান্ট এবং উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তার ২০৮টি শূন্যপদে লোক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। এ চাকরির জন্য ৫১ হাজার ৬২১টি আবেদন জমা পড়ে। তাদের প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে এরই মধ্যে ৭৭০ জনকে বাছাই করা হয়েছে। এ চাকরির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা অনুসরণ করতে গেলে অনেক পদ শূন্য থেকে যাবে। এ অবস্থায় পিএসসি মুক্তিযোদ্ধা কোটা শিথিলের অনুরোধ করেছিল।

কোটাসহ নানা কারণে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের শূন্যপদ পূরণ হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছরই এসব পদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। গত এক বছরে সরকারের শূন্যপদ বেড়েছে ২৫ শতাংশ। বছরের পর বছর এসব পদ খালি থাকায় দেশে বেকার সমস্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ সরকারের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

২০১০ সালে জারি করা কোটা সংরক্ষণের আদেশে যা বলা হয়েছে : ২০১০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, সরকারি, আধাসরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত সংস্থা প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেশনে সরাসরি জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা অনুসরণ করতে হবে। যদি সরকারি পদে জনবল নিয়োগের সময় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না যায়, তাহলে ওই সব পদে সাধারণ কোটার জনবল নিয়োগ দেওয়া যাবে না। বরং মুক্তিযোদ্ধা কোটার পদগুলো অবশ্যই শূন্য রাখতে হবে। এমনকি বিভাগীয় পদগুলোতে জনবল নিয়োগেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। ওই আদেশের আলোকেই বিসিএস নিয়োগেও মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।


মন্তব্য