kalerkantho


মুখস্থে ভর করেই বিশ্ববিদ্যালয় পার

শরীফুল আলম সুমন   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মুখস্থে ভর করেই বিশ্ববিদ্যালয় পার

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় এক সময় নির্দিষ্ট বিষয়ে বাঁধাধরা কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করলেই পাস করা যেত। ১৫ থেকে ২০টি উত্তর মুখস্থ করলে পরীক্ষায় ১০টি ‘কমন’ পড়ত। তবে ২০০৯ সাল থেকে এ অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে চালু করা হয়েছে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি। এখন আর কেবল কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করলে চলে না, পুরো বই পড়তে হয়। পুরো বিষয় ভালোভাবে জেনে তারপর নিজের মতো করে উত্তর করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তবে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। সৃজনশীলতা চর্চার বদলে শিক্ষার্থীরা এখনো মুখস্থবিদ্যায় ভর করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হচ্ছে। ফলে শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিলেও শিক্ষার্থীরা অন্তঃসারশূন্যই থেকে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে তাদের চাকরি জীবনেও। পাস করে চাকরি পাচ্ছে না তারা।

২০১৫ সালে দেশে স্নাতক পাস করেছে পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৬ জন শিক্ষার্থী।

এর মধ্যে ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছে ৪০ হাজার শিক্ষার্থী। আর ৮৫ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেছে ৬১ হাজার ৪৮২ জন। বাকি প্রায় চার লাখ ১৬ হাজার পাস করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। তার চেয়েও নাজুক অবস্থা জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে সেখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীই সবচেয়ে বেশি, যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করেছে মুখস্থবিদ্যার ওপর ভর করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে জোড় বছরের জন্য আগের দুই-তিন জোড় বছর ও বেজোড় বছরের পরীক্ষার জন্য আগের দুই-তিন বছরের বেজোড় সালের প্রশ্ন পড়লেই মিলে যায়। অর্থাৎ আগের দুই-তিন বছর মিলিয়ে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন করে মুখস্থ করলেই পরীক্ষায় ভালো নম্বর তোলা যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখাও হয়ে গেছে শিটনির্ভর। সেখানে বইয়ের কোনো বালাই নেই। শিক্ষকরা ক্লাসে যে দুই-চারটি শিট ধরিয়ে দেন তা পড়লেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন একজন শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়ালেখা করতে ১৮ বছর লেগে যায়। আর প্রতি শ্রেণিতেই এক বা একাধিক ইংরেজি বিষয়ও থাকে। এর পরও শিক্ষাজীবন শেষ করেও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী শুদ্ধভাবে ইংরেজি বলতে বা লিখতে পারে না। অথচ বর্তমানে যেকোনো চাকরিতেই ইংরেজিতে দখল থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক চাকরির বিজ্ঞপ্তিতেই অন্যতম শর্ত দেওয়া থাকে—প্রার্থীকে ইংরেজি বলতে, লিখতে ও বুঝতে পারার ক্ষমতা থাকতে হবে। এমনকি স্নাতকোত্তর পাস করেও অনেকে শুদ্ধভাবে বাংলাও লিখতে পারে না।

জানা যায়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই উচ্চশিক্ষায় যায় সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী। অথচ এ দেশে সম্পূর্ণ উল্টো ব্যবস্থা। কোনো রকম একটি চাকরি জোটাতে চাইলেও উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি থাকাটা জরুরি। আর সহজে সেই ডিগ্রি মিলছে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও (ইউজিসি) তাদের একাধিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, কতিপয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজ থেকে পাস করা স্নাতক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, তবু শিক্ষার প্রত্যাশিত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকা, গবেষণার অভাব, নিয়মিত ক্লাস না হওয়াসহ নানা সমস্যা রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে সেখানে কেবল মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে সুপারিশ করেছে ইউজিসি।

শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই কম। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের মানও ভালো না। শহরকেন্দ্রিক কলেজগুলো মোটামুটিভাবে চললেও মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। যত্রতত্র অনার্স খোলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে না। প্রথাগতভাবে এই শিক্ষার্থীদের দেখে মনে হচ্ছে পড়ছে, সার্টিফিকেট নিচ্ছে। কিন্তু চাকরির বাজারে তারা টিকতে পারছে না। এ জন্য উচ্চশিক্ষা অবশ্যই সীমিত করা দরকার। এসএসসির পর কারিগরিতে আরো জোর দেওয়া দরকার। ’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিবছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসনসংখ্যা সামান্য হলেও বাড়ছে। তবে বাজারে কর্মীর চাহিদা রয়েছে যেসব খাতে, সে সব খাত-সংক্রান্ত বিষয় খোলার হার তেমনভাবে বাড়ছে না। ভালো কোনো বিষয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে চাকরির বাজারে চাহিদা না থাকা বিষয়েই ভর্তি হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী। বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির। অথচ এ বিষয়ে পড়ার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা খুবই কম। এ ছাড়াও যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ রয়েছে সেখানেও আসন কম।

উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অন্যতম আগ্রহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলেও গত শিক্ষাবর্ষের হিসাব অনুযায়ী, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা মাত্র সাত হাজার দুইটি। ‘ক’ ইউনিটের ফার্মেসিতে আসন মাত্র ৬৫টি। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড  টেকনোলজি অনুষদের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান, ইলেকট্রনিকস ও কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আসন ৭০টি, ফলিত রসায়ন ও কেমি কৌশলে ৬০, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ৬০ এবং নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আসন মাত্র ২৫টি। তথ্য-প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আসন মাত্র ৩০টি। পদার্থ, গণিত, রসায়ন, পরিসংখ্যান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিভাগেও আসন একেবারেই কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ বিভাগে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তুঙ্গে থাকলেও সেখানে আসন মাত্র এক হাজার ১৭০টি। এর মধ্যে ব্যবস্থাপনা, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, মার্কেটিং ও ফিন্যান্সের প্রতিটিতে আসনসংখ্যা ১৮০টি করে। এ ছাড়া ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্সে ১২০টি, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসের প্রতিটিতে আসন ১১০টি করে।

অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন কিছু বিভাগ রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ একেবারেই কম। প্রথম সারির বিষয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত এসব বিষয়েই ভর্তি হয়।

জানা যায়, দেশে এখন কাগজে-কলমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৬টি, এর মধ্যে কার্যক্রম চালু আছে ৮৫টিতে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই রয়েছে সার্টিফিকেট পাওয়ার নিশ্চয়তা। মহাসড়কের পাশে, মার্কেটের ভেতরে, রেস্টুরেন্ট, আবাসিক ভবন, হোটেলের ওপরে, বাসস্টেশনে গড়ে উঠেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। দু-একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়েও চলছে একধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। গবেষণার কোনো ব্যবস্থা নেই, পর্যাপ্ত ক্লাসরুম নেই। রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি ও কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, পান্থপথ, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুরের ভবনে ভবনে গড়ে উঠেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কোথাও কোথাও আবার একই ভবনে রয়েছে স্কুল, কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, আর এর ওপরের তলায় গার্মেন্ট। পড়ালেখায়ও বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায় না বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাসে কিছু শিট ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেগুলো কোনো রকম পড়লেও ভালো ফল করা যায়। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদেরও অধিকাংশ বেকার থেকে যায়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়, ত্রিপক্ষীয় (শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একাংশ) সমঝোতামূলক দুর্নীতি চলছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। অলাভজনক খাত হওয়া সত্ত্বেও মুনাফাভিত্তিক খাতে পরিণত হয়েছে এগুলো। জনপ্রতি তিন লাখ টাকার বিনিময়ে ৩০০ জন শিক্ষার্থীর কাছে একটি বিশ্ববিদ্যালয় সনদ বিক্রি করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) উপাচার্য প্রফেসর ইমরান রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন অনেক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, কিন্তু তাদের স্কিল নেই। বিবিএ বা এমবিএর ডিগ্রি থাকলেই চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়, তাদের দক্ষতাও থাকতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও খেয়াল করা উচিত আমরা কী পড়াচ্ছি, কিভাবে পড়াচ্ছি। আসলে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে জব মার্কেটের খুব কমই রিলেশনশিপ আছে। গ্র্যাজুয়েটরা যাতে স্কিল নিয়ে বের হয় সে ব্যাপারটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও যখন বিভিন্ন সেকশনে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেই, তখন দক্ষ লোক খুঁজে পাই না। এতেই পুরো জব মার্কেটের অবস্থাটা বোঝা যায়। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ষাটের দশকে আমাদের সময় যখন একটা ছেলে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করত তখন তার বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান সব বিষয়েই ভালো ধারণা থাকত। কিন্তু এখন সেটা হচ্ছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন খুব সীমিত। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পড়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে। যাদের পড়ালেখায় গ্যাপ আছে তারা পড়ে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। এতে ছাত্রসংখ্যা বাড়লেও উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষ সাধন হচ্ছে না। কারণ এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম উচ্চশিক্ষার উপযোগী নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এত বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুণসম্পন্ন পড়ালেখা করানোটা অসম্ভব। তবে সরকারি কলেজগুলোকে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এতে উচ্চশিক্ষার কোয়ালিটি বাড়বে। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন যেসব কলেজ থাকবে সেখানে সিলেবাস, কোর্স পদ্ধতি ও পরীক্ষায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। তাদের পড়ালেখায় স্বকীয়তা ও সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। আর যেসব কলেজে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই সেখান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ’


মন্তব্য