kalerkantho


এক কাউন্সিলরে কাঁপে পাঁচ লাখ মানুষ

হায়দার আলী ও শরীফ আহামেদ শামীম, গাজীপুর থেকে   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এক কাউন্সিলরে কাঁপে পাঁচ লাখ মানুষ

গাজীপুরের কোনাবাড়ী মৌজায় বন বিভাগের জমিতে ৩০ বছর ধরে ছিল ৫৫টি ভূমিহীন পরিবার। ‘বনদরদি’ হিসেবে আবির্ভূত হলেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সেলিমুর রহমান সেলিম। ভূমিহীন পরিবারগুলোকে বনের জমি থেকে উচ্ছেদ করে দিলেন।

ওই ‘বনদরদি’ই পরে বনের জমিতে বানালেন ট্রাকস্ট্যান্ড। কোনাবাড়ী নতুন বাজার এলাকার ওই ট্রাকস্ট্যান্ডের সভাপতি এখন কাউন্সিলর সেলিম। সেই সুবাদে প্রতি মাসে পাঁচ লাখ টাকার বেশি চাঁদা আদায় করেন তিনি।

গাজীপুর সিটির ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গেলে উচ্ছেদ হওয়া ভূমিহীন পরিবারগুলোর কাছ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ওই ঘটনায় সেলিম ও তাঁর ক্যাডার বাহিনীর বিরুদ্ধে দুটি মামলাও করে ভূমিহীন পরিবারগুলো।

কাউন্সিলর সেলিমের বিরুদ্ধে ওই ওয়ার্ডে টাকার বিনিময়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। বাসাবাড়িতে প্রতি সংযোগ দিতে ৫০ হাজার টাকা এবং শিল্প-কারখানায় সংযোগ দিতে লাখ টাকার ওপরে আদায় করা হচ্ছে।

জমি দখল, পরিবহনে চাঁদাবাজি, অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায়, জুয়ার আসর বসানোসহ বহু অভিযোগ রয়েছে কাউন্সিলর সেলিমের বিরুদ্ধে।

আর তাঁর অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই নির্যাতনের শিকার হতে হয় প্রতিবাদকারীকে।

আর নির্বিঘ্নে এসব অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যখন যে দল বা সংগঠন দরকার তার নেতা হয়ে যান তিনি। একসময় ছাত্রদল করা সেলিম এখন আওয়ামী লীগের নেতা বলে জানা গেছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আরেক ওয়ার্ডের এক কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেলিমের ওয়ার্ডেই নয়, কোনাবাড়ীর পাঁচটি ওয়ার্ডেই সেলিম ও তাঁর ক্যাডারদের ভয়ংকর রাজত্ব। তাঁর সন্ত্রাসীদের ভয়ে শিল্প এলাকার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ তটস্থ থাকে সব সময়। ’

দখলদারত্বে ‘বনদরদী’ : ভূমিহীন পরিবারগুলোকে বনের জমি থেকে উচ্ছেদ করে ট্রাকস্ট্যান্ড বানিয়ে সেলিম ও তাঁর ক্যাডাররা এখন আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন।

উচ্ছেদ হওয়া ভূমিহীন পরিবারের লোকজন কালের কণ্ঠকে জানায়, তারা ৩০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিল। সবাইকে মারধর করে এলাকা ছাড়া করে উল্টো মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়।

ভূমিহীন রাশেদ বলেন, ‘আমারে জমি থেকে তাড়াইল আবার উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ বিভিন্ন মামলাও দিল। ওই ভয়ংকর সেলিমের বিরুদ্ধে কেউ ভয়ে মুখ খুলতে চায় না। ’

কোনাবাড়ীর সাবেক ইউপি সদস্য হেকমত আলী বলেন, ‘অসহায় ভূমিহীন পরিবারগুলোর পক্ষে কথা বলতে গিয়ে মামলা খেয়েছি। কাউন্সিলর ও তাঁর লোকজন আমার বিরুদ্ধে এবং ছেলের বিরুদ্ধেও মিথ্যা মামলা দিয়েছে। বন বিভাগের জমি থেকে নিষ্ঠুর কায়দায় গরিব মানুষগুলোকে উচ্ছেদ করে ট্রাকস্ট্যান্ড দিয়ে চাঁদাবাজি করছে সেলিম। ’

বঞ্চিত তিতাস, ফুলছে সেলিম : কাউন্সিলর সেলিমের অনুমতি ছাড়া কোনাবাড়ীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডে কেউ গ্যাস সংযোগ পায় না। অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে সেলিম ও তাঁর লোকজন হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। নিজের ওয়ার্ডসহ আশপাশের এলাকায় সেলিম ও তাঁর বাহিনী প্রায় দেড় হাজারের বেশি অবৈধ সংযোগ দিয়েছে বলে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের এক কর্মকর্তাকে মারধর করে সেলিমসহ তাঁর ক্যাডাররা। আক্রান্ত ওই তিতাস কর্মকর্তা দেওয়ালিয়াবাড়ী এলাকার ডা. মোস্তফার বাড়ির ভাড়াটিয়া ছিলেন।

এ বিষয়ে ডা. মোস্তফার কাছে জানতে চাইলে তিনি ভয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, এলাকায় বৈধ গ্যাস সংযোগের চেয়ে অবৈধ সংযোগই বেশি। প্রতি লাইনের জন্য সেলিম ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকাও নিয়েছেন। আর শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।

ক্রীড়া সংগঠককে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা : বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী মো. চেঙ্গিস খান বছরখানেক আগে কোনাবাড়ীর একটি কারখানা থেকে ১০টি মেশিন কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে কাউন্সিলর সেলিম ও তাঁর ক্যাডাররা।

চেঙ্গিস খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায় এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিতে থাকে। প্রতিবাদ করায় ক্যাডারসহ সেলিম আমাকে গুলি করতে উদ্ধত হয়। আমার পরিচয় দেওয়ার পর উল্টো বলে তোর মতো লোককে মেরে ফেললে কী হইব আমার। ’ পরে প্রশাসনের সহযোগিতায় ঢাকায় ফেরেন বলে জানান চেঙ্গিস খান।

স্কুল শিক্ষককে পিটুনি : কাউন্সিলর সেলিমের মেয়ে শাহীন ক্যাডেট একাডেমির কোনাবাড়ী শাখায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী থাকা অবস্থায় দুষ্টুমি করতে গিয়ে একসময় হাতে স্টাপলারের পিন গেঁথে যায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সেলিম ও তাঁর ক্যাডাররা ওই শাখার ইংরেজির শিক্ষক মো. শাহিন আহাম্মেদকে ওই একাডেমিতেই পিটিয়ে আহত করে। শত শত শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে শিক্ষককে মারতে মারতে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় নিয়ে যায়। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানেই আর আসেনি শিক্ষক শাহিন।

শিক্ষক শাহিনের ওপর নির্যাতনের ঘটনা নিশ্চিত করলেও এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে চাননি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম রাসেল। ভয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আব্দুল আওয়াল কালের কণ্ঠকে কেবল বলেন, ‘কাউন্সিলর সেলিমের সঙ্গে থাকা কিছু লোকজন শাহিনকে চড়-থাপ্পড় দেয়। ’

সেলিমের ক্যাডার বাহিনী : কাউন্সিলর সেলিম চলাচল করে ভিআইপি সাইরেন বাজিয়ে। তাঁর বিলাসবহুল গাড়ির আগে-পেছনে থাকে ১৫-২০ জনের ক্যাডার বাহিনী। পান থেকে চুন খসলেই সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে সেলিম বাহিনীর নির্মম নির্যাতন।

সেলিমের ক্যাডার বাহিনীর মধ্যে আছে মো. আলী, সোহেল, মিশু, শহিদ, মানিক, বিয়াই আব্দুল আওয়াল, কাউসার, নাজমুলসহ অর্ধশত সদস্য। এদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, ডাকাতি, জমি দখলসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা রয়েছে।

নির্যাতনের শিকার যারা : সেলিম ও তাঁর ক্যাডারদের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান কোনাবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান মিয়া। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেছিলেন তিনি। সেই সময় সেলিমের ক্যাডাররা দুই দফা সোলায়মান মিয়াকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায়। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। ওই ঘটনায় সোলায়মান জয়দেবপুর থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা সোলায়মান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেই কথা বলে আমি ঝামেলায় পড়তে চাই না। আমার ওপর যা হয়েছিল সেটা আল্লাহই বিচার করবে। ’

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন। জয়দেবপুর-চন্দ্রা সড়কের কোনাবাড়ী স্ট্যান্ডে পরিবহন থেকে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় নির্মমভাবে পেটানো হয় তাঁকে। কাউন্সিলর সেলিম ও তাঁর ক্যাডাররা দুই ঘণ্টা লাঠি দিয়ে পেটায় তাঁকে। প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে পালিয়ে যান আলমগীর।

আলমগীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভাইরে সেই ঘটনা নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। আমি চাই না আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে। ’

একইভাবে ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. শহিদকেও কাউন্সিলর সেলিমের ক্যাডাররা মারধর করেছিল। চাঁদা না দেওয়ায় সেলিমের ক্যাডারদের নির্যাতনের শিকার হয়েছে কোনাবাড়ীর পুকুরপার এলাকার বাচ্চু মিয়াসহ অর্ধশত ব্যক্তিকে। সেলিমের ভয়ে নির্যাতনের শিকার লোকজন মামলা কিংবা জিডি করতেও সাহস পায় না।

আরো অভিযোগ : আর কাশিমপুর কারাগারে যাওয়ার রাস্তার দুই পাশে অবৈধ দোকান থেকে প্রতি মাসে তিন থেকে চার লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে সেলিমের ক্যাডার নাজমুলসহ কয়েকজন।

কাউন্সিলর সেলিমের লোকজন বাইরে থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান এনে গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ছাত্রদল থেকে আওয়ামী লীগে : কোনাবাড়ীর মাহাবুবুর রহমানের ছেলে মো. সেলিম রহমান। সেলিম একসময় কোনাবাড়ী ইউনিয়ন ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে কোনাবাড়ী এলাকায় সেলিম ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার পালা বদলে সেই সেলিম ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে যান বলে জানা গেছে। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর হয়ে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

কোনাবাড়ী নতুন বাজার ট্রাকস্ট্যান্ডের সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী জানান, সেলিম চালক লীগের কোনাবাড়ী ইউনিটের বিলুপ্ত কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

কাউন্সিলর সেলিমের বক্তব্য : ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে নিজেই ট্রাকস্ট্যান্ড বানানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে কাউন্সিলর সেলিম বলেন, ‘আমি কোনো ভূমিহীনকে উচ্ছেদ করিনি। কারা তাদের উচ্ছেদ করেছে সেটা আমি জানি না। আর আমি ট্রাকস্ট্যান্ডের সভাপতি হয়েছি ঠিক আছে, কিন্তু উচ্ছেদের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আর চাঁদা কে উঠায় আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন আমি এগুলোর সঙ্গে জড়িত নই। ’

উচ্ছেদ হওয়া ভূমিহীনরা তাহলে মামলা কেন করল? জবাবে সেলিম বলেন, ‘কী কারণে করেছে সেটা আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন। আমি কিছুই জানি না। ’ বিএনপির রাজনীতি থেকে এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি করছিলাম বলে কী হয়েছে? দল করা কী কোনো অপরাধ?’ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত না থাকার দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি এখনো বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই আছি। ’


মন্তব্য