kalerkantho


ত্রিশঙ্কু অবস্থায় হাওরের কৃষক

হাফিজুর রহমান চয়ন, হাওরাঞ্চল   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ত্রিশঙ্কু অবস্থায় হাওরের কৃষক

বোরো উৎপাদন মৌসুমে ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং পরপর দুই বছর আগাম বন্যায় ব্যাপক ফসলহানির কারণে নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরের কৃষকরা ত্রিশঙ্কু অবস্থায়। উঁচু দুই ফসলি জমিতে গত আমন মৌসুমে ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি ফসলের ভালো দাম পাওয়ায় ওই সব এলাকার কৃষকরা বোরোর ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে

 পেরেছেন।

তবে দুই জেলার হাওরের একফসলি জমির মালিকরা পড়েছেন বিপাকে। জমির মালিকরা না পারছেন জমি চাষ করতে, না পারছেন বর্গা দিতে, আবার ফেলে রাখতেও পারছেন না নষ্ট হয়ে যাবে বলে। আর অর্থাভাবে এবার জমি আবাদ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন বর্গাচাষিরা। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে হাওর এলাকায় একফসলি অনেক জমি অনাবাদি রয়ে গেছে। তবে উঁচু এলাকায় পতিত জমির আবাদ বাড়ায় মোট আবাদের পরিমাণ খুব বেশি কমেনি। এমনকি সুনামগঞ্জ জেলায় মোট আবাদ বেড়েছে। গত মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী এবং পাশের সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও জামালগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধানি জমি এক মৌসুম পতিত থাকলেই আগাছায় নষ্ট হয়ে যায়। জমি নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হাওর এলাকার অনেক কৃষকই নামমাত্র ভাগের বিনিময়ে বর্গাচাষিদের দিয়ে আবাদ করিয়েছেন।

এমনকি কোনো কোনো কৃষক জমি আবাদ করার জন্য বর্গাচাষিদের কয়েক মাসের জন্য নগদ টাকাও দিয়েছেন ধার হিসেবে। এত কিছু করেও অনেক জমির মালিক সব জমি আবাদ করতে বা করাতে পারেননি। কেউ কেউ কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায়ও যোগ দিয়েছেন।

এই চার উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, হাওর এলাকায় কৃষকের বোরো জমি পতিত থাকা বা কোনো কৃষকের কৃষিকাজ ছেড়ে দেওয়ার কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই। তাঁরা আরো বলেন, এলাকায় গত আমন মৌসুমে রোপা আমন ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় এবং কৃষকরা তাদের ধান বেশি মূল্যে বিক্রি করায় এবার উঁচু এলাকার পতিত জমির আবাদ বেড়েছে।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গুলুয়া গ্রামের কৃষক বাবর আলী জানান, বাড়ির পাশে হাওরে তাঁর ২৬ একরের মতো বোরো জমি আছে। বরাবর সব জমি আবাদ করে এলেও অর্থ সংকটে এবার ছয় একর জমি আবাদ করতে পারেননি। অনেকটা একই রকম অবস্থার কথা জানান ধর্মপাশা গ্রামের কৃষক মুরাদ মিয়া, জয়শ্রী গ্রামের কৃষক আক্কাস মিয়া, আব্দুল হাই ও ছানু মিয়া।  

হাজার মণ ধানের জমি ৯০ মণে বর্গা : নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার দুটি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের লোকজনের বেশির ভাগ বোরো জমির অবস্থান ধর্মপাশার হাওরে। ওই জমির মালিকদের একজন মোহনগঞ্জের চানপুর গ্রামের বড় কৃষক ইমন মিয়া। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ধর্মপাশা উপজেলার ডুবাইল ও মারাধাইরা হাওরে বাপ-দাদার রাইখা যাওয়া প্রায় ২৫ একর বোরো জমি আবাদ কইরা এত বছর সংসার চালাইয়া আইতেছিলাম। কিন্তু গত দুই বছর ফসল মাইর যাওয়ায় আর ধানের দাম কম পাওয়ায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়ছি। মহাজনদের ঋণ শোধ করাসহ সংসার চালাইবার লাইগ্যা এইবার তাই কৃষিকাজ ছাইড়া আমরা পাঁচ ভাই বিভিন্ন পেশায় যুগ দিছি। ’ ইমন মিয়া আরো বলেন, ‘আমাদের ওই জমিতে আগে হাজার মণের বেশি ধান ফলাইতাম। সেই জমি যাতে নষ্ট হইয়া না যায় তার লাইগ্যা এইবার তিনজন বর্গাচাষিকে মাত্র ৯০ মণ ধানের বিনিময়ে আবাদ করনের জইন্য দিয়া দিছি উল্টা তাদের নগদ ৩০ হাজার টাকা বিনা সুদে কর্জ দিয়া। ’

১৫ একর জমির সাত একরই পতিত : একই গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান সায়েম মোহনগঞ্জ শহরে থেকে ব্যবসা ও রাজনীতি করেন। সায়েম বলেন, ‘ধর্মপাশার চরহাইজদার চক মৌজায় মারাধাইরা ও একপাইটা হাওরে আমাদের দাদার আমলের প্রায় ১৫ একর বোরো জমি আছে। দাদা মারা যাওয়ার পর থেকে প্রায় ৩৩ বছর ধরে ওই জমি বর্গাচাষিরা আবাদ করে এলেও এবার আট একর জমি মাত্র ৩৮ মণ ধানের বিনিময়ে দুজন বর্গাচাষিকে আবাদ করতে দিয়েছি। বাকি সাত একর জমিই পতিত রয়েছে। ’

চানপুর গ্রামের কৃষক স্বপন মিয়া, রতন মিয়া ও বাচ্চু মিয়া এবং মান্দারবাড়ী গ্রামের ইলিয়াস মিয়া জানান, এত বছর নিজেদের সব জমি নিজেরা আবাদ করে এলেও এবার পারেননি। কেউ কেউ পুরো জমি আর অন্যরা আংশিক জমি নামমাত্র ভাগে বর্গা দিয়েছেন বর্গাচাষিকে নগদ টাকা ধার দিয়ে।

জামালগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের বিনয় সরকার ও মুকুল সরকারের ২৫-৩০ একর জমি ধলার হাওর ও ঝাইঞ্ঝা হাওরে। এবার অর্ধেক জমি বর্গা দিতে পারলেও বাকি অর্ধেক পড়ে আছে। একই উপজেলার ফেনারবাগ গ্রামের কৃষক সাজেদুর রহমান, তোফায়েল, নবাব মিয়া এবং গজাইরা গ্রামের কৃষক আব্দুল হাসেম ও তিতাস মিয়া জানান, তাঁরাও এবার সব জমি আবাদ করতে কিংবা বর্গা দিতে পারেননি।

সুনামগঞ্জে মোট আবাদ বেড়েছে, এক উপজেলায় কমেছে : সুনামগঞ্জ জেলায় এবার বোরোর মোট আবাদ বেড়েছে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ বছর জেলায় দুই লাখ ১৫ হাজার ৮১৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চারা উৎপাদনের দিক বিবেচনা করে কৃষি বিভাগের আশা, চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দুই লাখ ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে চাষাবাদ হতে যাচ্ছে বোরো ধান। জেলায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ দুই হাজার ২৩৫ হেক্টর, চাষাবাদ হয়েছিল দুই লাখ ২০ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে। তবে জামালগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা এবং গত দুই বছর এলাকার কৃষকরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ৩৫১ হেক্টর জমি অনাবাদি রয়েছে বলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. সাফায়াত আহম্মেদ সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে জানান। তিনি আরো জানান, এবার উপজেলায় ২৫ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখানে আবাদ করা হয়েছে ২৪ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমি।

ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোয়েব আহম্মেদ জানান, এবার উপজেলায় ৩০ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখানে আবাদ হয়েছে ৩১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি। হাওর এলাকার কোনো কোনো কৃষক এবার বোরো আবাদ ছেড়ে দিয়েছেন—এমন তথ্য জানা আছে কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘হাওরের নিচু এলাকায় কিছু জমি পতিত থাকতেও পারে। তবে কোনো কৃষকের কৃষিকাজ ছেড়ে দেওয়ার কথা জানা নেই। ’ তিনি আরো বলেন, এ এলাকায় গত রোপা আমনের বাম্পার ফলন হওয়ায় এবং কৃষকরা বেশি মূল্যে ধান বিক্রি করায় এবার কৃষকরা উঁচু এলাকায় পতিত জমিতে বোরোর আবাদ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে চারটি ইউনিয়নের উঁচু পতিত জমিতে এবার বোরো আবাদ ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

নেত্রকোনা জেলায় লক্ষ্যমাত্রাই কম : নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান সায়েম বলেন, ‘বাড়ির কাছে আমাদের পাঁচ একর জমি এবার কেউ বর্গা নেয়নি। গতবার বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে ওই জমির ধান মাত্র ৩৫০ টাকা মণ দরে বেচতে হয়েছিল। ’ একই উপজেলার মান্দারবাড়ী গ্রামের ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘চরহাইজদিয়া প্রকল্পের অধীন সোনাপেডি হাওরে আমাদের তিন একর ১৮ শতক জমি অন্যান বছর ৬৫-৭০ মণ ধানে বর্গা দিতাম। এইবার দিছি মাত্র ৮০ মণে। ’

মোহনগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম নাফিস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবার উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে। কোনো হাওরে জমি অনাবাদি থাকার তথ্য আমার জানা নেই। ’

খালিয়াজুরী উপজেলার শালদিঘা গ্রামের কৃষক সুবল রায় জানান, হাওরে তাঁর ১৫ একরের মতো ধানি জমির মধ্যে এবার পাঁচ একর অনাবাদি রয়েছে। অর্থাভাবে ওই জমি আবাদ করা সম্ভব হয়নি। একই গ্রামের কৃষক দুলাল রায় ও হাবি মিয়ার অবস্থাও অনেকটা সুবল রায়ের মতোই। উপজেলার লিপসা গ্রামের কৃষক বাচ্চু মিয়া ও নয়ন মিয়া এবং হরাকান্দি গ্রামের কৃষক প্রদীপ সরকার, রবীন্দ্র বিশ্বাস, চন্দন সরকার ও খলিল মিয়ার অনেক জমিও এবার আবাদ করা যায়নি বলে জানা গেছে।

খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ওই উপজেলায় এবার ১৯ হাজার ৯৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ২০ হাজার ৭০ হেক্টর। গত বছর এ উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার ৬৫৩ হেক্টর।

নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এবার এক লাখ ৮০ হাজার ১০১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর এক লাখ ৮০ হাজার ৩০৩ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা হয়েছিল। সে বছর আবাদ হয়েছিল এক লাখ ৮২ হাজার হেক্টর জমি।    


মন্তব্য