kalerkantho


গোলাম আরিফ টিপু

শহীদ মিনার বানাই একুশের রাতেই

এম বদি-উজ-জামান   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শহীদ মিনার বানাই একুশের রাতেই

‘একটি জাতির মায়ের ভাষাই হলো সেই জাতির প্রাণ। মাতৃভাষা হারানো মানে তার সব কিছুই হারানো। আর এ কারণেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই আন্দোলনে কে হিন্দু আর কে মুসলিম, এ নিয়ে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে আন্দোলন করেছি সবাই। বায়ান্নর আন্দোলনকে আমরা কেবল ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিনি; সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, মা-বোনদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। ’ রাজশাহীতে সামনের সারিতে থেকে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া গোলাম আরিফ টিপু বললেন এসব কথা।

এখন তাঁর প্রধান পরিচয় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর (রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী)। ভাষা আন্দোলনের সময় পড়তেন রাজশাহী সরকারি কলেজে। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের গুলিতে রক্ত ঝরার খবর পেয়ে ওই রাতেই রাজশাহী কলেজে শহীদ মিনার বানিয়েছিলেন তাঁরা। জন্ম তাঁর ১৯৩১ সালের ২৮ আগস্ট।

কালের কণ্ঠ’র কাছে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করে বললেন, ‘বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। প্রথমে ছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার, পরে জেলা রেজিস্ট্রার হয়েছিলেন। পাশাপাশি অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন কঠোরভাবে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলা ব্যক্তি। এ কারণে আমাদের কড়া শাসনের মধ্যে থাকতে হতো। বাবা চাইতেন, আমরা যেন প্রকৃত মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে পারি। তাঁর চাওয়া থেকেই প্রগতিশীল হয়ে ওঠা। বাবার বদলির সঙ্গে আমাদেরও বিভিন্ন জায়গায় বাসা বদল করতে হতো। এর সুবাদে ওই সব এলাকার লাইব্রেরিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটত লাইব্রেরিতে। ’

জানা গেল, গোলাম আরিফ টিপুর বাড়ি রাজশাহীতে (বর্তমানে পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কমলকান্তপুর গ্রামে)। ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর রাজশাহী সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২—এ চার বছর একটানা সেখানে পড়াশোনা করেন। এ কলেজ থেকেই ইন্টারমিডিয়েট ও বিএ পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ-তে ভর্তি হন। ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা শেষ করার আগেই ১৯৫৪ সালে আবার রাজশাহী ফিরে যেতে হয়। সেখান থেকেই আইনে পড়াশোনা শেষে আইন পেশায় যোগ দেন।

আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলো সম্পর্কে বর্ষীয়ান এই আইনজীবী বললেন, ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাজশাহীতে ব্যাপকভাবে হরতাল পালিত হয়। সচেতন ছাত্র হিসেবে তখনই ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম। উত্তরবঙ্গের ছাত্রদের জন্য রাজশাহী কলেজই ছিল অন্যতম বিদ্যাপীঠ। এ কারণে সেখানে ব্যাপক ছাত্রছাত্রীর সমাগম ছিল। এই কলেজে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে সে সময় কলেজের ছাত্র-শিক্ষকের কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কাছ থেকে দেখেছি, তখন কলেজের অনেক শিক্ষকই প্রগতিশীল মানসিকতার ছিলেন। কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল মুনিম চৌধুরী একজন সেনা কর্মকর্তা হয়েও ছিলেন প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। এ কারণে এ কলেজে ভাষা আন্দোলন বেশ গতি পায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। বেশ কয়েকজন শহীদ হন। এ খবর সেদিনই রাজশাহীতে পৌঁছে যায়। যেহেতু কয়েক বছর আগে থেকেই ভাষার জন্য আন্দোলন চলে আসছিল, তাই একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলির খবরে রাজশাহীর ছাত্র-শিক্ষক-জনতার মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সেখানকার একজন ছাত্রনেতা হিসেবে আমার ওপর অনেক দায়িত্ব ছিল। ঢাকার খবর পাওয়ার পর কলেজ হোস্টেলেই সমাবেশ করি। রাজশাহী কলেজ ও মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা মিলে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠন করি। আমি, ডা. আবুল কাসেম চৌধুরী, ডা. মিজবাহুল হক, মহসীন প্রামাণিকসহ বেশ কয়েকজন পরিষদের নেতৃত্বে থাকি। সে রাতেই কলেজে শহীদ মিনার বানাই। এরপর আত্মগোপনে চলে যাই। আমরা কলেজ ছেড়ে যাওয়ার পর পুলিশ এসে শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর ভুবন মোহন পার্কে ছাত্র-জনতার সমাবেশ ডাকা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের বেষ্টনীর কারণে নির্ধারিত স্থানে সমাবেশ করা যায়নি। সেই সমাবেশ হয়েছে রাজশাহী ট্রেনিং কলেজে। এর কয়েক দিন পর ভুবন মোহন পার্কে সমাবেশ করা হয়। ’

গোলাম আরিফ টিপু বলেন, ‘আমি সৌভাগ্যবান। স্কুলজীবনে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দেখেছি। ছাত্রজীবনে ভাষার জন্য আন্দোলন করেছি, যা পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয়নি। আর কর্মজীবনের শুরুর দিকে দেখেছি ছয় দফা আন্দোলন, এরপর স্বাধীনতাসংগ্রাম। আমার সৌভাগ্য যে এর সবগুলোতেই অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটা কথাই বলতে চাই, আর কোনো জাতির সামনে যেন তার মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র না হয়। ’


মন্তব্য