kalerkantho


রাখাইনে সেনা অভিযান শেষ নিয়ে সন্দেহ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার    

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রাখাইনে সেনা অভিযান শেষ নিয়ে সন্দেহ

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শেষ করার ঘোষণা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দারা জানিয়েছে, গ্রামে গ্রামে সেনা টহল গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সেনাদের অত্যাচার-নির্যাতন গত কয়েক মাসের তুলনায় ক্রমেই হ্রাস পেলেও ‘সেনা অভিযান শেষ করার ঘোষণা’ রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দারা আস্থায় নিতে দ্বিধায় রয়েছে।

চার মাস ধরে মিয়ানমারে চলা সেনা অভিযানকে জাতিসংঘ ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এবং ‘আদিবাসী উচ্ছেদ অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

গত বছরের ৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যের তিনটি এলাকায় সে দেশের কয়েকটি বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় ৯ জন বিজিপি সদস্য নিহত হয়। সেই সঙ্গে লুট হয় অস্ত্রশস্ত্র। এর পর থেকে ওই রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু করে সরকার। এ সেনা অভিযানের মুখে এরই মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফে।

জার্মানির গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানায়, মিয়ানমারে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং টুন গত বুধবার এক বিবৃতিতে জানান, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল। সেনা অভিযান বন্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া কারফিউও শিথিল করা হয়েছে। কেবল শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে পুলিশ মোতায়েন আছে।

প্রেসিডেন্টের অফিস বলছে ভিন্ন কথা। সেখানকার দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও তথ্যমন্ত্রী রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে সেনা অভিযান বন্ধের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছেন। তবে সেখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সেনাবাহিনী এখনো অবস্থান করছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। অবশ্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত বুধবার রাতে মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তারা রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন। কূটনীতিক ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেন, অভিযানে কেউ যদি বলপূর্বক কিছু করে থাকে বা মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

এই চার মাসে কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সে ব্যাপারে আলাদাভাবে দুটি তদন্তদল গঠন করেছে। অং সান সু চি জাতিসংঘকে এ ব্যাপারে অঙ্গীকার করার পরই দুটি তদন্তদল গঠন করা হয়।

গত সপ্তাহে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করছেন এমন দুই জাতিসংঘকর্মী রয়টার্সকে জানান, সেনা অভিযানে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট অফিস থেকে বলা হয়েছে, ওই অভিযানে ১০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

নাফ নদের একদম তীরবর্তী রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা সেনা অভিযান শেষ করার বিষয়ে গতকাল জানিয়েছে, নদীতীরের মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির ক্যাম্প থেকে সে দেশের সেনা সদস্যরা সরে গিয়ে আরো একটু পেছনে অবস্থান করছে। রাখাইনে সেনা অভিযান আগের তুলনায় কয়েক দিন ধরে হ্রাস পেলেও একদম বন্ধ হয়নি।

ওই রাজ্যের কিয়াংপুরু গ্রামের একজন রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। তিনি জানান, সেখানে সেনা টহল চলছে। গতকাল সকালেও রাখাইন রাজ্যের হাতিপাড়া গ্রামে সেনারা গিয়ে ১২ বছরের এক শিশু এবং অন্য এক বৃদ্ধকে ধরে নিয়ে গেছে।

এই রোহিঙ্গা নারী জানান, গত অক্টোবরে শুরু হওয়া সেনা অভিযানের শিকার হয়ে তাঁর দুই ভাই এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তাঁর আত্মীয়স্বজনের অনেকেই পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তবে এরই মধ্যে বেশ কজন স্বদেশে ফিরেও গেছে বলে জানান তিনি।

এক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ইউরোপ-আমেরিকায় পাঠাতে চায় জাতিসংঘ : বিবিসি বাংলা জানায়, বাংলাদেশ থেকে এক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ভিন্ন কোনো দেশে নিয়ে যেতে চায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা বা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের কিছু দেশে এক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশপ্রধান শিনজি কুবো জানিয়েছেন, এক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ভিন্ন কোনো দেশে পুনর্বাসনের জন্য তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি চেয়েছেন। তিনি জানান, এসব রোহিঙ্গাকে ভিন্ন কোনো দেশে নিয়ে যেতে হলে সেসব দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে। কিন্তু সেসব দেশের সঙ্গে যাতে আলোচনা শুরু করা যায় সে জন্য বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন নিতে হবে আগে। কারণ বাংলাদেশের সরকারের অনুমতি না থাকলে এসব শরণার্থী এ দেশ ত্যাগ করতে পারবে না।

এর আগে বিভিন্ন সময় মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় পুনর্বাসন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার এ পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া স্থগিত করে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ইউরোপ-আমেরিকায় পুনর্বাসনের বিষয়টিকে বাংলাদেশ সরকার সমর্থন করে না। সরকার মনে করে, ভিন্ন কোনো দেশে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার প্রক্রিয়া চালু থাকলে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।


মন্তব্য