kalerkantho


১২৩ অবৈধ নার্সে ঝুঁকিপূর্ণ সেবা

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



১২৩ অবৈধ নার্সে ঝুঁকিপূর্ণ সেবা

চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল। ৬৫০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী চিকিৎসাধীন থাকে।

আউটডোরে দিনে গড়ে সাত শতাধিক রোগী চিকিৎসাসেবা নেয়। ১৬৯ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স কর্মরত রয়েছেন হাসপাতালে। তবে প্রতিদিন তিন শিফটে কর্মরত এই সিনিয়র স্টাফ নার্সের মধ্যে বর্তমানে ১২৩ জনেরই বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের (বিএনসি) রেজিস্ট্রেশন নেই, বিএনসির সনদপত্রও নেই। তাঁদের অনেকে বৈধ রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই সর্বনিম্ন ছয় বছর থেকে সর্বোচ্চ ২২ বছর ধরে কাজ করছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিনিয়র স্টাফ নার্সদের দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠান চালালেও সংশ্লিষ্টদের কোনো নজরদারি ছিল না। প্রতিবছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএনসি, নার্সিং অধিদপ্তর, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), জেলা সিভিল সার্জনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালটি পরিদর্শন করলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি।

বিষয়টি জানার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএনসিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘রোগীর ঝুঁকির বিষয়টি তো আছেই। বিএনসির রেজিস্ট্রেশন না থাকার অর্থই হলো ওই সিনিয়র স্টাফ নার্সরা অবৈধ। রোগীর সেবা দেওয়ার বৈধতা নেই তাঁদের।

জানা গেছে, ১৯৯০ সালে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের অধীন নার্সিং ইনস্টিটিউট চালু করা হয় নগরীর আগ্রাবাদে জাম্বুরি মাঠসংলগ্ন এলাকায়। তবে এ জন্য বিএনসির অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এরপর চার বছরের ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সে প্রতি শিক্ষাবর্ষে ২০ জন করে ছাত্রী ভর্তি করা হয়। ভর্তির সময় তাঁদের বলা হয়েছিল, পাস করার পর তিন বছর হাসপাতালে চাকরি করা বাধ্যতামূলক। অন্যত্র চাকরি করলে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।

ওই ইনস্টিটিউট থেকে পাস করার পরও বিএনসির নিবন্ধন না পাওয়া সিনিয়র স্টাফ নার্সরা বলছেন, ‘চার বছরের কোর্স শেষে নার্সরা হাসপাতালে যোগ দেন। পাস করার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের সনদ দিলেও বিএনসি এখনো রেজিস্ট্রেশন দেয়নি। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানোর একপর্যায়ে গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি কর্মরত নন-রেজিস্টার্ড স্টাফ নার্সদের সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে পদোন্নতি দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ জন্য আমরা দায়ী নই, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী। আমরা যদি পাস না করতাম তাহলে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কিভাবে হাসপাতাল প্রশাসন পদোন্নতি দিল?’

জানা যায়, বিএনসির অনুমোদন ছাড়াই ওই নার্সিং ইনস্টিটিউটে ১৯৯০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ১৭টি ব্যাচে ডিপ্লোমা কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সেই শিক্ষার্থীরা পাস করার পর বিএনসি তাঁদের রেজিস্ট্রেশন বা সনদ দেয়নি। পরে ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে ইনস্টিটিউটকে স্বীকৃতি দেয় বিএনসি। অনুমোদন পাওয়ার পর যে শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হয়েছে তাদের সনদ ও রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে বিএনসি।  

বিএনসির রেজিস্ট্রেশন না পাওয়া এক সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন, “রেজিস্ট্রেশনের দাবি জানালে কর্তৃপক্ষ আমাদের বলে, ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে এক বছর মেয়াদি ‘নার্সিং ব্রিজ প্রোগ্রাম’ কোর্স চালু হয়েছে। এ কোর্স করলে আমাদের রেজিস্ট্রেশন হবে। কথামতো আমরা ৫০ জন, যারা মা ও শিশু নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং পাস করেছি, তারা ভর্তি হই। এ জন্য আমাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে তিন বছরে একেকজনের কাছ থেকে ৩৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। ”

বিএনসির অনুমোদন পাওয়ার আগে ভর্তি হওয়া ১৫তম (২০০৪-০৫) ব্যাচের এক ছাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মা ও শিশু নার্সিং ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইন নার্সিংয়ে অধ্যয়নের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর ভর্তি হয়েছিলাম। পাস করার পরও রেজিস্ট্রেশন পাইনি দীর্ঘদিন ধরে। শুধু আমি নই, ১৯৯০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এ ইনস্টিটিউট থেকে প্রতি ব্যাচে ২০ জন করে ছাত্রী ভর্তি হয়েছিল। তাদের কারো বিএনসির রেজিস্ট্রেশন নেই। বিএনসির অনুমোদন পাওয়ার পর ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা পাস করার পর তাদের মধ্যে ৬৩ জনের সরকারি চাকরি হয়েছে গত ডিসেম্বরে। আমার দুই চাচাতো ও ফুফাতো বোনেরও চাকরি হয়েছে। কিন্তু আমরা যারা রেজিস্ট্রেশন পাইনি তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক অনিতা তালুকদার গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নতুন যোগ দিয়েছি। শুনেছি তাদের (নন-রেজিস্টার্ড সিনিয়র স্টাফ নার্স) রেজিস্ট্রেশনের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। ’ রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই কর্মরত ১২৩ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেন, ওরাই তো হাসপাতাল চালাচ্ছে। রেজিস্ট্রেশন না থাকায় তারা শুধু সরকারি চাকরি পাচ্ছে না। তবে বেতন-ভাতা, পদোন্নতিসহ সব সুযোগ-সুবিধা তারা পাচ্ছে। পাসও করেছে এখান থেকে। ’

বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, কোনো নার্সিং কলেজ বা ইনস্টিটিউট ডিপ্লোমা ও বিএসসি নার্সিং কোর্স চালু করলেও বিএনসি-ই হচ্ছে তাদের একমাত্র কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করার পর ঢাকায় বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার পর পাস করলে স্টাফ হিসেবে তাদের বিএনসি রেজিস্ট্রেশন দেবে। এর আগে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং পাস করলে সার্টিফিকেট দেবে বিএনসি। এর বাইরে সার্টিফিকেট ও রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল অবৈধভাবে অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্স খুলে নিজেরাই সার্টিফিকেট দিয়ে থাকলে তা অবৈধ। এই প্রতিষ্ঠান কিভাবে সনদ দেবে?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. সাইদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশনের মানেই হচ্ছে সরকার তাকে (নার্স) ক্ষমতা দিল সেবা দেওয়ার জন্য। এ রেজিস্ট্রেশন না থাকলে সেবা দিতে পারবে না। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া সেবা দেওয়াটা অবৈধ। ’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পরিচালক আরো বলেন, ‘রোগীর ঝুঁকিটা তো পরের বিষয়। তারা (রেজিস্ট্রেশনবিহীন নার্সরা) তো অবৈধ। কিভাবে সেবা দেবে। তাদের সনদও নেই, আবার নিবন্ধনও নেই। আমি চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ও জেলা সিভিল সার্জনকে বলব বিষয়টি খবর নিয়ে জানাতে। ’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মা ও শিশু নার্সিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ঝিনু দাশ বলেন, ‘শুনেছি ১৯৮৯ সাল থেকে নার্সিং ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্স চালুর পর ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে অনুমোদন আছে। ’ এর আগে অনুমোদন ছাড়া ডিপ্লোমা ইন কোর্স চালুসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এসব বিষয়ে কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালক ডা. নুরুল হক বলেন, ‘এই হাসপাতাল অনেক পুরনো। আউটডোর সেবা দিয়ে শুরু হয়েছে। সেবার প্রয়োজনে লোকবল তৈরি করতে হয়েছে। এত দিন পর এসে আগের বিষয়গুলো উত্থাপন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি বিএসসি ইন নার্সিং কলেজগুলো চিকিৎসা অনুষদের অধিভুক্ত। কিন্তু ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্স আমাদের অধিভুক্ত নয়। তবে চিকিৎসকরা যে রকম বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চিকিৎসক হতে পারে না, তেমনি বিএনসি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া নার্সরা কিভাবে বৈধ হিসেবে রোগীর সেবা দেবে? এ রকম হয়ে থাকলে তা আইনবহির্ভূত। ’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমরা মা ও শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করি। পরিদর্শনের পর কর্তৃপক্ষকে বলেছি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক-নার্সদের তালিকাসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র দেওয়ার জন্য। গত বৃহস্পতিবার তাঁরা আমার কার্যালয়ে কাগজপত্র পাঠিয়েছেন, এখনো দেখিনি। দেখলে বলতে পারব রেজিস্ট্রেশন ছাড়া শতাধিক নার্স কিভাবে হাসপাতালে রোগীর সেবা দিচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। ’


মন্তব্য