kalerkantho


বিএনপির ভাবনায় একাধিক প্রস্তাব

হাসিনাকে প্রধান রেখেই সহায়ক সরকার!

এনাম আবেদীন   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হাসিনাকে প্রধান রেখেই সহায়ক সরকার!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান রেখেই ‘সহায়ক সরকারের’ একাধিক প্রস্তাব নিয়ে বিএনপিতে চিন্তাভাবনা চলছে। দলটির ‘থিংকট্যাংক’ বলে পরিচিত গবেষণা সেল এ নিয়ে কাজ করছে। তবে এসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলটির গবেষণা সেলে থাকা বুদ্ধিজীবীরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেরপ্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এ জন্য বিভিন্ন দেশের সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কী আছে তা পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। সূত্র মতে, পর্যালোচনা শেষে বিএনপির ভাষায় ‘সহায়ক সরকারের’ রূপরেখার একাধিক বিকল্প প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করা হবে। আর ওই খসড়া বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে। সূত্র মতে, স্থায়ী কমিটির অনুমোদনের পরই প্রস্তাবটি জনগণের সামনে উপস্থাপন করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

এর আগে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে ১৩ দফা সুপারিশসংবলিত প্রস্তাব গত ১৮ নভেম্বর উপস্থাপনের সময় খালেদা জিয়া জানিয়েছেন, সহায়ক সরকারের প্রস্তাব যথাসময়ে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে। বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে সহায়ক সরকারের বিষয়টি তিনি প্রথম জনসমক্ষে আনেন। এতে বিভিন্ন মহল থেকে মনে করা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে বিএনপি সরে এসেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অটল থেকেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি।

জানতে চাইলে শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সহায়ক সরকারের প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত করতে সময় লাগবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধানের মধ্যে থেকেই একাধিক প্রস্তাব তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে। তাঁর মতে, সংবিধানের ১২৩-এর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ অবসানের আগে ও পরে দুইভাবেই নির্বাচন করার সুযোগ আছে। বিএনপি ওই ধারাই পর্যালোচনা করে দেখছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবের বিষয়গুলো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে তাতে কী থাকছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেবে এটুকু বলা যায়। এ নিয়ে কাজও শুরু হয়েছে। তবে তাতে কী থাকছে তা এখনই বলার বিষয় নয়।

দলের ভাইস চেয়ারম্যান প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন জানান, সহায়ক সরকার নিয়ে বিএনপিতে কাজ চলছে। এটি চূড়ান্ত করতে সময় লাগবে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের আরেক আইনজীবী নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি এবার অবাস্তব কোনো প্রস্তাব দেবে না। সুধীসমাজসহ সবার কাছে যৌক্তিক, এমন প্রস্তাব দেওয়ার কথাই ভাবা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে ওই নেতা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন সংবিধানে নেই। তাই শেখ হাসিনাকে রেখে সংবিধানের মধ্যেই কী করা যায় তা-ই ভাবা হচ্ছে।  

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩-এর (৩)-এ বলা হয়েছে, ‘মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। ’

বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতারা বলেন, সরকার ইচ্ছা করলে সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে ও পরে দুভাবেই নির্বাচন করতে পারে। তবে সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশসংবলিত প্রস্তাব দিতে চায় বিএনপি। দলটির নেতাদের মতে, ওই সময় নির্বাচন হলে সংসদ ও মন্ত্রিসভা থাকবে না। আর ওই দুটি না থাকলে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা এমনিতেই কমে যাবে। নেতাদের মতে, ওই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে রেখে বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে প্রশাসন এমনিতেই নিরপেক্ষ হয়ে যাবে। তা ছাড়া নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ তথা নির্বাচনী জোয়ারও তৈরি হবে দেশে। ফলে ওই সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলেও নির্বাচনে তিনি খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন না বলে দলটির অনেকে মনে করছেন।

তা ছাড়া শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেওয়া হলে মহাজোট সরকার এককথায় তা নাকচ করে দিতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। তার চেয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব স্পষ্ট করার জন্য শেখ হাসিনাকে রেখে প্রস্তাব দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক মহলের পাশাপাশি সুধীসমাজের মধ্যেও তা গ্রহণযোগ্য হবে। এমনকি এ ধরনের প্রস্তাব সরকারের মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিএনপির বড় একটি অংশ মনে করে। ফলে শেখ হাসিনাকে রেখে তাঁর ক্ষমতা নানা কৌশলে সংকুচিত করা, নির্বাচনকালে সব দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়োগ—এসব প্রস্তাবও বিএনপির সহায়ক সরকারের রূপরেখায় থাকবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই, এটি বিবেচনায় নিয়েই বিএনপিকে কৌশল ঠিক করতে হবে। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা থাকুক, কিন্তু ওই সরকারের ১৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা থাকা উচিত এবং সেখানে সাতজন আওয়ামী লীগ থেকে ও আটজন বিএনপিসহ বিরোধী দল থেকে নেওয়া উচিত। তবে তাঁর মতে, সহায়ক সরকারের প্রস্তাব কেবল ঘরে বসে দিলেই হবে না। ওই দাবি মানানোর জন্য বিএনপিকে রাজপথে নামতে হবে।


মন্তব্য