kalerkantho


সেচের পানি জোগাতে পারছে না তিস্তা

স্বপন চৌধুরী, রংপুর ও হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সেচের পানি জোগাতে পারছে না তিস্তা

বর্ষার প্রমত্তা তিস্তার বুকজুড়ে এখন শুধুই বালুচর। ছবি : কালের কণ্ঠ

বর্ষায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল তিস্তা। প্লাবিত করেছিল দুই পাশের বিস্তীর্ণ এলাকা।

লালমনিরহাট, রংপুর, নিলফামারী ও কুড়িগ্রামের হাজার হাজার মানুষকে নিঃস্ব করে দিয়েছিল। প্রাণক্ষয় রোধের জন্য কয়েক দফায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সেই তিস্তা মৃতপ্রায়। উজান থেকে যেটুকু পানি বাংলাদেশে ঢুকছে এর সবটুকুই সেচের প্রয়োজনে পাঠানো হচ্ছে তিস্তা সেচ প্রকল্পের খালে। কিন্তু প্রকল্পাধীন তিন জেলার ১২ উপজেলার মধ্যে শুধু নীলফামারীর তিন উপজেলা পানি পাচ্ছে।

তিস্তা ব্যারাজের সব জলকপাট বন্ধ। ফলে লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার ওপর দিয়ে যাওয়া মূল নদীতে পানি নেই, শুধু রাশি রাশি বালু। কৃষকরা সেচসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, বেকার হয়ে পড়েছে মত্স্যজীবীরা।

লালমনিরহাট, রংপুর ও নীলফামারী জেলার নদীতীরবর্তী এলাকা ও সেচখাল ঘুরে দেখার সময় লোকজন জানায়, ভারত গজলডোবা ব্যারাজ থেকে তিস্তার পানি একতরফা নিয়ে নেয়।

ফলে দিন যত যাচ্ছে ততই এ নদী ম্রিয়মাণ হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢলে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। আর শুষ্ক মৌসুমে লাখ লাখ কৃষকের বোরো আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরবর্তী ভারত সফরে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান হবে বলে এ জনপদের মানুষ আশা করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ও গত বুধবার লালমনিরহাটের হাতিবান্ধার দোয়ানীতে গিয়ে দেখা গেছে, তিস্তা ব্যারাজের ৪৫টি জলকপাটের সব বন্ধ। উজান থেকে যতটুকু পানি আসছে তার এক ফোঁটাও নামতে পারছে না মূল নদীতে। ব্যারাজের বাম পাশের সাতটি কপাট রয়েছে খোলা। সেখান থেকে নদীর পানি গিয়ে পড়ছে তিস্তা সেচ প্রকল্পের মূল খালে। মূল নদীর ভাটির দিকে যতদূর দৃষ্টি যায় ততদূর শুধু বালি। ব্যারাজের কাছেই বেঁধে রাখা হয়েছে অসংখ্য ছোটবড় নৌকা। অনেককে দেখা গেল হেঁটে নদী পার হতে। ব্যারাজ পেরিয়ে নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার দিকে এগোলে চোখে পড়বে, সেচ খালগুলোতে পানির প্রবাহ কম। রংপুরের গঙ্গাচড়ার আলমবিদিতর, বেতগাড়ি, বড়বিল প্রভৃতি এলাকায় সেচের খালে পানির দেখা মেলেনি। খালে ঘাসের ঝোপ গজিয়েছে। কয়েক বছর ধরে পানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে সেখানকার লোকজন জানায়।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৩ সালে তিস্তা সেচ প্রকল্প (পর্যায়-১) চালু হয়। নীলফামারীর সদর, জলঢাকা, সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ ও ডিমলা উপজেলা, রংপুরের সদর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা এবং দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর ও খানসামা উপজেলায় সেচ, নিষ্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি চালু হয়।

তিস্তা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ জানায়, পানির অভাবে বাধ্য হয়ে কমানো হচ্ছে সেচের পরিধি। কমতে কমতে এমন পর্যায়ে এসেছে যে এখন শুধু নীলফামারী সদর, জলঢাকা ও ডিমলা উপজেলার খালে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব এলাকার চাষিরা বোরো মৌসুমে সেচের পানি পাচ্ছে। বাকি এলাকার কোথাও বোরো আবাদ কমে গেছে, কোথাও চাষিরা অন্য উপায়ে সেচের ব্যবস্থা করেছে। এতে খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। কোথাও পানির অপ্রতুলতার কারণে নষ্ট হতে বসেছে কিছুদিন আগে রোপণকৃত বোরো ধানের চারা।

তিস্তা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি মৌসুমে তিস্তার পানি এক থেকে দেড় হাজার কিউসেকে ওঠানামা করছে। পরিমাণ আরো কমে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারি-মার্চকে বোরো চাষের ‘পিক টাইম’ বিবেচনা করে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের সেচ সম্প্রসারণ বিভাগ।

সেচ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ মৌসুমের জন্য গত ১৫ জানুয়ারি সেচ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। পানির অভাবে ১২টি উপজেলার মধ্যে মাত্র তিনটি উপজেলায় সেচসুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ’

সেচ প্রকল্প এলাকার কৃষকদের চেয়েও বেশি সমস্যায় পড়েছে লালমনিরহাটের তিস্তা তীরবর্তী পাঁচ উপজেলা এবং রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার মানুষ। বর্ষায় তারা প্রায় সব কিছু হারায়, আবার শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজের জলকপাট বন্ধ থাকায় পানির দেখা পায় না। তিস্তার তীরে থেকেও ধান, পাট, ভুট্টা, আলু প্রভৃতি ফলানোর জন্য পানি পায় না তারা। বেকার হয়ে পড়েছে অসংখ্য মত্স্যজীবী মানুষ।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার পারুলিয়ার কৃষক আশরাফুল বলেন, ‘বন্যার সময় আমরা জমিজমা, বসতবাড়ি সব হারাই। আবার শুকনা মৌসুমে পানি না পেয়ে ঠিকভাবে আবাদ করতে পারছি না চরাঞ্চলের জমিতে। ’

লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছের আলম বলেন, ‘তিস্তা আমাদের বর্ষাকালেও মারছে, শুকনা মৌসুমেও মারছে। আমরা আর কুলাতে পারছি না। ’

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিলের কৃষক রহমান আলী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় সেচ প্রকল্পের খাল নির্মাণ করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখানে পানি আসে না। ফলে বেশি খরচ দিয়ে বিকল্প সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ করতে হয়। ’

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের চর বৈরাতীর মত্স্যজীবী আলম বলেন, ‘আমাদের জমিজমা নেই। বাপ-দাদার আমল থেকে নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাই। কিন্তু নদীতে পানি নাই। আমরা এখন বেকার। ’

তিস্তা ব্যারাজের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখন যতটুকু পানি পাওয়া যাচ্ছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তা বোরো ক্ষেতে সেচের জন্য দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হলে তিস্তায় পানির প্রবাহ বাড়বে, সেচের আওতাও বাড়বে।


মন্তব্য