kalerkantho


নতুন ইসির প্রথম বৈঠক

সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের আগ্রহ

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের আগ্রহ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো. নুরুল হুদা গতকাল বৃহস্পতিবার চার কমিশনারকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতিমূলক প্রথম বৈঠকে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে নতুন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। ইসি সচিবালয় কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচনী  আইনের কিছু বিষয় উপস্থাপনের সময় প্রতিটি নির্বাচনেই ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে আইন থাকার তথ্য কমিশনকে জানানো হয়েছে।

গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া গত ১১ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ যে চার দফা প্রস্তাব রাখে তার একটি হলো ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ই-ভোটিং’ প্রবর্তন করা। এতে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই ধারণা, খান মো. নুরুল হুদার কমিশন এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকরী কোনো উদ্যোগ নিতে পারে।  

ইসি সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে জানা যায়, তাঁদের সঙ্গে প্রথম পরিচিতিমূলক বৈঠকে নতুন সিইসি বলেছেন, ‘আমরা যাঁরা সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে যোগদান করেছি, শপথ নিয়েছি, আমাদের একটাই কথা, দল-মত নির্বিশেষে সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব। আমার একটাই কথা, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরা কাজ করতে বদ্ধপরিকর। ’ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী কিছু নির্বাচন সম্পর্কে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মতামত জানার পর নুরুল হুদা আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ কতগুলো অত্যন্ত সফল নির্বাচন উপহার দিয়েছে, আর যে নির্বাচনগুলো বিতর্কিত ছিল, তা কেন বিতর্কিত ছিল, তা বিশ্লেষণে আমি যাব না। তবে একটা কথাই বলতে পারি, আপনারা অনেকেই বলেছেন যে ইনক্লুসিভ নির্বাচন ছিল না বলেই বিতর্কিত ছিল। নির্বাচন যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক না হয়, যদি সব দলের অংশগ্রহণ না থাকে, সে ক্ষেত্রে নির্বাচন বিতর্কিত হবেই।

সুতরাং আমরা আশা করব, সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। ’

ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে সকাল ১০টার দিকে সিইসির নেতৃত্বে নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের প্রতি।  

সাভার থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে সই করার পর অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিইসি। ওই সময় তিনি নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বলে মন্তব্য করেন। তাঁর নিয়োগ নিয়ে বিএনপির নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমার কোনো প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য নেই। ’

সিইসি বলেন, ‘আমরা এখনো সেভাবে চেয়ারেই বসিনি। তাই বিস্তারিত কিছু বলার সময়ও আসেনি। তবে এতটুকুই বলব, আমরা আন্তরিক। দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি, যাতে আমরা সার্থক হতে পারি। ’

জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছলে নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের স্বাগত জানান ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মজিবুর রহমান।

এদিকে ইভিএম নিয়ে ইসির প্রস্তুতি ও সক্ষমতা সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) উদ্ভাবিত এক হাজার ২৩০টি ইভিএম গত সাড়ে তিন বছর ধরে পড়ে থাকার পর কমিশন এখন নতুন ধরনের ইভিএম প্রচলনের কথা ভাবছে। গত ২৫ জুলাই নির্বাচন কমিশনের কাছে এই নতুন ইভিএম প্রটোটাইপ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দিন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বুয়েট উদ্ভাবিত যন্ত্রে ভোটার শনাক্ত করার ব্যবস্থা ছিল না। নতুন ইভিএমে সে ব্যবস্থা থাকবে। ভোট দেওয়ার আগে বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে ভোটার শনাক্ত করে তাঁকে একটি স্লিপে কোড জানানো হবে। সেই কোডের মাধ্যমে ভোটার ভোট দিতে পারবেন। এ মেশিনে ভোটের তথ্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ মেমোরি থাকবে। এর ফলে ভোট পুনর্গণনারও সুযোগ পাওয়া যাবে। নতুন ইভিএম বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) মাধ্যমে তৈরি করা হতে পারে। সাবেক সিইসি এই যন্ত্রের নাম ডিজিটাল ভোটিং মেশিন বা ডিভিএম রাখার প্রস্তাব রেখে যান।

নতুন যন্ত্রের উপযোগিতা যাচাই করার জন্য ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমানের নেতৃত্বে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে ইসি। এতে উপদেষ্টা হিসেবে আছেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের প্রতিনিধিরাও কমিটিতে আছেন। গত ২৮ নভেম্বর কমিটির প্রথম সভা হয়।

ওই কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমান গতকাল বলেন, কমিটি মাত্র একটি বৈঠকই করেছে। আরো কয়েকটি বৈঠকের পর প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

ইসি সচিব মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ গত সোমবার এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, নতুন এ ইভিএম সম্পর্কে কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার মতে, নতুন ইভিএম সম্পর্কে কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত কিছু নয়। এ বিষয়ে সরকারের কাছে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠাতে হবে। সে প্রস্তাব অনুমোদন হওয়ার পর ইভিএম তৈরি শুরু হতে পারে। এরপর নতুন ইভিএম নিয়ে প্রশিক্ষণ ও ভোটার সচেতন করার বিষয়ও রয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধিতাও দেশে ‘ই ভোটিং’-এর জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

ইসির তথ্য অনুসারে সর্বশেষ ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি করে ওয়ার্ডের মাত্র ১৩টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর মধ্যে রাজশাহী সিটির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এক কেন্দ্রে সাতটি ইভিএম বুথের মধ্যে একটিতে মেশিনে সমস্যা দেখা দেয়। এ কারণে ওই কেন্দ্রে কাউন্সিলর পদে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট নেওয়া হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই কাজী রকিবের কমিশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।


মন্তব্য