kalerkantho


২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের প্রস্তাব সংসদে

► প্রধানমন্ত্রীর একমত প্রকাশ
► নতুন ইসিকে অভিনন্দন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের প্রস্তাব সংসদে

একাত্তরের ২৫ মার্চ স্মরণে আগামীতে দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব করা হয়েছে জাতীয় সংসদে। এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে যাতে পালন করা হয় সে জন্য জাতীয় সংসদেও প্রস্তাব আনা যেতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবেও দিবসটি যাতে পালিত হয় সে জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে প্রয়োজনীয় সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত পাঠিয়ে জোর দাবি জানানো হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতেই বিষয়টির অবতারণা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মদদে পাকিস্তানের জুনায়েদ আহমেদ ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথস এক্সপ্লোডেড’ বই লিখে তাতে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কর্তৃক এ দেশের গণহত্যাকে মুক্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। বইটি সংসদে দেখিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণার দাবি জানান। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরাও এ সময় দাঁড়িয়ে ওই বইয়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।  

স্পিকার সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের দাবি জানিয়ে এরই মধ্যে একজন সদস্য সংসদ সচিবালয়ে একটি নোটিশ জমা দিয়েছেন।

ওই নোটিশ এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী তা গ্রহণ করে অগ্নিঝরা মার্চের যেকোনো একটি দিনে এ নিয়ে সাধারণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে।

এর আগে বিষয়টি সংসদের দৃষ্টিতে এনে তোফায়েল আহমেদ বলেন, “আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, ৩০ লাখ শহীদ, এক কোটি লোক গৃহহারা ও লাখো মা-বোনের লাঞ্ছিত হওয়ার সব ঘটনাকে ওই বইয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। একটি ঐতিহাসিক ছবি আছে যেটি বিশ্বব্যাপী পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, লেখা আছে ‘ম্যাসাকার অব পাকিস্তানি আর্মি’। ছবিতে পাশে পড়ে আছে নিহত রিকশাওয়ালার লাশ। সেই ছবিটাতে তারা (পাকিস্তান) ক্যাপশন দিয়েছে ‘ম্যাসাকার অব অর্ডিনারি সিভিলিয়ান্স বাই মুক্তিবাহিনী ইন ৭১’। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই। ”

২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আইএসআই পাকিস্তান সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের কত বড় দুঃসাহস যে বিকৃত তথ্য দিয়ে বই লিখে সেটি আমাদের হাইকমিশনে পাঠায়। আমরা সংসদ থেকে এর নিন্দা জ্ঞাপন করি। ’

তোফায়েল আহমেদের দাবির প্রতি একমত পোষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একাত্তরে জেনারেল ইয়াহিয়া বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালিয়েছে তা সবারই জানা। হানাদার বাহিনীর সেই গণহত্যার তথ্য শুধু দেশে নয়, পাকিস্তানসহ বহু দেশেই রয়েছে। এখন পাকিস্তান তাদের গণহত্যার দায় উল্টো মুক্তিবাহিনীর ওপর চাপিয়ে নিজেদের দোষ ঢাকার চেষ্টা করছে। এমন বই লেখা এবং তা বাংলাদেশে পাঠানোর সাহস তারা (পাকিস্তান) কোথা থেকে পেল। তাদের আমরা ধিক্কার জানাই। ’

ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদ নেতা বলেন, ‘এর আগে খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়নি! যে কথাটি দেশের প্রত্যেকটি মানুষ জানে ও স্বীকার করেন। সেখানে বিএনপি নেত্রী গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেই বিদেশি প্রভুদের সুযোগ করে দেওয়া—এটাই বোধ হয় তাঁর (খালেদা জিয়া) ইচ্ছা ছিল। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণহত্যা চালিয়ে পাকিস্তান যে অপরাধ করেছে তার জন্য তাদের বারবার বলা হয়েছে, তোমরা মাফ চাও। তারা মাফ তো চায়ইনি, উল্টো এখন তাদের অপকর্মের দায়ভার আমাদের মুক্তিবাহিনীর ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিষয়টি নিয়ে আমি মনে করি, আমাদেরকেই উদ্যোগ নিতে হবে। ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য যথাযথভাবে একটি প্রস্তাব আমরা সংসদে আনতে পারি। সেই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকেও সব তথ্য দিয়ে আমরা দাবি জানাব আন্তর্জাতিকভাবে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান সব যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দিয়ে পুনর্বাসনও করেছিলেন। এদের হাতেই লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি। এ কারণেই বোধ হয় তারা (পাকিস্তান) মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবার অপপ্রচার শুরু করেছে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের কোথায় কোথায় গণকবর রয়েছে, কারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে—সেসব তথ্য সংগ্রহে আমরা চেষ্টা করছি। আর একাত্তরে হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের সঙ্গে নিয়ে কিভাবে গণহত্যা চালিয়েছে তা নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। আর অন্ধকার নয়, যে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছি তা অব্যাহত রাখতে হবে দেশবাসীকে। ’

ইসি দেশবাসীর আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে, আশা প্রধানমন্ত্রীর : এদিকে গতকাল শপথ নিয়ে দায়িত্বভার গ্রহণ করা প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাসহ নতুন পাঁচ নির্বাচন কমিশনারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে দেশবাসীর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনাররা আজ শপথ গ্রহণ করেছেন। তাঁদের সবাইকে আমরা অভিনন্দন জানাই। পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশনার হিসেবে একজন নারীকে নিয়োগ প্রদান করায় আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের পবিত্র সংবিধানের প্রতি অনুগত থেকে নতুন নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে দেশবাসীর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে বিশ্বাস করি। সরকার নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহায়তা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই পরবর্তীতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে একটি উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা হোক। সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে এখন থেকেই সে উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। আর সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বর্তমানে বিরাজমান সব বিধিবিধানের সঙ্গে সংগতি রেখে ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিং প্রবর্তন করার পরিকল্পনাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। ’


মন্তব্য