kalerkantho


বস্তাবন্দি দুই শিশুর লাশ

স্বর্ণালংকারের লোভেই হত্যা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্বর্ণালংকারের লোভেই হত্যা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার নামোশংকবাটি ফতেপুর গ্রামে দুই শিশুকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন আটককৃতদের একজন। লাকী আক্তার নামের এই নারী বলেছেন, শিশুদের গায়ে থাকা সোনার গয়নার লোভেই তাদের হত্যা করেছেন তিনি।

গতকাল বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিচার বিভাগীয় মুখ্য হাকিম আদালতের বিচারক জুয়েল অধিকারীর কাছে ১৬৪ ধারায় এ জবানবন্দি দেন এই আসামি।

জবানবন্দির বরাত দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার টি এম মোজাহিদুল ইসলাম জানান, গত রবিবার লাকী আক্তারের মেয়ের সঙ্গে তাদের বাড়ির সামনেই খেলছিল মেঘলা ও মালিহা। তাদের কানে ও গলায় সোনার গয়না দেখে ঋণগ্রস্ত লাকীর লোভ হয়। তিনি দুই শিশুকে বাড়ি ডেকে নিয়ে যান এবং মেঘলার কানের দুল ও গলার হার এবং মালিহার কানের দুল খুলে নেন। এরপর তাদের ঘরে আটকে রাখেন। রাতে তাদের সঙ্গে নিয়েই ঘুমান লাকী। সোমবার দিনভর ঘরে থাকা ফ্রিজের পেছনে শিশু দুটিকে আটকে রাখেন তিনি। ওই দিন রাতে মেঘলা ও মালিহা বাড়ি যাওয়ার জন্য খুব কান্নাকাটি শুরু করে। তখন লাকী তাদের ঘরের বক্সখাটের ভেতরে ঢুকিয়ে আটকে দেন।

বক্সখাটের ভেতরেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে দুই শিশু মারা যায়। মঙ্গলবার সকালে বক্সখাট খুলে তাদের মৃত দেখে লাকী লাশ দুটি বস্তাবন্দি করে পাশে শ্বশুরের ঘরের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখেন।

পুলিশ কর্মকর্তা জানান, জবানবন্দিতে লাকী বলেছেন যে মেঘলা ও মালিহার কানের দুল ও হারের ওজন হয়েছে ১২ আনা দুই রতি। তিনি সেগুলো প্রায় ২১ হাজার টাকায় একটি স্বর্ণের দোকানে বিক্রি করেন। সেই টাকার বড় অংশ বিভিন্ন পাওনাদারকে পরিশোধ করেন।

পুলিশ সুপার জানান, লাকী আক্তারের শ্বশুর ভ্যানচালক ইয়াসিন আলী (৭০) গ্রামে গ্রামে দই বিক্রি করে সংসার চালান। তাঁর বাড়ি ছেলের বাড়ির পাশেই। ছেলে ইব্রাহিম বিদেশে থাকায় তিনি শুধু রাতে ওই বাড়ির একটি ঘরে ঘুমাতেন। তিনি আরো জানান, জবানবন্দিতে লাকী আক্তার বলেছেন যে তিনি নিজেই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। এর সঙ্গে অন্য কারো সংশ্লিষ্টতা নেই।

পুলিশ কর্মকর্তা মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, আগের অপহরণ মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়েছে। স্পর্শকাতর এ ঘটনায় শিশুদের লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে।

উল্লেখ্য, ফতেপুর গ্রামের প্রবাসী মিলন রানার মেয়ে সুমাইয়া খাতুন মেঘলা ও আব্দুল মালেকের মেয়ে মেহজাবিন আক্তার মালিহা গত রবিবার নিখোঁজ হয়। মঙ্গলবার স্থানীয় যুবকরা ফতেপুরের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করার উদ্যোগ নেয়। একপর্যায়ে প্রতিবেশী ভ্যানচালক ইয়াসিন আলীর বাড়ি তল্লাশি করে একটি ঘরের খাটের নিচে বস্তাবন্দি অবস্থায় দুই শিশুর লাশ পাওয়া যায়।

পুলিশ লাশ উদ্ধার করার পাশাপাশি বাড়ির মালিক ইয়াসিন আলী, তাঁর স্ত্রী তানজিলা খাতুন (৫০) ও ছেলে ইব্রাহিম আলীর স্ত্রী লাকী আক্তারকে (২২) আটক করে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, মালিহার বাবা আব্দুল মালেকের দায়ের করা মামলায় লাকী আক্তারকে আসামি করা হয়েছে। ইয়াসিন ও তানজিলাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

এর আগে রবিবার দুই শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয় পাশের তেলিপাড়া ঘোষপাড়া গ্রামের বাবু শম্ভুর মেয়ে গীতা রানীকে (১৮)। গতকাল দুপুরে স্থানীয় কিছু লোক তাঁদের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। তারা গীতা রানীদের বাড়ির দুটি ঘর ভাঙচুর করে এবং রান্নাঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। পরে আশপাশের লোকজন আগুন নিভিয়ে ফেলে।

এদিকে দুই শিশুর লাশ উদ্ধারের পর ফতেপুর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী হত্যাকারীর ফাঁসির দাবি জানিয়েছে। গতকাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা জানিয়েছে, এ ঘটনার পর এলাকার মানুষ তাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। একলা বাড়ির বাইরে বের হতে দিচ্ছে না। স্কুলেও পাঠায়নি। আবার কেউ কেউ স্কুলে সন্তানদের সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।

মেঘলার মা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার কলিজার টুকরাকে এভাবে মেরে ফেলবে তা কখনোই ভাবিনি। আমার মেয়েকে বস্তার মধ্যে ভরে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলেছে। আমিও চাই যে আমার মেয়েকে যেভাবে মেরেছে, খুনিকেও তেমনই কষ্ট দিয়ে মারা হোক। ’

দুই শিশু ছিল স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছোটমণি বিদ্যানিকেতনের শিক্ষার্থী। নৃশংস এ ঘটনার পর বিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে গেছে।

ছোটমণি বিদ্যানিকেতনের অধ্যক্ষ খাইরুল ইসলাম সোহেল বলেন, ‘শিশু দুটি ছিল আমার সন্তানের মতো। তাদের যে এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না। দেশের প্রচলিত আইনে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। ’

লাশ ময়নাতদন্তের পর গতকাল বিকেলে দুই শিশুর মধ্যে মালিহাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। মেঘলার লাশ রাখা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের হিমঘরে। তার বাবা বাড়ি ফেরার পর তাকে দাফন করা হবে।


মন্তব্য