kalerkantho


আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

রফিকের লাশ দেখে লেখা কবিতাই এখন ভাষার গান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রফিকের লাশ দেখে লেখা কবিতাই এখন ভাষার গান

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি...’ কালজয়ী এ গানের স্রষ্টা আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়ে কাছ থেকে দেখা ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই গান লিখেছিলেন তিনি।

ভাষাসংগ্রামী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। কলেজের ভাষা সংগ্রাম পরিষদের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ঢাকা কলেজের অবস্থান তখন পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে। থাকতেন আরমানীটোলার বান্ধব কুটির ছাত্রাবাসে। ৬৫ বছর আগের ঘটনা হলেও উপমহাদেশের ইতিহাসের বাঁক ঘুরিয়ে দেওয়া বায়ান্নর ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বল করছে তাঁর মনে।

সেই সময়ের ঘটনার পরম্পরা উল্লেখ করে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেন, ‘জানুয়ারি মাস থেকেই ‘অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার’ দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে অনুষ্ঠিত ধর্মঘট, সভা, শোভাযাত্রা ইত্যাদিতে অন্য ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি। ২০ ফেব্রুয়ারি কানে এলো, পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে হরতাল, সভা, শোভাযাত্রা যাতে না হতে পারে, সে জন্য নূরুল আমিন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করতে পারে। যদি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে, তা ভঙ্গ করা হবে কি না, তা সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় বিবেচনা করা হবে। সিদ্ধান্ত তারা দেবে।

কিন্তু সিদ্ধান্ত তারা দিতে পারেনি। পরদিন ২১ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ভবনের (এখন যা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অংশ) আমগাছতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসে। ঢাকা কলেজের ছাত্রবন্ধুদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। ’

সেদিনের সেই ঐতিহাসিক সভার ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বলতে গিয়ে গাফ্‌ফার চৌধুরী জানান, সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শোভাযাত্রা করা নিয়ে মতানৈক্য হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক যুক্তি দেখান, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ঠিক হবে না। সরকার বলছে, শিগগিরই পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখন গণ্ডগোল করা হলে সরকার এ নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারে। তাঁর এ যুক্তি শুনে সভায় ছাত্রলীগের প্রতিনিধিরা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ভোট দিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। ফলে প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থন পাওয়া যাচ্ছিল না। এ সময় হইচই উঠল, কারাবন্দি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জন্য একটা নির্দেশ এসেছে। সম্ভবত তখনকার ছাত্রনেতা কামরুজ্জামানের কাছে গোপন বার্তাবাহকের মাধ্যমে একটি চিরকুট এসেছিল। শেখ মুজিবের নির্দেশ ছিল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যেন ভাষার দাবিতে মিছিল করা হয়। এ নির্দেশ আসার পর সভায় ছাত্রলীগের প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সম্মতি জানান। ফলে এবার সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, দুই সারিতে দুজন দুজন করে ছাত্র মিছিলে দাঁড়াবে।

ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কলা ভবনের অদূরেই জগন্নাথ হল, সেটা তখন ছিল প্রাদেশিক আইন পরিষদ ভবন। সেদিন প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন চলছে। ছাত্র-জনতার মিছিল প্রাদেশিক আইন পরিষদের ভবনের সামনে গিয়ে ভাষার দাবিতে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের হাতে একটি স্মারকলিপি দেবে। ছাত্র মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরোতেই অনেক সাধারণ পথচারীও এসে তাতে যোগ দেন। অদূরেই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং মেডিক্যালের ছাত্রদের ব্যারাক হোস্টেল (এখন যেখানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার)। শান্তিপূর্ণ মিছিলটি ওই ব্যারাকের সামনে পৌঁছতেই অতর্কিতে এবং বিনা সতর্কীকরণে পুলিশের আদেশ আসে—হল্ট। তারপরই এলোপাতাড়ি গুলি। যে গুলিতে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার প্রমুখ শহীদ হন। আহত হন অনেকে। এর পরও জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য চলে অবিরাম কাঁদানে গ্যাসবর্ষণ।

গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেন, ‘এ কাঁদানে গ্যাস হাসপাতাল পর্যন্ত ঢুকে রোগী, ডাক্তার ও নার্সদের বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। আমি কাঁদানে গ্যাসে আক্রান্ত চোখ রুমালে ঢেকে মেডিক্যাল কলেজের ব্যারাক ছাত্রাবাসে ঢুকে যাই। ব্যারাক ছাত্রাবাসের কোনো কোনোটির দেয়ালেও গুলির চিহ্ন। বিকেলেই কয়েকজন শহীদের লাশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরে আছে শুনে আমরা তখনকার কয়েকজন ছাত্রবন্ধু তাঁদের দেখতে ছুটে যাই। আমরা ছিলাম তিন বন্ধু—আমি, বর্তমানে নজরুল বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম এবং সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের সাবেক সম্পাদক শফিক রেহমান। হাসপাতালের আউটডোরের বারান্দায় শহীদ রফিকের লাশটি রাখা ছিল। গুলিতে তাঁর মাথার খুলি উড়ে গেছে। এ মৃতদেহটি দেখেই আমি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতাটি লেখায় প্রেরণা পাই, যা পরে ভাষার গানে পরিণত হয়েছে। ’

এই ভাষাসংগ্রামী জানান, একুশের রাতে ছিল সারা ঢাকা শহর উত্তেজনায় ভরা। সরকার গণবিক্ষোভ দমাতে পারবে না ভয়ে রাস্তায় রাস্তায় পাঞ্জাবি ও বেলুচ সৈন্য মোতায়েন করা হয়। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সিভিল প্রশাসন প্রায় ভেঙে পড়েছিল। সলিমুল্লাহ হলকে হেডকোয়ার্টার বানিয়ে ছাত্রনেতারা আন্দোলনের নির্দেশ জারি করছিলেন এবং সেই নির্দেশ অনুযায়ী সারা শহর পরিচালিত হচ্ছিল। বর্ধমান হাউস (বর্তমান বাংলা একাডেমি ভবন) তখন ছিল মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। গণহামলার ভয়ে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন এ বাসভবন থেকে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে কিছুদিনের জন্য আশ্রয় নেন।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেন, ‘পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি, মেডিক্যালের ব্যারাক ছাত্রাবাসের সামনেই ভাষাশহীদদের জন্য গায়েবানা জানাজার ব্যবস্থা করা হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এ জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজার পর শোকমিছিল। এত বড় শোকমিছিল ঢাকা শহর আর কখনো প্রত্যক্ষ করেছে কি না আমি জানি না। মিছিলের পেছনের প্রান্ত যখন মেডিক্যাল কলেজের ব্যারাক ছাত্রাবাসের সামনে, তখন তার অগ্রবর্তী ভাগ পৌঁছে গেছে নবাবপুর রোডে। মওলানা ভাসানী এ মিছিলেও নেতৃত্ব দেন। ’

সেদিনে ঢাকা শহরের পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘সেদিন ঢাকা শহরে ছিল অভূতপূর্ব দৃশ্য। যুবা-বৃদ্ধ, নারী-শিশু—সবার বুকে কালো ব্যাজ। দর্জির দোকানগুলো খোলা। তারা কালো কাপড় কেটে কেটে ব্যাজ বানাচ্ছে এবং সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই পরিয়ে দিচ্ছে। এ মিছিলে আমরাও কয়েক ছাত্রবন্ধু ছিলাম। আমি, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর (বর্তমানে সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ), দাউদ খান মজলিশসহ আরো কয়েকজন। আমরা শুধু কালো ব্যাজই ধারণ করিনি, বুকপকেটে নাম-ঠিকানা লেখা কাগজ রেখেছিলাম। যদি গুলিতে মারা যাই, তাহলে যেন বেওয়ারিশ লাশ হয়ে না যাই। ’

তিনি আরো বলেন, ‘ভাগ্যের কী বিড়ম্বনা। আমরা ছিলাম মিছিলের লেজের দিকে। মিছিলের এই অংশ যখন কার্জন হলের সামনে, তখন শুরু হয় আবার অতর্কিত গুলিবর্ষণ। এখানে ৯-১০ বছরের এক বালকসহ হতাহত হয়েছিল অনেকে। আমরা তখন গুলি ও লাঠিচার্জ থেকে বাঁচতে পালাচ্ছি। কার্জন হলের গেট ছিল বন্ধ। লোহার পাঁচিল টপকাতে গিয়ে পায়ে পুলিশের লাঠির দারুণ আঘাত পেলাম। ছিটকে পড়লাম পাঁচিলের ওপাশে কার্জন হলের প্রাঙ্গণের মধ্যে। আমাকে কারা যেন কার্জন হলের ভেতরে টেনে নিলেন। সম্ভবত তাঁদের মধ্যে তখন আমার সহপাঠী বন্ধু শফিক রেহমানও ছিলেন। কার্জন হলের ওই প্রকোষ্ঠে আশ্রয় নিয়েছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো কয়েকজন শিক্ষক। আমাকে একটা বেঞ্চির ওপর শোয়ানো হয়েছিল। এটুকুই আমার মনে আছে। পায়ের গোড়ালিতে দারুণ আঘাত লেগেছিল এবং ফুলে গিয়েছিল। ব্যথায় আমি কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারিয়েছিলাম। জ্ঞান ফিরতেই দেখি মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আমার পায়ের আহত স্থানে বরফ ঘষে দিচ্ছেন। ’

একুশের অমর গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ছাত্রাবস্থায়ই দৈনিক সংবাদে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতেন। সাংবাদিকতাকেই তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। পরে ১৯৫৪ সালে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। দৈনিক জনপদের সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি লন্ডনে প্রবাসজীবন যাপন করছেন। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ইউনেসকো পুরস্কার, স্বাধীনতা ও একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এখনো সচল তাঁর কলম। কালের কণ্ঠসহ একাধিক দৈনিকে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত কলাম লিখছেন তিনি। এই স্বনামধন্য সাংবাদিকের সাম্প্রতিক ভাবনা পড়ার জন্য অপেক্ষায় থাকে অগণিত পাঠক।

 


মন্তব্য