kalerkantho


উগ্রবাদী সন্তান হারানো মা

প্রজন্ম বাঁচানোর সংকল্প নিয়ে বাংলাদেশে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রজন্ম বাঁচানোর সংকল্প নিয়ে বাংলাদেশে

জঙ্গিবাদ শুধু ধ্বংসই ডেকে আনে। প্রিয় সন্তানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এমন বাস্তবতা প্রচারে এগিয়ে আসা নারী সালিহা। ছবি : সংগৃহীত

‘মা, আমার জন্য উতলা হয়ো না...আমি সিরিয়ায় পৌঁছে গেছি’—২০১৩ সালের গ্রীষ্মে ব্রাসেলস থেকে নিরুদ্দেশ হওয়ার পর মা সালিহা বেন আলীর কাছে এ বার্তাই পাঠিয়েছিল সাবরি। এর চার মাসের মাথায় খবর আসে, সিরিয়ায় লড়াইয়ে সে নিহত হয়েছে।

সন্তানের উগ্রবাদী হয়ে ওঠা এবং অকালে প্রাণ হারানোর শোক বুকটা দুমড়েমুচড়ে দেয় তিউনিসিয়ান বংশোদ্ভূত বেলজিয়ামের নাগরিক সালিহা বেন আলীর। তবে সন্তানহারা এই মা এতে দমে যাননি। বরং সাবরির উগ্রবাদী হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে দেশে দেশে মা ও পরিবারসহ সবাইকে সচেতন করা বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে বাঁচানোর মিশনে নেমেছেন তিনি। উগ্রবাদ মোকাবিলায় নিজ উদ্যোগে খুলেছেন বেসরকারি সংস্থা ‘সোসাইটি অ্যাগেইনস্ট ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম (সেভ)’।

সালিহা বেন আলী এখন বাংলাদেশে। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সেমিনার কক্ষে তিনি নিজ সন্তান হারানোর প্রেক্ষাপট তুলে ধরার পাশাপাশি বেলজিয়ামে সেভের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সালিহা বেন আলী বলেন, ‘উগ্রবাদী হয়ে উঠতে সাবরির সময় লেগেছিল মাত্র দুটি মাস। ১৮ বছর বয়সের সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত ছেলেটি যে বাড়ি ছেড়ে সিরিয়ায় চলে যাচ্ছে তা মা হিসেবে তিনিও টের পাননি।

সালিহা বেন আলী বলেন, সাবরি নিয়মিত ছাত্র ছিল।

অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজত। তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত বেলজিয়ান হওয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে আলাদা করে তল্লাশি, নজরদারির শিকার হতে হতো। এ নিয়ে তার মধ্যে

এক ধরনের হতাশা কাজ করত। আর সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসে যোগ দিতে না পারাটা তার সেই হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। সন্তানহারা এই মা বলেন, পারিপার্শ্বিক এমন নানা বিষয় সাবরিকে অনেকটা বদলে দেয়। সে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিশদ জানার জন্য মসজিদের ইমামের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু মসজিদের ইমাম সেসবের ব্যাখ্যা দেন আরবিতে। আর সাবরি আরবি ভাষা জানত না। এভাবেই ইসলাম সম্পর্কিত প্রশ্ন জানতে গিয়ে একসময় সে বেলজিয়ামের একটি উগ্র গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

সালিহা বেন আলী বলেন, সাবরি বলা শুরু করে যে ভালো মুসলমান হতে হলে তাকে সিরিয়ার শ্যাম এলাকায় গিয়ে শরিয়াহ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। টিভি দেখা, গান শোনা ও ছবি দেখাও বন্ধ করে দেয় সে। উত্কণ্ঠিত মা ইমামদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরাও বলেন, শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার জন্য সাবরিকে সিরিয়ায় যেতে দেওয়া উচিত। এরপর একদিন সত্যি সত্যিই ছেলেটি সিরিয়ায় চলে যায়।

বেলজিয়ামে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর ঘৃণ্য মতাদর্শ প্রচারের সময় রাজনীতিবিদরা একে তেমন গুরুত্ব দেননি বলে উল্লেখ করেন সালিহা বেন আলী। তিনি বলেন, বেলজিয়াম থেকে কিশোরদের সিরিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা শুরুর পর তাঁদের হুঁশ হয়েছে। পরিবার বিশেষ করে মা, সমাজ, রাষ্ট্র—সবারই এ ক্ষেত্রে করণীয় আছে। বিশেষ করে কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশ ও তার চাহিদা পূরণের বিষয়ে সবার সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত। বিভিন্ন দেশ সফর করে তিনি মূলত এ বিষয়টিই তুলে ধরছেন, ধর্ম-নির্বিশেষে মায়েদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের আমেরিকান সেন্টারের পৃষ্ঠপোষকতায় ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ‘ইনোভেশন ফর ওয়েলবিয়িং ফাউন্ডেশন’। অনুষ্ঠানে আমেরিকান সেন্টারের পরিচালক অ্যান ম্যাককনেল বলেন, রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট কয়েক বছর আগে সিএনএনে সালিহা বিন আলীর একটি সাক্ষাৎকার দেখেছিলেন। উগ্রবাদ মোকাবিলায় প্রচারণার উদ্যোগ হিসেবে সালিহা বিন আলীকে ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করাকে কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করেন অ্যান ম্যাককনেল। তিনি আরো বলেন, এই সফরকালে সালিহা বিন আলী সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন।

কলামিস্ট মাসুদা ভাট্টির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে সাংবাদিক জুলফিকার আলি মানিক বাংলাদেশে গুলশান হামলা, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বিকাশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে এ দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলার পাশাপাশি এ দেশের সংস্কৃতিতে ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদী প্রভাবের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, ২০০৪ সালে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়েছে। আর ২০১৭ সালে এসে পাঠ্যপুস্তক থেকে তাঁর লেখা তুলে দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোচিকিৎসক ড. মেখলা সরকার উগ্রবাদ মোকাবিলায় গবেষণা ও পুনর্বাসনব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেন। সন্তানের উগ্রবাদী হয়ে ওঠা ঠেকাতে মায়ের পাশাপাশি বাবারও সমান দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, উগ্রবাদ কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শুধু পুলিশ দিয়ে উগ্রবাদ সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো বিষয় তুলে ধরে সেসব রাষ্ট্রীয় কৌশলের সমালোচনা করেন।

বেসরকারি সংস্থা ‘নারী পক্ষ’র সদস্য শিরীন হক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উগ্রবাদে জড়ানো প্রসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থা না থাকার উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ সাইকোলজি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান উগ্রবাদের বিকাশ ঠেকাতে গণতান্ত্রিক সমাজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সমস্যা বলার মতো সুযোগ থাকতে হবে। উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে বড় পরিসরে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বেসরকারি সংস্থা এডিডি ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর শফিকুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ইনোভেশন ফর ওয়েলবিয়িং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মনিরা রহমান বক্তব্য দেন।


মন্তব্য