kalerkantho


বারবার প্রশ্ন ফাঁস

উৎস শনাক্ত হয় না হোতারাও আড়ালে

শরীফুল আলম সুমন   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



উৎস শনাক্ত হয় না হোতারাও আড়ালে

কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবেই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। ফাঁসের ঘটনায় মাঝেমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, জড়িত দু-চারজন গ্রেপ্তারও হয়। তবে কারা, কিভাবে, ঠিক কোন জায়গা থেকে প্রশ্ন ফাঁস করছে—এখন পর্যন্ত সেই উৎস চিহ্নিত করা যায়নি। ফলে কার্যকর ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না। তদন্ত শেষে কমিটিগুলো প্রতিবারই কিছু সুপারিশ করে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করে না। ফলে ফাঁসের সঙ্গে জড়িত মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।  

গত রবিবার ছিল এসএসসির গণিত পরীক্ষা। তার আগে শনিবার রাত থেকেই ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘প্রশ্ন’ ছড়িয়ে পড়ে। রবিবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে হাতে হাতে যে ‘প্রশ্ন’ ছড়িয়ে পড়ে তার সঙ্গে মূল প্রশ্নের হুবহু মিল দেখা যায়। শুধু গণিত পরীক্ষার প্রশ্নই নয়, এর আগে বাংলা দ্বিতীয় পত্র ও ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।

গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায়।  

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত দুই জায়গা থেকে এবারের প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকতে পারে। প্রথমত, পরীক্ষার আগের রাতে যে প্রশ্ন ছড়িয়েছে তার জন্য বিজি প্রেসকে সন্দেহ করা যায়। কারণ সাধারণত জেলাপর্যায়ে দু-তিন দিন আগে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়। বিজি প্রেস থেকে সিলগালা করে ট্রাংকে ভরে পাঠানো প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট জেলার ট্রেজারিতে রাখা হয়। পরীক্ষার দিন সকালে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কেন্দ্রসচিবের কাছে সিলগালা প্রশ্নের প্যাকেট বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এবার কোথাও সিলগালা খোলার নমুনা পাওয়া যায়নি। তাই প্রশ্ন ফাঁসে সন্দেহের তীর বিজি প্রেসের দিকেই বেশি রয়েছে। আবার পরীক্ষার দিন সকালে যে ‘প্রশ্ন’ ছড়িয়েছে তা এসেছে কেন্দ্রগুলো থেকে। কারণ এক-দেড় ঘণ্টা আগে কেন্দ্রে প্রশ্ন পৌঁছানো হয়। তবে নিয়ম অনুযায়ী তা আধাঘণ্টা আগে খোলার কথা। কিন্তু কিছু অসাধু শিক্ষক প্রশ্ন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলে তা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাইরে পাঠিয়ে দেন, যা শিক্ষার্থীদের কাছে ছড়িয়ে পড়ে।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস হয়, তদন্তে কমিটি হয়; দু-চারজন গ্রেপ্তারও হয়। কিন্তু ফাঁসের মূল উৎস খুঁজে বের করা হয় না। ফলে কার্যকর ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব হয় না। আসলে গতানুগতিক পদ্ধতিতে প্রশ্ন ফাঁস রোধ সম্ভব নয়। প্রশ্ন ফাঁসে যারা জড়িত বা যাদের গাফিলতি রয়েছে তাদের খুঁজে বের করে প্রচলিত আইনেই সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। তাহলে এই ফাঁস অনেকাংশে কমবে। বারবার প্রশ্ন ফাঁসের কারণে এখন  পাবলিক পরীক্ষার উপযোগিতাই অকার্যকর হয়ে গেছে। এ জন্য পরীক্ষা পদ্ধতিতেও মৌলিক সংস্কার আনার সময় চলে এসেছে। ’

প্রশ্ন ফাঁসের কারণে ২০১৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইনের (তখন অতিরিক্ত সচিব) নেতৃত্বে গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে একটি সুপারিশে বলা হয়, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সংশোধন ও প্রশ্ন নির্বাচনের কাজটি একটি নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে করতে হবে। ওই সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারীদের কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে তা ‘প্রশ্নভাণ্ডারে’ রাখা হবে। সেখান থেকে প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি হবে। একাধিক প্রশ্ন সেট অনলাইনে পরীক্ষার দিন সকালে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হবে। এরপর স্থানীয়ভাবে প্রিন্টারে ছাপিয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

আরেকটি সুপারিশে বলা হয়েছিল, উল্লিখিত পদ্ধতিতে প্রশ্নের সেট করার পর একাধিক সেট সুরক্ষিত যন্ত্রের (ডিভাইস) মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কয়েক দিন আগেই পাঠানো হবে। যন্ত্রটিতে এমনভাবে সময় নির্ধারণ করা থাকবে, যাতে পরীক্ষার দিন সকালের আগে তা খোলা না যায়। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র নির্ধারিত প্রিন্টারে ছাপিয়ে বিতরণ করা হবে।

এত দিন সেই সুপারিশ কাগজ-কলমেই বন্দি ছিল। তবে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় সুপারিশের সেই ফাইল নাড়াচাড়া করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কেন্দ্র রয়েছে। এতগুলো কেন্দ্রে একযোগে প্রশ্ন ছাপিয়ে তা যথাসময়ে বিতরণ করা খুবই দুরূহ ব্যাপার।

এবার এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি মন্ত্রণালয় ফাঁসের বিষয়টি স্বীকারই করতে চাচ্ছে না। গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের প্রমাণ মিললে চলতি এসএসসির গণিত পরীক্ষা বাতিল করা হবে। তবে আগে যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়ে তদন্ত করা হবে। ’

শিক্ষামন্ত্রীর এ মন্তব্যের পর এক দিন পার হলেও গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। গতকাল শিক্ষামন্ত্রী সিলেটে সাংবাদিকদের বলেন, ‘একক প্রচেষ্টায় প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে সাংবাদিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। ’ পাশাপাশি প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘প্রশ্ন কখন ফাঁস হয়েছে, কিভাবে কতটুকু ফাঁস হয়েছে, পরীক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব কতখানি পড়েছে, তা খতিয়ে দেখার পর এসএসসি গণিত পরীক্ষা বাতিলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

গ্রেপ্তার ছয় : এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলো রাজু আহমেদ, ফয়সালুর রহমান আকাশ, মোহাম্মদ জোহায়ের আয়াজ, মহিউদ্দিন ইমন, স্বাধীন আল মাহমুদ ও কাজী রাশেদুল ইসলাম রনি।

গতকাল ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রটি ফেসবুক পেজ খুলে একটা ক্লায়েন্ট গ্রুপ তৈরি করে। বিভিন্ন পরীক্ষার আগের দিন তারা বিভিন্ন অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ইন্টারনেটে নির্দিষ্ট গ্রাহকদের কাছে প্রশ্ন ছড়াত। গণিত প্রশ্নের যেসব কপি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছে সেসব প্রশ্নের স্ন্যাপশটের সঙ্গে পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোর শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ মিল পাওয়া গেছে। ’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা যত দূর জানতে পেরেছি, প্রশ্ন ফাঁসে বোর্ডের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় তদন্ত করবে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে যে কারা এর জন্য দায়ী। নরমালি আমাদের যে সিস্টেম রয়েছে, তাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার সুযোগ নেই। ’

আদালত প্রতিবেদক জানান, গ্রেপ্তার ছয়জনের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ঢাকা মহানগর হাকিম নুর নাহার ইয়াসমিন। গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক আবদুস সোবহান আসামিদের আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করেছিলেন।

জাতীয় শিক্ষক ফোরামের উদ্বেগ : এসএসসির গণিতের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতীয় শিক্ষক ফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান ও সদস্যসচিব এ বি এম জাকারিয়া। গতকাল যুক্ত বিবৃতিতে তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে রক্ষার আহ্বান জানান।

 


মন্তব্য