kalerkantho


‘সৈনিক’ ছিল আন্দোলনের মুখপত্র

সাংবাদিক আবদুল গফুর

আপেল মাহমুদ    

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘সৈনিক’ ছিল আন্দোলনের মুখপত্র

‘দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকরা শুরুতেই বাংলা ভাষার প্রতি বিরূপ আচরণ করতে থাকে। সরকারি নথিপত্র, এমনকি রাষ্ট্রীয় ডাক বিভাগের স্ট্যাম্প, খাম ও পোস্টকার্ডে ইংরেজি শব্দের পাশাপাশি উর্দু লেখা শুরু হয়।

সেখানে বাংলার কোনো নিশানাও রাখা হতো না। এর মধ্যে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এককভাবে উর্দুর পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। প্রতিবাদ করে পাল্টা প্রবন্ধ লিখেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। পাশাপাশি দেশের অনেক কবি-লেখক-সাংবাদিকও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেন। তবে এসব প্রতিবাদ সে সময়ের সংবাদপত্রে ঠিকমতো প্রকাশ করা হতো না। যার কারণে আমরা সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিই। ’ বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও ভাষাসংগ্রামী আবদুল গফুর বললেন এসব কথা। সৈনিক পত্রিকাকে ভাষা আন্দোলনের আয়না হিসেবে আখ্যায়িত করে আবদুল গফুর বলেন, ‘এমন কোনো লেখক কিংবা কবি-সাহিত্যিক ছিলেন না, যাঁরা সৈনিকে লিখতেন না। কবি শামসুর রাহমান তখন ছাত্র। তাঁর আর আমার জন্ম একই সালে, ১৯২৯ সালে। সৈনিক পত্রিকায় তাঁর কবিতা নিয়মিত ছাপা হতো। সেই সময় বাংলা সাহিত্যের সব দিকপালের লেখা সৈনিকে ছাপা হতো। মূলত বাংলা ভাষার সপক্ষের লেখায় ভরা ছিল পত্রিকাটি। ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনকারীদের মুখপত্র হিসেবে কাজ করে। প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের গড়া তমদ্দুন মজলিসের অর্থায়নে প্রকাশিত সৈনিকের প্রথম সম্পাদক ছিলেন শাহেদ আলী। সহকারী সম্পাদক ছিলাম আমি ও সানাউল্লাহ নুরী। পুরান ঢাকার ৪৮ কাপ্তানবাজার থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস জানতে হলে সৈনিক পত্রিকার কপিগুলো দেখতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হলো, পত্রিকাটি কোনো সরকারই সংরক্ষণ করেনি। ব্যক্তিগত চেষ্টায় এর একটি সেট সিলেট মুসলিম লাইব্রেরিতে রাখা হয়েছিল। কিছু কপি বাংলা একাডেমি লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা ছিল। ’

আবদুল গফুর জানান, কাপ্তানবাজারের পর প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের আজিমপুরের ১৯ নম্বর বাসাই ছিল সৈনিক পত্রিকার অফিস। ভাষা আন্দোলন যেহেতু সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়, তাই ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সৈনিক পত্রিকাটি প্রথম সরকারবিরোধী পত্রিকা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে পরিচিতি লাভ করে। সরকারবিরোধী দলগুলোর বক্তব্য-বিবৃতি এবং কর্মকাণ্ড গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হতে থাকে এ পত্রিকায়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন সৈনিক পত্রিকা একই দিনে কয়েকটি সংস্করণ বের করেছে। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটির তিনটি সংস্করণ বের করা হয়। মফস্বলেও ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সাড়া জাগিয়ে তোলে পত্রিকাটি। প্রেস নোট ছাপার সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পত্রিকাটি সেই আদেশ মানেনি। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। তবে আর্থিক কারণে অনেক সময় প্রতি সপ্তাহে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে পারেনি।

স্মৃতি হাতড়ে এই ভাষাসংগ্রামী জানান, তমদ্দুন মজলিসের কর্মকাণ্ড ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল। এর একজন কর্মী হিসেবে তিনি শুধু পত্রিকা সম্পাদনাই করতেন না, কিভাবে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করা যায় সে লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক কাজ করেছেন, যার জন্য ঠিকমতো পরীক্ষায়ও অংশ নিতে পারেননি। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। বায়ান্নতে পরীক্ষার মাত্র দুই মাস আগে ভাষা আন্দোলন তীব্র হলে তিনিও আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ফলে পড়ালেখায় দীর্ঘ বিরতি পড়ে। পরে ১৯৬২ সালে এমএ পাস করেন তিনি। তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে জিন্দেগী পত্রিকার মাধ্যমে। সেই হিসাবে ৭০ বছর ধরে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় রয়েছেন। বর্তমানে একটি জাতীয় দৈনিকে ফিচার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।

৮৮ বছর বয়সী এ প্রবীণ সাংবাদিক আরো জানান, আজ যেমন রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে, তেমনি ১৯৫২ সালের আগে ১৯৪৮ সাল থেকে ১১ মার্চকে রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হতো। প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সাল থেকেই। তখন পাকিস্তানে বাংলাভাষীর সংখ্যা ছিল শতকরা ৫৬ ভাগ। সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকরা বাংলাভাষীদের ওপর নানা অন্যায় আবদার চাপিয়ে দিতে থাকে। এর কারণ হলো, লোকসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাভাষীরা এগিয়ে থাকলেও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলে উর্দুভাষী কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি ছিল। তাঁরা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করেন। দেশভাগের পর অনেকেই মনে করেছিল তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়ে যাবে। বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রসার ঘটবে। দেশভাগের পর শুরুর দিকে পূর্ববঙ্গেও উর্দুর চর্চা ছিল। তিনি যখন ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন, তখন তাঁর সঙ্গে আর মাত্র দুজন এ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁরা হলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী ও মমতাজ বেগম। অথচ সেই বছর উর্দু বিভাগে ভর্তি হয়েছিল অনেক শিক্ষার্থী। তবে কিছু দিন পরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উর্দুর প্রতি মোহ কেটে যায়।  

ইতিমধ্যে ২০০০ সালে আবদুল গফুরের স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ ‘আমার কালের কথা’র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকালের অবস্থা এবং দেশভাগের কথা উঠে এসেছে। দ্বিতীয় খণ্ডের পাণ্ডুলিপির কাজও শেষ করেছেন। তবে কবে নাগাদ তা প্রকাশিত হতে পারে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারলেন না।


মন্তব্য