kalerkantho

এ হারে লজ্জা নেই

ভারত : ৬৮৭/৬ ডিক্লে. ও ১৫৯/৪ ডিক্লে.
বাংলাদেশ : ৩৮৮ ও ২৫০, ফল : ভারত ২০৮ রানে জয়ী,
ম্যান অব দ্য ম্যাচ : বিরাট কোহলি

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এ হারে লজ্জা নেই

পঞ্চম দিনের তৃতীয় ওভারের তৃতীয় বল। রবীন্দ্র জাদেজার বলটি উইকেটের ক্ষয়ে যাওয়া অংশে ধুলো উড়িয়ে যেভাবে বেমক্কা ঘুরল, তাতে করার কিছু ছিল না।

ভালো বলে আউট হওয়ার অপেক্ষা(!) অবশেষে ফুরোল সাকিব আল হাসানের। সাতসকালের বাংলাদেশের স্বপ্নের মৃত্যুও কি ঘটল একই সঙ্গে? না, মুশফিকুর রহিম আছেন তখনো। হায়দরাবাদ টেস্টে বাংলাদেশের বীর। প্রথম ইনিংসে ভারতীয় বোলিংয়ের বিপক্ষে লড়াই করেছেন বুক চিতিয়ে। তাঁর ভরসায় তখনো আশার পাল উড়িয়ে লাল-সবুজের সমর্থকরা। কিন্তু সাকিবের ‘ভূত’ যে এবার অধিনায়কের ঘাড়ে সওয়ার! নইলে রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে ওভাবে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে তেড়েফুঁড়ে মারতে যাবেন কেন! মুশফিকের এই আত্মাহুতিতেই আসলে আঁকা হয়ে যায় ঐতিহাসিক এই টেস্টের গন্তব্য।

পঞ্চম দিন মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারেনি বাংলাদেশ। অলআউট হয়ে যায় ২৫০ রানে। তাতে ভারতের জয় ২০৮ রানে।

স্কোরকার্ডে এ সংখ্যাগুলোই লেখা থাকবে কেবল। লেখা থাকবে না কোণঠাসা অবস্থায় মুশফিকের দলের লড়াইয়ের কথা। অনুপস্থিত সেখানে ওই হাহাকারও—যদি সত্যিকারের টেস্ট মেজাজে খেলত বাংলাদেশ, তাহলে ম্যাচের ফলটা কত অন্য রকমই না হতে পারত!

এমনিতে টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে ৪৫৯ রানের লক্ষ্যটা অবাস্তব। খেলাটি যখন ভারতের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে তখন তা প্রায় অলৌকিক। আর বাংলাদেশ তো আগের দিন বিকেলেই হারিয়ে বসে তিন উইকেট। তবু আশার চশমা চোখে লাগিয়ে কাল টেস্টের শেষ দিনে চোখ রাখে ক্রিকেটপাগল এ দেশের দর্শকরা। বসন্তের শুরুর দিনে যদি বাসন্তী হাওয়ার ভাসা কোনো সুসংবাদ এনে দিতে পারেন ব্যাটসম্যানরা। আর হায়দরাবাদের উইকেটটি তো প্রথাগত ভারতীয় উইকেটের মতো পঞ্চম দিনে টুটে-ফেটে চৌচির হয়নি। সব মিলিয়েও অবাস্তব-অলৌকিক স্বপ্নটাও যেন দেখছিল বাংলাদেশ।

কিন্তু কী দুর্ভাগ্য, জাদেজার ওই বলটিই কিনা পড়ল ২২ গজের ঠিক ওই ক্ষয়ে যাওয়া জায়গায়! তড়িঘড়ি ব্যাট নামিয়েও রক্ষা হয়নি সাকিবের। শর্ট লেগে ক্যাচ দিতে একরকম বাধ্য হন তিনি। এরপর মাহমুদ উল্লাহর সঙ্গে মুশফিকের প্রতিরোধ প্রচেষ্টা। ৫৬ রানের জুটি ভাঙে বাংলাদেশ অধিনায়কের উইকেট বিলিয়ে আসায়। পঞ্চম দিন সকালেই এই পঞ্চম উইকেট পড়ে যাওয়ায় অনেকটা ব্যাকফুটে সফরকারীরা। এরপর যেন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা নামার অপেক্ষা।

সেই অপেক্ষায় ভারতীয়দের বেশ খানিকক্ষণ পুড়িয়েছেন মাহমুদ ও সাব্বির রহমান। নিজেকে হারিয়ে খোঁজা প্রথমজনের কাছ থেকে বড় এক ইনিংস পাওনা হয়ে আছে সেই কবে থেকে! বেশ কিছু অহেতুক ঝুঁকিপূর্ণ শট খেললেও সে দাবি মিটিয়ে যাচ্ছিলেন মাহমুদ। সাব্বিরের সঙ্গে জুটি পেরিয়ে যায় ৫০। ভারতীয়দের বিরক্তির কারণ হয়ে লাঞ্চ পেরিয়ে টিকে থাকেন আরো কিছুক্ষণ। কিন্তু কতক্ষণ আর! ইশান্ত শর্মার বলে এলবিডাব্লুর শিকার হন সাব্বির। সাকিবের ২২, মুশফিকের ২৩ রানের পর তাঁর ২২ রানে আউট হওয়া। শুরু পেয়েও বল ইনিংস খেলতে না পারার দোষে দুষ্ট বাংলাদেশের মিডল অর্ডার।

মাহমুদ উল্লাহ ব্যক্তিগত বাজে ফর্মের গহ্বর ছেড়ে বেরোনোর ইঙ্গিত দেন ৬৪ রানের ইনিংসে। মেহেদী হাসানও ব্যাটিং সামর্থ্যের আরেক প্রস্থ প্রমাণ রাখেন ৬১ বল টিকে থেকে। টেল এন্ডে টিকে থাকার মেজাজটা যে পুরোপুরি আছে, সেটি আরেকবার দেখিয়েছেন কামরুল ইসলাম রাব্বি, খেলেছেন ৭০ বল! কিন্তু বাংলাদেশ খুব বেশিক্ষণ আর টিকতে পারেনি। আর শেষবেলায় হায়দরাবাদ টেস্টের পর্দা নামে খানিকটা নাটকীয়ভাবে। অশ্বিনের বলে শেষ ব্যাটসম্যান তাসকিন আহমেদের বিপক্ষে আউটের আবেদন ওঠে। আম্পায়ার মারাইস ইরাসমুস সঙ্গী জো উইলসনের সঙ্গে আলোচনার পর তৃতীয় আম্পায়ারের শরণাপন্ন হন। রিপ্লেতে দেখা যায় যে ব্যাট-প্যাড ক্যাচ হয়নি, বরং বল আগে লাগে প্যাডে। কোহলি তখন রিভিউ করেন এলবিডাব্লুর জন্য। এবার আউট! ১০০.৩ ওভারে ২৫০ রানে অলআউট হয়ে ২০৮ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ।

তবু টেস্টে ষষ্ঠবারের মতো দুই ইনিংসে ১০০ ওভারের বেশি ব্যাটিং করতে পারল। ভারতের প্রথম ইনিংসের ৭০০ ছুঁই ছুঁই ইনিংসের পরও খেলা টেনে নিতে পারল শেষ দিনের দুই সেশন পর্যন্ত। কোণঠাসা অবস্থা থেকেও লড়াই করল প্রবলভাবে। র্যাংকিংয়ের এক নম্বর দলের বিপক্ষে এসব তো কম প্রাপ্তি নয় বাংলাদেশের!

সঙ্গে অবশ্য ছড়াবে অপ্রাপ্তির হাহাকারও—ইস, টেস্ট ব্যাটিংটা যদি টেস্টের মতো করতে পারত বাংলাদেশ!


মন্তব্য