kalerkantho


মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী

আবুল, মসিউরকেও গ্রেপ্তার করার পরামর্শ ছিল

আশরাফুল হক রাজীব   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আবুল, মসিউরকেও গ্রেপ্তার করার পরামর্শ ছিল

বিশ্বব্যাংককে খুশি করার জন্য সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান এবং সাবেক সেতুসচিব (বর্তমানে শিল্পসচিব) মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞাকে গ্রেপ্তার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তখনকার এক সিনিয়র মন্ত্রী ও এক উপদেষ্টা। পরামর্শদাতা ওই দুজন এখনো মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে আছেন। দুজনের নাম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তাঁরা বিশ্বব্যাংককে খুশি করার জন্য তত্পর ছিলেন। কিন্তু আমি জানতাম, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়নি। তার পরও একজন সচিবকে জেলে যেতে হয়েছে। আজ প্রমাণ হয়েছে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়নি। ’ গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে দীর্ঘসময় কথা বলেছেন। কয়েকজন মন্ত্রীও অংশ নেন ওই আলোচনায়।

কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্নভাবে আমার পরিবারের সদস্যদের জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংককে সরানোর জন্য দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল। ড. ইউনূস শুরু থেকে পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করেছেন। ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে না সরানোর জন্য অনুরোধ করে আমাকে ফোন করেছিলেন হিলারি ক্লিনটন। এ ছাড়া আমার পরিবারের সদস্যকে ডেকে পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। সব কিছু দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছি বলেই আজ প্রমাণ হয়েছে—পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি। সেই সময় সরকারের ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এখন সময় এসেছে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করার। ’  

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলার সময় কয়েকজন মন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের বিষয়ে সংসদে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ অনেক সিনিয়র মন্ত্রী। এ বিষয়ে গত রবিবার সংসদে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা। ওই সময় একজন মন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ প্রতিনিধিকে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে তলব করার পরামর্শ দেন।

একজন সিনিয়র মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের কোন সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ডেকেছিল তা স্পষ্ট নয়। এটা পদ্মা সেতু ইস্যুতে কি না তাও স্পষ্ট করেননি প্রধানমন্ত্রী। তবে ধারণা করা হচ্ছে পদ্মা সেতু ইস্যুতেই। কারণ প্রধানমন্ত্রীর পুরো আলোচনাই ছিল পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক প্রসঙ্গে। ’

এদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়টি বিশ্বব্যাংক প্রমাণ করতে না পারায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই ধন্যবাদ জানানো হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার তা প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তিনি বারবার বলেছেন, এই প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি, হয়ে থাকলে বিশ্বব্যাংককে তা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক সেটি প্রমাণ করতে পারেনি। কানাডার আদালতে প্রমাণ হয়েছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। এটি প্রধানমন্ত্রীর অবিচল অবস্থানের কারণেই সম্ভব হয়েছে। এ জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, দুর্নীতি হয়নি এটি প্রমাণ হওয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ায় দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের জিডিপি কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়েনি। পদ্মা সেতু হলে বাংলাদেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেত। এখন জিডিপি ৭ দশমিক ১ শতাংশের আশপাশেই থাকে।

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে না গেলে অনেক আগেই এ সেতু হতো বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রিপরিষদসচিব। তিনি বলেন, ‘২০১৪ নাগাদ হয়তো পদ্মা সেতুর বড় অবয়ব দেখতে পেতাম, এত দিনে সেতুটি বাস্তবে পেয়ে যেতাম। কিন্তু ওই স্ক্যান্ডালের কারণে উন্নয়নটা অনেক পিছিয়ে গেছে। ২০১৬ সালে আমরা পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে পারতাম। ’

বিশ্বব্যাংকের কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শফিউল আলম বলেন, সেটা সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করলে করতে পারেন, সেটা তাঁদের বিষয়।

বিশ্বব্যাংক ২০১১ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছিল। অভিযোগে বলা হয়েছিল, তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা এবং পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এসএনসি-লাভালিনের কাছে ১০ শতাংশ অর্থ কমিশন চেয়েছিলেন। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে হইচই শুরু হয়। সমালোচনার মুখে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পদ থেকে সরানো হয় যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতুসচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা এবং সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌসকে। এঁদের মধ্যে মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা, কাজী ফেরদৌসকে গ্রেপ্তার এবং সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল। পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চুক্তি করেছিল ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল। প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে ওই ঋণচুক্তি করার প্রায় ছয় মাসের মাথায় বিশ্বব্যাংক চুক্তি স্থগিত করে দেয়। ২০১২ সালের জুনে ওই ঋণচুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। পরে প্রকল্প থেকে একে একে সরে দাঁড়িয়েছিল এডিবি, জাইকা, আইডিবি।

দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ঘুষ লেনদেনের ওই অভিযোগের পর একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণ করার উদ্যোগ নেন। তাঁরই দৃঢ় মনোবলের কারণে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মূল সেতুর পাইলিং ও নদীশাসনকাজ উদ্বোধন করেন। দেখতে দেখতে মাওয়া ও জাজিরায় পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়েছে ৪০ শতাংশ। এ অবস্থায় গত শুক্রবার কানাডার এক আদালত রায়ে বলেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ কেবলই গালগল্প ও গুজব। ওই রায়ের মধ্য দিয়ে শতভাগ কলঙ্কমুক্তি ঘটল বাংলাদেশের।


মন্তব্য