kalerkantho


নিম্নমানের ভয়ংকর ওষুধ উৎপাদন!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নিম্নমানের ভয়ংকর ওষুধ উৎপাদন!

সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। তা সত্ত্বেও নিম্নমানের ওষুধের উত্পাদন চালিয়ে যেতে সব কৌশলই খাটিয়েছিল ৩৪টি ওষুধ কম্পানি।

এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের এক দফা নিষেধাজ্ঞাও আমলে নেয়নি এর মধ্যের কোনো কোনো কম্পানি। সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কিংবা অন্যান্য পর্যায়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা বা নেতার মাধ্যমে নিজেদের কালো তালিকার বাইরে রাখার বিরামহীন চেষ্টা চালিয়ে গেছে তারা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। গতকাল সোমবার উচ্চ আদালত ৩৪টি কম্পানির ওষুধ উত্পাদন বন্ধের আদেশ বহাল রেখেছেন। এর মধ্যে ২০টি কম্পানির সব ধরনের ওষুধ উত্পাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া ১১টি কম্পানির লাইসেন্স বাতিল এবং ১৪টি কম্পানিকে সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক (পেনিসিলিন, নন-পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপ) ওষুধ উত্পাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) রিট আবেদনের ওপর জারি করা রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত এ রায় দেন।

রায়ের পর ওষুধ বিশেষজ্ঞরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁরা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশে প্রকারভেদে কালো তালিকাভুক্ত আরো ২৮ ওষুধ কম্পানির বিষয়েও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, বাকি কম্পানিগুলোর কোনো কোনোটি বিভিন্ন ফাঁকফোকর বের করে ওষুধ উত্পাদনের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিজস্ব নজরদারির বাইরে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ টিম তৈরি করে সব সময়ের জন্যই তাদের কাজে লাগানো উচিত।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, আদালত সাম্প্রতিক সময়ে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষামূলক বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু এখন দেখার বিষয় হচ্ছে সরকার এই আদেশের কতটা কার্যকর করে। সরকারের উচিত হবে অধিক মুনাফালোভী সব ওষুধ কম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কম খরচে বেশি আয়ের লোভ থেকেই নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করা হয়, অতিরিক্ত ওষুধ তৈরি করা হয়, অতিরিক্ত দাম আদায় করা হয়। এভাবে নকল ও ভেজাল ওষুধের প্রসার ঘটে। অনেক ওষুধ কম্পানি কথায় কথায় বলে বিদেশে কাঁচা মালের দাম বেড়েছে বলেই তাঁরা বাধ্য হয়ে ওষুধের দাম বাড়াচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে এটা ডাহা মিথ্যা কথা। যে হারে ওষুধের দাম বাড়ে, সেই হারে কোথাও কোনো ওষুধের কাঁচামালের দাম বাড়েনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সংসদীয় কমিটি মনোনীত বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, আদালতের রায় অবশ্যই দেশের মানুষের  জীবন সুরক্ষার পক্ষেই এসেছে। এটা খুবই প্রশংসনীয়। তবে এখনো এমন অনেক কম্পানি আছে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল মেনে ওষুধ উত্পাদন হয় না। এসব কম্পানিকে খুঁজে বের করা যায়নি, বা গেলেও তারা নানা অজুহাতে পার পেয়ে যাাচ্ছে। এমন কম্পানিগুলোর ওষুধও মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। এ ধরনের কম্পানির বিরুদ্ধেই এমন কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া খুব জরুরি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক সময়ই আমাদের করার কিছু থাকে না। নানা মহলের তত্পরতায় কোনো কোনো কম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েও তা আবার কৌশল করে তুলে নিতে হয়। জিএমপি (গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস) অনুসরণ না করে ক্যান্সারের ওষুধ উত্পাদনকারী একটি কম্পানির বিরুদ্ধে সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ প্রথমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অথচ সম্প্রতি ওই কম্পানিটিকে আমরা রেহাই দিতে বাধ্য হয়েছি। আবার অনেক বড় কম্পানিরও কিছু নিম্নমানের ওষুধ বাজারে থাকলেও আমাদের পক্ষে সেগুলোর বিষয়ে সব সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। ’

কম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্যের উদাহরণ তুলে ধরে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপকমিটি-৩ কর্তৃক গঠিত নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক দল ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর ব্রিস্টল ফার্মা লিমিটেড প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে। তাদের সুপারিশ অনুসারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ২০১২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এক আদেশে প্রতিষ্ঠানটিকে পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন জাতীয় ওষুধ উত্পাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এর পরও ওই প্রতিষ্ঠানটি কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে ওই ওষুধ উত্পাদন ও বাজারজাত করছিল।

আদালতে রিট আবেদনকারী সংগঠন এইচআরপিবির পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। ওষুধ কম্পানির পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, অ্যাডভোকেট হাবিবুল ইসলাম ভুইয়া, ব্যারিস্টার তানজিব-উল আলম, অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমদে, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।

আদালত যে ২০টি কম্পানিকে সব ধরনের ওষুধ উত্পাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলো হলো এক্সিম ফার্মাসিউটিক্যালস, এভার্ট ফার্মা লিমিটেড, বিকল্প ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ডলফিন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ড্রাগল্যান্ড লিমিটেড, গ্লোব ল্যাবরেটরিজ (প্রাইভেট) লিমিটেড, জলপা ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, কাফমা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, মেডিকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ন্যাশনাল ড্রাগ ফার্মা লিমিটেড, নর্থ বেঙ্গল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, রিমো কেমিক্যালস লিমিটেড (ফার্মা ডিভিশন), রিড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, স্কাইল্যাব ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, স্টার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, সুনিপুণ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, টুডে ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ট্রপিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও ইউনিভার্সাল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

অ্যান্টিবায়োটিক (পেনিসিলিন, নন-পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপ) উত্পাদন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে ১৪ প্রতিষ্ঠানকে সেগুলো হলো এলকাড ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, বেলসেন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, বেঙ্গল ড্রাগস অ্যান্ড কেমিক্যালস (ফার্মা) লিমিটেড, ব্রিস্টল ফার্মা লিমিটেড, ক্রিস্টাল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, মিল্লাত ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, এমএসটি ফার্মা অ্যান্ড হেলথকেয়ার লিমিটেড, অরবিট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ফরমিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, ফিনিক্স কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি (প্রা.) লিমিটেড, রাসা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও সেভ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

যে ১১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো—ডলফিন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ড্রাগল্যান্ড লিমিটেড, জলপা ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, কাফমা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ন্যাশনাল ড্রাগ ফার্মা লিমিটেড, নর্থ বেঙ্গল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, রিমো কেমিক্যালস লিমিটেড (ফার্মা ডিভিশন), রীড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, সুনিপুণ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, টুডে ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও ইউনিভার্সাল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

জিএমপি নীতিমালার শর্ত মেনে ঔষধ প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছে এভার্ট ও এমএসটি কম্পানি। রায়ে তাদের আবেদন যাচাইয়ের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে দিয়েছেন আদালত। কমিটির সদস্যরা হলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ কমিটির একজন প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের একজন প্রতিনিধি ও ঔষধ প্রশাসনের একজন প্রতিনিধি। এ ছাড়া কোনো কম্পানি জিএমপি নীতিমালার শর্ত মেনে উত্পাদনে আসতে চেয়ে আবেদন করলে সে আবেদন যাচাই-বাছাই করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ওই কমিটিকে। একই সঙ্গে যেসব কম্পানির ওষুধ উত্পাদনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেসব কম্পানি গোপনে কিংবা অবৈধভাবে ওষুধ উত্পাদন করছে কি না, তা নজরদারি করে তিন মাস পরপর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে ঔষধ প্রশাসনের মহাপরিচালকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি দেশের ৮৪টি ওষুধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শন শেষে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এ প্রতিবেদন গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে মানসম্পন্ন ওষুধ উত্পাদনে ব্যর্থ হওয়া ২০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল এবং ১৪টি কম্পানির সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক (নন-পেনিসিলিন, পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপ) ওষুধ উত্পাদনের অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা হয়।

এ সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় রিট আবেদন করে এইচআরপিবি। রিট আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আদালত গত বছরের ৭ জুন ওই সব কম্পানির ওষুধ উত্পাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন এবং রুল জারি করেন। রুলে ৩৪টি কম্পানির লাইসেন্স ও অ্যান্টিবায়োটিক উত্পাদনের অনুমোদন কেন বাতিল ঘোষণা করা হবে না এবং অনুমোদন বাতিলে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর কয়েকটি কম্পানির পক্ষ থেকে হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। এ আবেদনের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রেখে ওই বছরের ১৬ জুন আপিল বিভাগ আদেশ দেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় হাইকোর্টে রুলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল রায় দেওয়া হলো।

গতকাল আদালতের রায়ের পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক নায়ার সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির সুপারিশের পর এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পেয়ে আমরা তালিকাভুক্ত সব কম্পানির বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছি। ২০ কম্পানির ওষুধ উত্পাদন বন্ধ, ১৪টির লাইসেন্স বাতিলসহ অন্য সব নির্দেশনাই আগে থেকেই বহাল রয়েছে। ’


মন্তব্য