kalerkantho


মিছিল মিটিং করায় স্কুল থেকে বহিষ্কার হই

নজির হোসেন বিশ্বাস

ইয়াদুল মোমিন, মেহেরপুর   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মিছিল মিটিং করায় স্কুল থেকে বহিষ্কার হই

বায়ান্নতে ভাষা আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। তার ছোঁয়ায় আন্দোলিত হয়েছিল মেহেরপুরও।

তত্কালীন ভাষা সংগ্রাম কমিটির ছাত্ররা পুরো ফেব্রুয়ারি মাস শহরে আন্দোলন করেছিলেন। ভাষার দাবিতে মিছিল-মিটিং করায় এবং পোস্টার লাগানোয় মেহেরপুরের সাত ছাত্রকে আটক করেছিল পুলিশ। পরে তাঁদের স্কুল থেকেও বহিষ্কার করা হয়। তাঁদের একজন মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের নজির হোসেন বিশ্বাস। তাঁর জন্ম ১৯৩০ সালের ২৫ আগস্ট, বাড়ি মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামে। ছিলেন পোস্টমাস্টার। এখন বয়স ৮৭ বছর।   ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চারবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক) হয়েছে। বর্তমানে অনেকটাই শয্যাশায়ী, স্মৃতিশক্তিও বেশ লোপ পেয়েছে। কাউকে ঠিকমতো চিনতে পারেন না। তবে বুঝিয়ে বললে কিছুটা স্মৃতি মনে করতে পারেন।

সম্প্রতি তাঁর বাড়িতে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভাষা আন্দোলন নিয়ে নানা কথা বলার পর মুখ খুললেন নজির হোসেন বিশ্বাস। বললেন, ‘শহরের মানুষ খুব সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে। সেই বায়ান্ন সালের কথা। ওপর থেকে নির্দেশ এলো মিছিল করতে হবে। মিছিল করলাম, ব্যবসায়ীরাও শহরের সব দোকান বন্ধ করে দিলেন। তখন আমি শহরের মুসলিম হোস্টেলে থাকতাম। ’ এটুকু বলার পর খেই হারিয়ে ফেললেন। তারপর যতবারই জিজ্ঞেস করা হলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা বলতে লাগলেন। পাশে বসে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। মেজ ছেলে আবদুল্লাহ আল মাসুদও ছিলেন। মাসুদ তাঁর বাবার লেখা ভাষা সংগ্রাম নিয়ে চিঠি দেখালেন। চিঠিগুলো বিভিন্ন সময় মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

চিঠি থেকে জানা গেল, বায়ান্নতে মেহেরপুর মডেল স্কুলে (বর্তমানে মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন নজির হোসেন। থাকতেন শহরের মুসলিম হোস্টেলে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে পুলিশ গুলি করে। সেই খবর মেহেরপুরে পৌঁছে পরের দিন। শুনে ছাত্র-জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রশাসনের বাধা উপেক্ষা করে শহরে মিছিল বের করে। তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ব্যবসায়ীরাও দোকান বন্ধ করে দেন। শহরজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। ভাষার দাবিতে পুরো ফেব্রুয়ারি মাস আন্দোলন চলে। পরের বছর ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালন উপলক্ষে মিছিল ও সমাবেশ করেন নজির হোসেনসহ অন্য ছাত্ররা। পুলিশ তাঁদের মিছিলে লাঠিপেটা করে এবং নজির হোসেনসহ সাতজনকে আটক করে। পরে সন্ধ্যার দিকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালে শহীদ দিবস পালন করলেও সেবার প্রশাসন কোনো বাধা দেয়নি। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। তা উপেক্ষা করে নজির হোসেনসহ অন্যরা ভাষার দাবিতে পোস্টারিং, মিছিল ও মিটিং করেন। পুলিশ তাঁদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে অনেক ছাত্র আহত হয়। ওই দিন রাতে নজির হোসেনসহ সাতজনকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়। অন্যরা হলেন ইসমাইল হোসেন, সামসুল হুদা, কদম রসুল, আবুল কাশেম, গোলাম কবীর ও মোশারফ হোসেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁরা আদালত থেকে জামিন পান। ২৪ ফেব্রুয়ারি স্কুল কমিটি মিটিং করে তাঁদের সাতজনকে বহিষ্কার করে। ফলে নজির হোসেনসহ ওই সাতজন আর কোথাও পড়ালেখা করতে পারেননি। সাতজনের মধ্যে বর্তমানে দুজন জীবিত আছেন। তাঁদের একজন নজির হোসেন, আরেকজন ইসমাইল হোসেন।  

আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘২০১০ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি এলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট ও পোশাক দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয় বাবাকে। তবে বছরের অন্য সময়ে আর কেউ খোঁজ রাখে না। গত বছর একুশে পদকের জন্য মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছি, তবে কোনো লাভ হয়নি। জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ভাষাসৈনিকের সম্মাননা ও উপহার দেওয়া হয়েছে। সেগুলো সযত্নে তুলে রাখা আছে। তবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি পেলে বাবার জীবনটা সার্থক হতো। একজন ভাষাসৈনিকের সন্তান হিসেবে গর্ববোধ করি। ’


মন্তব্য