kalerkantho


পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ

অতীত ভুলে সামনে তাকাতে চায় বিশ্বব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অতীত ভুলে সামনে তাকাতে চায় বিশ্বব্যাংক

কানাডার আদালতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ খারিজ হওয়ায় কলঙ্কমুক্তি ঘটেছে বাংলাদেশের। সরকারও স্বস্তিতে আছে। আর এর সূত্র ধরেই পাঁচ বছর পর ফের আলোচনায় উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিকের নাম। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিলের পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন রবার্ট জোয়েলিক, যিনি এখন আন্তর্জাতিক সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাকসের চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের তত্কালীন আবাসিক প্রধান এলেন গোল্ডস্টেইনের দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছেন অনেকে। তাঁদের মতে, বাংলাদেশ থেকে সঠিক তথ্য পাঠাতেন না গোল্ডস্টেইন।

তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে যা হয়েছে, সেটি ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে চান তাঁরা। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম গত অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরে এসেও একই ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। তিনি বাংলাদেশে সহযোগিতা বাড়ানোর ঘোষণাও দিয়ে গেছেন। আর গোল্ডস্টেইনের পর বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রধান হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন ইউহানেস জাট। দায়িত্ব পালনকালে তিনিও বলেছিলেন, অর্থায়ন বাতিলের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে রবার্ট জোয়েলিক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে অর্থায়ন বাতিল করে দেন। এটা ছিল অনৈতিক ও অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত। জোয়েলিকের পর জিম ইয়ং কিম বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তিনি শুরুর দিকে অর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের উদ্যোগ নিলেও কয়েকজনের কারণে তা করতে পারেননি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস সূত্র বলছে, গরিব দেশগুলোকে সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংকের আলাদা তহবিল ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) থেকে বাংলাদেশের জন্য সহযোগিতার হার বাড়ছে। আগামী জুনে শেষ হবে বিশ্বব্যাংকের ১৭তম আইডিএ প্যাকেজ। এর পর শুরু হবে তিন বছর মেয়াদি (২০১৭-২০) ১৮তম আইডিএ প্যাকেজ। এতে আগের প্যাকেজের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য সহযোগিতা বাড়বে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্র বলছে, ১৭তম প্যাকেজে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পেয়েছিল। ১৮তম প্যাকেজে তা বেড়ে ৬০০ কোটি ডলার হবে। এর পেছনে যুক্তি তুলে ধরে ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, ১৭তম প্যাকেজে গরিব দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংকের আইডিএতে বরাদ্দ ছিল পাঁচ হাজার ২০০ কোটি ডলার। নতুন প্যাকেজে তা বেড়ে সাড়ে সাত হাজার কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জন্যও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা বাড়বে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলায় বাংলাদেশের কাছে বিশ্বব্যাংকের ক্ষমা চাইতে হবে—এসংক্রান্ত যেসব কথাবার্তা হচ্ছে সেগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য। অবশ্য এ ব্যাপারে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি অংশ আসে উন্নয়ন সহযোগী থেকে। যাতে বিশ্বব্যাংকেরও বড় অবদান আছে। ফলে সরকারের এখন উচিত হবে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যে সুসম্পর্ক বিরাজ করছে, তা বহাল রাখা।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্ষমা চাওয়া নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে, দেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক আমাদের বড় উন্নয়ন সহযোগী। আমাদের এডিপি বাস্তবায়নে এখনো বিশ্বব্যাংক থেকে বড় অর্থায়ন আসে। আমি আশা করব, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না, যাতে সংস্থাটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের আবার অবনতি ঘটে। ’

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, কানাডার আদালতে রায়ের পরও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক আগের মতোই আছে, ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। দুই পক্ষের কর্মকাণ্ডও স্বাভাবিক রয়েছে। গতকাল দুই পক্ষের মধ্যে বীমা খাতের উন্নয়নের একটি প্রকল্পে সমঝোতা হয়েছে ইআরডির সম্মেলনকক্ষে। এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক সাত কোটি ডলার ঋণ দেবে। এ ছাড়া আগামীকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশের আঞ্চলিক আবহাওয়া ও জলবায়ু সেবা শিরোনামের একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন হবে। এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে।

বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বাতিল করলেও তারা সে টাকা ফেরত নেয়নি। ওই টাকা অন্য প্রকল্পে দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাড়বে বলেও জানিয়েছেন ইআরডির কর্মকর্তারা।


মন্তব্য