kalerkantho


খালেদার সাজার আগেই বিএনপিতে চক্র-চক্রান্ত!

এনাম আবেদীন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



খালেদার সাজার আগেই বিএনপিতে চক্র-চক্রান্ত!

দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হতে পারে এমন আশঙ্কা বিএনপিতে প্রবলভাবেই আছে। তবে চেয়ারপারসন দণ্ডিত হয়ে গেলে দল কিভাবে চলবে এ প্রশ্নে নেতাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। খালেদা জিয়াও এ বিষয়ে কারো সঙ্গে কথা বলেননি। অথচ এ নিয়ে বিএনপিতে সৃষ্টি হয়েছে একটি চক্র। শুরু হয়ে গেছে চক্রান্ত। এ পরিস্থিতিকে ‘দলীয় কোন্দলের বহিঃপ্রকাশ’ বলে মনে করছেন সিনিয়র নেতারা।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির চলতি অবস্থা ব্যাখ্যা করছেন একটি উদাহরণ দিয়ে। তিনি বলেন, ‘অনেক ধনী পরিবারের কর্তা মারা যাওয়ার পর দেখা যায় লাশ দাফনের আগেই সহায়-সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারার প্রশ্ন উঠে যায়। বিএনপিরও এখন সেই অবস্থা। খালেদা জিয়ার সাজা এখনো হয়নি। অথচ তাঁর আগেই দলে চক্র-চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে।

জানা গেছে, এ পরিস্থিতিতে এখন বিএনপির এক নেতা আরেক নেতার বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। কারণ কোথাও যদি দুজন নেতা একসঙ্গে বসেন  তাহলেই একটি পক্ষ খালেদা জিয়ার কান ভারী করছে এই বলে যে তাঁর ও দলের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা হচ্ছে।

বিএনপিপন্থী সুধীসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের বাসায় অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের সূত্র ধরে এ কোন্দল তথা চক্রান্তের বিষয়টি  নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ওই বৈঠক হয়েছিল মূলত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মান ভাঙানোর জন্য। সুধীসমাজের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি তাঁর বাসায় গিয়েছিলেন সেদিন।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছাড়াও অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, মাহফুজ উল্লাহ, অধ্যাপক মোস্তাহিদুর রহমান, অধ্যাপক ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক বোরহান আহমেদ, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বিএনপির পক্ষ থেকে ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বৈঠক প্রসঙ্গে অবশ্য তাঁরা কথা বলতে রাজি হননি।  

জামায়াতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে কিছুদিন আগে বিএনপির কয়েকজন নেতার বিরাগভাজন হন অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। কারণ ২০ দলীয় জোটের স্বার্থে তখন জামায়াতের পক্ষে কথা বলতে হয় মির্জা ফখরুলকে। এর জন্য বেশ কয়েক মাস ‘অভিমান’ করে ঘরে বসে ছিলেন এমাজউদ্দীন আহমদ। তাঁকে স্বাভাবিক করাই ছিল ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য। এ ছাড়া দল কিভাবে চাঙ্গা করা যায় সে বিষয়েও আলোচনা হয় সেখানে। কিন্তু খালেদা জিয়ার সাজা হলে কিভাবে দল চলবে বা কারা চালাবেন তা নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা তো দূরে থাক; প্রসঙ্গও ওঠেনি বলে জানান জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘চা খাওয়ার ওই আলোচনার সূত্র ধরেই বিএনপির কে বা কারা রটিয়ে দিয়েছেন যে বিএনপি কারা চালাবে সে ব্যাপারে আমরা নাকি নামের তালিকা বানাচ্ছি। ’  তিনি বলেন, ওই রটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত থাকতে পারে; অথবা কোনো এজেন্সিরও কাজ হতে পারে।

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমার এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় সেদিন কয়েকজন লেখক চা খেতে এসেছিলেন। সেখানে খালেদা জিয়ার সাজা হলে দল কারা চালাবেন এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। অথচ রটানো হচ্ছে, দল চালানোর জন্য আমরা তালিকা করছি। ’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা হওয়ার আগেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে; সম্ভবত দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ষড়যন্ত্রকারীরা এর সঙ্গে জড়িত। এটি দুঃখজনক। তা ছাড়া বিএনপি কারা চালাবেন সে তালিকা করার আমরা কে?’ যোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ভিসি।

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি কিভাবে চলবে সেই আলোচনা সেদিন করার প্রশ্নই ওঠে না। তা ছাড়া সুধীসমাজ বা আমাদের সেই অথরিটিও নেই। বিএনপি কিভাবে চলবে সে চিন্তা ও দায়িত্ব দলটির চেয়ারপারসন তথা স্থায়ী কমিটির। ’ তাঁর মতে, ‘এগুলো বিভ্রান্তি ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয়। ‘এমাজউদ্দীন সাহেবের বাসায় সেদিন চা খেতে বসে দেশের পরিস্থিতি, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি—বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের একাংশ ওই ঘটনাকে ‘চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত’ হিসেবে প্রচার করতে চায়। এ অংশ ফখরুলসহ বিএনপির বর্তমান সিনিয়র নেতাদের ঘোর বিরোধী। দলের ভেতরে ও বাইরে তারা প্রচার করে থাকে, সিনিয়র নেতারা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ফখরুল-বিরোধী বলে পরিচিত এ অংশের মূল লক্ষ্য হলো খালেদা জিয়ার মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ রোপণ করে বিভিন্নভাবে ‘সুবিধা’ নেওয়া। পাশাপাশি দলের নিয়ন্ত্রণ লাভ করা। যদিও খালেদা জিয়া এ পর্যন্ত তাঁদের ফাঁদে পা দেননি। বরং গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো ইস্যু নিয়ে তিনি সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেই আলোচনা করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চেয়ারপারসন আইনি লড়াইয়ে আছেন। তাঁকে সাজা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি না। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তাঁরা বলেন, বিএনপিতে চেয়ারপারসন আছেন, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আছেন, গঠনতন্ত্র আছে, আছে স্থায়ী কমিটিও। এর বাইরে রয়েছে লাখ লাখ কর্মী। কেউ চাইলেই বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করতে পারবে না।

বিএনপির গঠনতন্ত্রে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ বলে কোনো পদ নেই। কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়ার কোনো বিধানও নেই। গত ৩৩ বছরে কারাগারে বা বিদেশে যাওয়ার সময় কখনোই খালেদা জিয়া চেয়ারপারসনের দায়িত্ব কাউকে দিয়ে যাননি। শুধু একবার এরশাদ সরকারের সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তত্কালীন স্থায়ী কমিটির এক নম্বর সদস্য মির্জা গোলাম হাফিজকে তিনি ওই দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপারসন নিজেও স্থায়ী কমিটির সদস্য। ফলে দিতে চাইলে স্থায়ী কমিটির একজনকে ওই দায়িত্ব দেওয়াই সুবিধাজনক। তবে ইচ্ছা করলে একজন ভাইস চেয়ারম্যানকেও তিনি দায়িত্ব দিতে পারেন। এ জন্যই ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর গঠিত কমিটিতে তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করার পাশাপাশি তাঁকে ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ সদস্যও করা হয়। সর্বশেষ কাউন্সিলেও তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান রাখা হয়েছে।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এককভাবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা খালেদা জিয়ার। চেয়ারম্যান/চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে কী করা হবে—এ ধরনের কোনো বিধান বিএনপির গঠনতন্ত্রে নেই।

প্রসঙ্গ, ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারের আগে খালেদা জিয়া কাউকে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব দিয়ে যাননি। তবে এক-এগারো পরবর্তী জরুরি সরকারের সময় দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় মহাসচিব পদ থেকে আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে সরিয়ে তিনি খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে দায়িত্ব দিয়ে যান। আর তাঁকে সহযোগিতা করেন তত্কালীন উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য প্রয়াত আ স ম হান্নান শাহ। ওই সময় অবশ্য আদালতে খালেদা জিয়ার সাজা হয়নি। ফলে এবার যদি তাঁর সাজা হয়, সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পদক্ষেপ কী হতে পারে তা নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ জনমনেও কৌতূহল রয়েছে।

এক-এগারো পরবর্তী জরুরি সরকার খালেদা জিয়াকে জোর করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। তবে অত্যন্ত টালমাটাল ওই পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের এপ্রিলে হঠাৎ করেই খালেদা তাঁর ভাই মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দারকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনীত করেন। দেশের বাইরে চলে গেলে ওই সময় সাঈদ এস্কান্দারকেই দলের দায়িত্ব দেওয়া হতো বলে বিএনপি নেতারা এখনো মনে করেন।


মন্তব্য