kalerkantho


বন্ড সুবিধার অপব্যবহার

আমদানি-রপ্তানি স্থগিত ১,৬৮৯ প্রতিষ্ঠানের

ফারজানা লাবনী   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আমদানি-রপ্তানি স্থগিত ১,৬৮৯ প্রতিষ্ঠানের

এক হাজার ৬৮৯টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিআইএন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) অকার্যকর করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থপাচার এবং বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানি করে কারখানায় ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রি করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আর্থিক অনিয়ম করে আমদানি করা কাঁচামালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে আর্ট কার্ড, ডুপ্লেক্স বোর্ড, কার্বনলেস পেপার, হার্ড টিস্যুসহ কাগজ জাতীয় বিভিন্ন পণ্য, যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। বিআইএন অকার্যকর করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই তৈরি পোশাক খাতের।

এসব প্রতিষ্ঠান এনবিআরের বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল। বিআইএন অকার্যকরের আদেশ গত মঙ্গলবার থেকে চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান এখন থেকে আর কোনো পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করতে পারবে না।

প্রসঙ্গত, শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পের উত্পাদন উৎসাহিত করতে কাঁচামাল আমদানিতে বন্ড সুবিধার নামে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে সরকার। তবে এ সুবিধা পেতে হলে কিছু শর্ত মানতে হয়। অথচ সরকারের এসব বিধিনিষেধ না মেনে অভিযুক্ত এক হাজার ৬৮৯টি প্রতিষ্ঠান কারখানায় পণ্য উত্পাদনে ব্যবহারের কথা বলে বন্ড সুবিধার আওতায় কাগজ ও কাগজজাতীয় মালামাল আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। আমদানি করা এসব পণ্য দেশের ৮৫টি কাগজকলে উত্পাদিত একই জাতীয় পণ্যের চেয়ে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা কমে বিক্রি করেছে তারা।

এভাবে স্থানীয় কাগজ ব্যবসায়ীদের অসম প্রতিযোগিতায় ফেলেছে। পাশাপাশি বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে বিদেশ অর্থ পাচার করেছে।

এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, শুল্ক মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল এবং ট্যাক্সেস অ্যান্ড লিগ্যাল এনফোর্সমেন্ট শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে ৩০ সদস্যের টাস্কফোর্স প্রায় এক বছর ধরে বিস্তারিত তদন্ত করেছে। তদন্তে তারা এক হাজার ৬৮৯টি প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচার ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বিষয়ে নিশ্চিত হয়। টাস্কফোর্স কমিটি ৯০ পাতার তদন্ত প্রতিবেদন গত বছরের ১৫ নভেম্বর এনবিআর চেয়ারম্যানের দপ্তরে জমা দেয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান আবারও যাচাই-বাছাই করে গত মঙ্গলবার অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিআইএন অকার্যকর করেন।

সূত্র জানায়, বিআইএন অকার্যকর হওয়ায় এক হাজার ৬৮৯টি প্রতিষ্ঠান এখন থেকে আর কোনো পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারবে না। কোনো পণ্য আমদানির ফরমায়েশও দিতে পারবে না। কোনো পণ্য রপ্তানিতে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে না। তারা আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সরকারি-বেসরকারি সুবিধা নিতে পারবে না। এমনকি ব্যাংকে তাদের এলসি (ঋণপত্র) খোলা, বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত পণ্য আনা, বন্দরে পণ্য খালাস বা চালানসহ আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকা ব্যক্তিদের বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সব কার্যক্রমও বন্ধ করা হয়েছে। যদিও তদন্তকালীনই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি-রপ্তানি সাময়িক স্থগিত করা হয়েছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে এক হাজার ৬৮৯ প্রতিষ্ঠানের নাম, তারা কী ধরনের ব্যবসা করছে, কোন রাজস্ব সার্কেলের আওতায়, কোন জাতীয় বন্ড রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের, আর্থিক অনিয়মের সময় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ বা অকার্যকর ছিল, নাকি উত্পাদনে ছিল, প্রতিষ্ঠানের নামে মামলা আছে কি না—এসব তথ্য উল্লেখ আছে। বিআইএন বাতিল বা বন্ধ করা প্রতিষ্ঠানের তালিকা বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সব বন্দর, বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও অর্থ মন্ত্রণালয়েও এ তালিকা পাঠিয়েছে এনবিআর।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজস্ব উন্নয়নের অক্সিজেন। ব্যবসায়ী নামধারী কিছু অসৎ ব্যক্তি আর্থিক অনিয়ম করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে, দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করছে। এনবিআর এসব প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেই থেমে থাকছে না। শাস্তির আওতায় আনতেও কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দেশ থেকে পাচার করা অর্থের ৮০ শতাংশই হয় মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাণিজ্যের আড়ালে। বছরে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে যে পরিমাণ আর্থিক অনিয়ম হয় সে পরিমাণ অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতুর মতো দুটি সেতু নির্মাণ সম্ভব। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীরা দেশের শত্রু। সৎ ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পাশে থেকে এনবিআর কাজ করে চলেছে।

এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এক হাজার ৬৮৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩৭টির বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। এ ছাড়া ২৩৪টি প্রতিষ্ঠান একসময় উত্পাদনে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে উত্পাদনে নেই। অথচ এসব অস্তিত্বহীন ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেও কোটি কোটি টাকার অর্থ পাচার করা হয়েছে। শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো উত্পাদনে আছে। তবে পণ্য উত্পাদনে তাদের যে পরিমাণ কাঁচামাল প্রয়োজন হয়, তারা আমদানি করেছে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। আর আমদানি করা অতিরিক্ত কাঁচামাল তারা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। আবার ব্যাংকে এলসি খুলে পণ্য আমদানির নামে বিদেশে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অনূকূলে মোটা অঙ্কের অর্থ পাঠিয়ে দিলেও বাস্তবে তারা পণ্য আমদানি করেছে নির্দিষ্ট হিসাবের চেয়ে অনেক কম। এমনকি অনেক সময় আদৌ কোনো পণ্য আমদানিই করেনি। এ ছাড়া পণ্য রপ্তানি করেও কোনো অর্থ দেশে আনেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। এভাবে তারা দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যের আড়ালে আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে অর্থ পাচার করেছে এবং বন্ড সুবিধায় আনা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে আর্থিক অনিয়ম করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান মিথ্যা তথ্য উল্লেখ করে জাল কাগজপত্র তৈরি করে তা ব্যাংকে ও এনবিআরে জমা দিয়ে অর্থ পাচার করেছে এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করেছে। এসব কাগজপত্রে আমদানি করা পণ্যের নাম, পরিমাণ, মূল্য, কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য কেনা হচ্ছে—এসব বিষয়ে তারা মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। বিদেশে যেসব বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অনূকূলে পণ্য আমদানির নামে ব্যাংকে এলসি খুলে অর্থ পাঠানো হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই অভিযুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। অনেক সময় নিজস্ব প্রতিষ্ঠান না হলেও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমঝোতা ছিল। এভাবে অর্থ পাচার করা হয়েছে। পরে পাচার করা অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বিদেশে নিজের তহবিলে নিয়ে নিয়েছে।   

এনবিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক হাজার ৬৮৯টি প্রতিষ্ঠানের অনূকূলে আমদানি করা পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর পর তা সড়কপথে সরাসরি রাজধানীর ইসলামপুর, নয়াবাজার, হাশেম টাওয়ার, গুলশান আরা সিটি, মিটফোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দোকানে দোকানে আগে থেকেই চুক্তি করে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পণ্য পৌঁছে দেওয়ার শর্তে এসব দোকান থেকে আগেই অগ্রিম অর্থ নিয়েছে। অনেক সময় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পরও নগদ অর্থ নিয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১১টায় শুল্ক গোয়েন্দাদের একটি দল রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক থেকে ৩৫০ জিএসএম সাইজের ১৮.২ কটন ডুপ্লেক্স বোর্ড (তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাগজজাতীয় কাঁচামাল) বোঝাই একটি কাভার্ড ভ্যান আটক করে। ভ্যানের নম্বর ঢাকা মেট্রো ট ১১-৬২৬৯। আটক পণ্যের মূল্য প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা। জিজ্ঞাসাবাদে কাভার্ড ভ্যানের চালক ইমাম হোসেন জানায়, নাহিদ প্লাস্টিক লিমিটেডের নিজস্ব বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা এসব ডুপ্লেক্স বোর্ড রাজধানীর নয়াবাজারে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে সে। তবে সেখানে কে বা কারা এসব পণ্য গ্রহণ করবে তা সে জানে না। চালকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী শুল্ক গোয়েন্দার সাত সদস্যের একটি তদন্তদল ওই দিন বিকেলে দক্ষিণখান, ধীরাশ্রম ও গাজীপুরে মেসার্স নাহিদ প্লাস্টিক লিমিটেডের একাধিক কারখানায় পরিদর্শনে গিয়ে খতিয়ে দেখে আর্থিক অনিয়ম পায়।  

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসায়ী নামধারী কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার করছে। এসব প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত পণ্য এনে খোলাবাজারে বিক্রি করে স্থানীয় অর্থনীতি ধ্বংস করছে।


মন্তব্য