kalerkantho


লণ্ডভণ্ড মাইক্রো আছড়ে পড়ল ১০০ ফুট দূরে

নরসিংদীতে বেপরোয়া বাস কেড়ে নিল ১৩ প্রাণ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



লণ্ডভণ্ড মাইক্রো আছড়ে পড়ল ১০০ ফুট দূরে

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নরসিংদীর বেলাব উপজেলার একটি ছোট বাসস্ট্যান্ড দড়িকান্দী। দ্রুতগামী যানবাহনের গতির লাগাম টানতে সেখানে মহাসড়কে গতিরোধক দেওয়া হলেও তাতে তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই চালকদের।

ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে সেখানে। গতকাল রবিবারও ওই বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী-শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে পথচারীসহ প্রায় ২০ জন। এদের মধ্যে পাঁচজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং একজনকে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে। নিহত সবাই শ্রমজীবী। তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা নিকলীর ছাতিরচর গ্রামে। গ্রামের ঐতিহ্যবাহী এক মেলায় যোগ দিতে ঢাকার কামরাঙ্গীর চর থেকে মাইক্রোবাসে করে বাড়ি ফিরছিল তারা। কিন্তু হবিগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী একটি বেপরোয়া বাস ওই মাইক্রোবাসটিকে সামনাসামনি আঘাত করে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে প্রায় ১০০ ফুট দূরে ঠেলে নিয়ে যায়। এতে মাইক্রোবাসটি চুরমার হয়ে যায় আর ঘটনাস্থলেই থেমে যায় মাইক্রোবাসে থাকা ১১ জনের প্রাণ। গুরুতর আহত আরো দুজন পরে মারা যায়। এ ছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল আলাদা সড়ক দুর্ঘটনায় স্কুল ছাত্রী, দোকানকর্মীসহ পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে। এদের মধ্যে রাজধানীর মিরপুরে এক দোকানকর্মী এবং চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় এক স্কুল ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বাসচাপায়। বেপরোয়া ট্রাকের ধাক্কায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে নিহত হয়েছেন মোটরসাইকেলচালক এক যুবক। ঢাকার সাভারে মিনিবাস উল্টে প্রাণ গেছে হেলপারের (চালকের সহকারী)। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন মোটরসাইকেল আরোহী এক যুবক। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর আগের ১১ দিনে বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আরো ৬৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। নরসিংদীর দড়িকান্দী থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক নাসরুল আনোয়ার ও সুমন বর্মণ জানান, গতকাল সকাল পৌনে ৮টার দিকে দড়িকান্দী বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে নিহত হন ছাতিরচর গ্রামের মানিক মিয়া (৫৫), তাঁর স্ত্রী সাফিয়া খাতুন (৪৫), ছেলে অন্তর আলম (১২), আরেক ছেলে নূরে আলমের স্ত্রী শারমিন আক্তার (২৮), তাঁর এক বছরের ছেলে রাব্বি, মধু মিয়ার ছেলে হাসান মিয়া (৫০), তাঁর স্ত্রী হালিমা খাতুন (৪০), তাঁর ছেলে ইশান (১০), শ্যালিকা জুম্মা আক্তার জুমা (১৫), সিদ্দিক মিয়ার স্ত্রী সাধনা খাতুন (৪০), সবদর আলীর ছেলে হিরা মিয়া (৪৫), মরম আলীর ছেলে নাজমুল (৩০) এবং মাইক্রোবাসের চালক ঢাকার ২৮৯ পূর্ব নাখালপাড়ার সাঈদ আহমেদ (৫০)।

হাইওয়ে পুলিশের ভৈরব থানার ওসি এ কে এম মিজানুল হক জানান, হবিগঞ্জ থেকে ঢাকা যাচ্ছিল অগ্রদূত পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস (নং ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৬৫৬৮)। অন্যদিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মাইক্রোবাসটি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার হিলচিয়া যাচ্ছিল। সকাল পৌনে ৮টার দিকে দড়িকান্দি বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের চালকসহ ১১ আরোহী নিহত হন। আহত হন মাইক্রোবাসের যাত্রী শারমিন আক্তার (২৮), তাঁর এক বছরের ছেলে রাব্বি, ফিরোজা বেগম (৩০), তাঁর ছেলে মারুফ (৮), বাসের যাত্রী ভৈরবের চণ্ডীবের গ্রামের সিরাজ মিয়া (৫০), কাউছার মিয়া (৩৫) এবং পথচারী দড়িকান্দি গ্রামের লিপি আক্তার (৩৬), আশিক (১২) ও মাজেদ মিয়াসহ (২৫) অন্তত ২০ জন। তাঁদের মধ্যে আহত শারমিন আক্তার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেলে মারা যান। পরে সন্ধ্যায় তাঁর শিশুসন্তান রাব্বিরও মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনায় মহাসড়কের যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে উদ্ধারকাজ শুরু করে। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধারকাজে যোগ দেন। এক ঘণ্টা পর দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।

সকালে দড়িকান্দি বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের এক পাশ রক্তে লাল হয়ে গেছে। সঙ্গে মাইক্রোবাসের ধ্বংসাবশেষ। র‌্যাকার দিয়ে পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি সরিয়ে নেয়। ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আশপাশের কৌতূহলী লোকজন ভিড় জমায় ঘটনাস্থলে।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দড়িকান্দি বাসস্ট্যান্ডের চা বিক্রেতা বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো আজও (রবিবার) সকালে আমি দোকানদারি করছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে মহাসড়কের দিকে তাকিয়ে দেখি, একটি বড় বাস একটি মাইক্রোবাসকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। ১০০ ফুট দূরে গিয়ে বাসটি থামলেও ততক্ষণে মাইক্রোবাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়। আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে ছুটে গেলেও মাইক্রোবাস থেকে কাউকে বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক কষ্ট করে মাইক্রোবাসে আটকে থাকা লোকজনকে বের করতে পারলেও ততক্ষণে তিনজন ছাড়া সবাই মারা যান। ’

নিহত মানিক মিয়ার ভাই স্বপন মিয়া দুর্ঘটনাস্থলে কালের কণ্ঠকে জানান, ছাতিরচর গ্রামের অনেক লোক ঢাকায় শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করে। আগামী বুধবার থেকে ছাতিরচর গ্রামে ঐতিহ্যবাহী মেলা শুরু হচ্ছে। বার্ষিক ওই মেলায় যোগ দিতে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে দুটি মাইক্রোবাসে ১৪ জন করে মোট ২৮ জন অনেক দিন পর বাড়ি ফিরছিল। একটি মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় পড়ে।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে হাইওয়ে পুলিশের ভৈরব থানায় নেওয়া হয় লাশ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা থানায় ছুটে আসতে থাকে। ওই সময় প্রিয়জনের লাশ দেখে তারা কান্নায় ভেঙে পড়ে। নুর নবী নামের একজন বলেন, ‘মা-বাবা, ছোট ভাই, ভাবি ও ভাতিজা একসঙ্গে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরছিলেন। সকালে খবর পাই তাঁদের মাইক্রোবাসটি দুর্ঘটনায় পড়েছে। ছুটে এসে দেখি সবাই মারা গেছেন। এই দুর্ঘটনা আমাদের সর্বস্বান্ত করে দিল। ’

ঘটনার পর যাত্রীবাহী বাসের চালক পালিয়ে গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুর্ঘটনাকবলিত দুটি গাড়ি উদ্ধার করে ভৈরব হাইওয়ে থানায় নিয়ে গেছে। ওই ঘটনায় হাইওয়ে থানার এএসআই সজীব বাদী হয়ে বাসের চালককে আসামি করে ভৈরব থানায় একটি মামলা করেছেন। তবে চালকের পরিচয় জানা যায়নি।

ভৈরব হাইওয়ে থানার ওসি এ কে এম মিজানুল হক বলেন, ‘দুর্ঘটনাটি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঘটেছে। এখানে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্পিড ব্রেকার দেওয়া আছে। এর পরও যাত্রীবাহী বাসটির বেপরোয়া গতিতে ওভারটেকিংয়ের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসনের অনুমতিতে মৃতদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ’

দুপুর নাগাদ মৃতদেহ ছাতিরচরে পৌঁছালে গ্রামজুড়ে কান্নার রোল পড়ে। মৃতদেহ গ্রহণ করতে নদীরপারে ভিড় জমায় গ্রামের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ। নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও গ্রামবাসীর আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিকেলে ছাতিরচর কবরস্থানের পার্শ্ববর্তী মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় কবরস্থানে ১০ জনের মৃতদেহ দাফন করা হয়েছে।

রাজধানীতে বাসচাপায় দোকান কর্মচারী নিহত : ঢাকায় আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, রাজধানীর মিরপুর থানার পল্লবীতে বাসচাপায় গুরুতর আহত দোকান কর্মচারী ফরহাদ হোসেন (২০) গতকাল ভোরে মারা গেছেন। নিহত ফরহাদ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার শহিদুল মিয়ার ছেলে। ফরহাদের ভাই রাশেদ জানান, ফরহাদ মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে থাকতেন এবং একটি হোম ডেলিভারির দোকানে কাজ করতেন। গত শনিবার রাত ১টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে ব্র্যাক ব্যাংকের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় বসুমতি পরিবহনের একটি বাস তাঁকে চাপা দেয়। সাতকানিয়ায় বাসচাপায় প্রাণ গেল স্কুল ছাত্রীর : প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল ৯টার দিকে ছদাহা কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী রূপসী নাথ (১২) রাস্তা পার হওয়ার সময় শাহ আমিন পরিবহনের দ্রুতগামী একটি বাস তাকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় রূপসী। খবর পেয়ে বিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী মিলে সাতকানিয়ার মিঠাদিঘী এলাকায় ছদাহা কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ও বেঞ্চ রেখে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।

কালিয়াকৈরে বেপরোয়া ট্রাক কেড়ে নিল যুবকের প্রাণ : প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, ঢাকার শেওরাপাড়া এলাকার আক্তার হামিমের ছেলে আসিফ মাহ্মুদ স্বপন (২৮) গতকাল সকালে মোটরসাইকেলে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের সখিপুর যাচ্ছিলেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে তিনি কালিয়াকৈরের খারাজোরা এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে বেপরোয়া গতিতে আসা মালবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলটির সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে এবং চালক আসিফ মাহ্মুদ স্বপন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

সাভারে মিনিবাস উল্টে হেলপার নিহত : সাভার (ঢাকা) থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সকাল ৮টার দিকে সাভারের গেণ্ডা এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে একটি মিনিবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে হেলপার (চালকের সহকারী) মো. নুরু (২২) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আহত হন অন্তত সাতজন পোশাক শ্রমিক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকালে সাভারের রেডিও কলোনি এলাকা থেকে কয়েকজন পোশাক শ্রমিক নিয়ে ওই মিনিবাসটি উলাইল এলাকায় যাচ্ছিল। বাসটি গেণ্ডা এলাকায় পৌঁছলে চাকা ফেটে যায়। এতে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে বাসটি মহাসড়কের ওপর উল্টে যায়।

কসবায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত : এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, জেলার কসবা উপজেলার কুটি ইউনিয়নের লেসিয়ারায় গতকাল বিকেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী মো. রিফাত (২৬) নিহত হয়েছেন।


মন্তব্য