kalerkantho


শ্রীপুরে সাফারি পার্কে ইজারাদারের দাপট

ঢাবি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ঢাবি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

গাজীপুরের শ্রীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে গতকাল শনিবার শিক্ষা সফরে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ওপর হামলা চালিয়েছে ইজারাদারের লোকজন ও বন বিভাগের কর্মীরা। হামলায় এক শিক্ষক এবং ১৯ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

আহত আটজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পৌঁছে বন বিভাগের এক নারী কর্মীসহ পাঁচজনকে আটক করেছে।

এর আগে ২০১৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ওই সাফারি পার্কে শিক্ষা সফরে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ওপরও হামলা চালিয়েছিল ইজারাদারের লোকজন।

হামলার শিকার দর্শনার্থীরা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সাতজন শিক্ষকসহ পাঁচটি ব্যাচের ১৭৮ জন ছাত্রছাত্রী শিক্ষা সফরে পার্কে আসেন। তাঁরা বন সংরক্ষকের অনুমতিপত্র নিয়ে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পার্কে প্রবেশ করতে যান। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পার্কের ফটকে বন সংরক্ষকের অনুমতিপত্র দেখালে নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের কাউন্টারে যেতে বলেন। পরে কাউন্টারে গিয়ে অনুমতিপত্র দেখালে ইজারাদারদের লোকজন প্রত্যেকের পরিচয়পত্র দেখতে চায়। ওই সময় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্রের বদলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকা জমা দেওয়ার রসিদ (পে ইন স্লিপ) দেখালে খেপে যায় ইজারাদাররা। তারা পরিচয়পত্র না থাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে জনপ্রতি ৫০ টাকা প্রবেশ ফি দাবি করে।

একপর্যায়ে পার্কে কর্তব্যরত বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অবহিত করলে ইজারাদারদের লোকজন শিক্ষার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দেয়। তবে ছাত্রীরা ফটক দিয়ে প্রবেশকালে ফটক ঘেঁষে ইজারাদারদের কিছু বখাটে কর্মী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে।

শিক্ষার্থী রেজাউল আমিন রেজা অভিযোগ করেন, ভিড়ের মধ্যে প্রবেশকালে দুই বখাটে কর্মী এক ছাত্রীকে শারীরিকভাবে হয়রানি করে। তাত্ক্ষণিক ওই ছাত্রী প্রতিবাদ করলে পাশে দায়িত্বরত পার্কের নারী কর্মী রেহেনা বেগম লাঠি নিয়ে ওই ছাত্রীর দিকে তেড়ে আসেন। তাঁকে ঘটনা বলতে গেলে উল্টো দুই ছাত্রীকে মারধর শুরু করেন রেহেনা। ঘটনাটির প্রতিবাদ করায় ফটক বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে থাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। হামলায় এক শিক্ষক ও ১৯ শিক্ষার্থী আহত হন। আহত ওই শিক্ষকের নাম প্রকাশ করেননি শিক্ষার্থীরা।

আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রেজাউল আমিন রেজা, এহসানুল হক কবির মুকুট, ফয়সাল আহমেদ, জোফ্ফাতুল করিম, ফরহাদ হোসেন, এস এম রিয়াদ, মাহমুদ আল ফাহাদ ও রাহাত হোসেনকে পার্কের ভেতর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

আহত ছাত্র মাহমুদ আল ফাহাদ জানান, শিক্ষা সফরে আসা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল ৫৭ জন। তাঁদের কাছে পরিচয়পত্র ছিল না। তাঁরা ভর্তির টাকা জমা দেওয়ার রসিদ (পে ইন স্লিপ) দেখালে খেপে যায় ইজারাদারদের লোকজন। পরে লাইব্রেরি কার্ড দেখালে মারমুখী হয়ে ওঠে তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্রী জানান, তাঁরা ফটক দিয়ে ঢোকার সময় ইজারাদারের কয়েকজন বখাটে কর্মী তাঁদের শারীরিকভাবে হয়রানি করে। নিষেধ করায় অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে ওই বখাটেরা।

আহত ছাত্র রাহাত হোসেন অভিযোগ করেন, ইজারাদার শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জন সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা সফরে আসা দলটি বন সংরক্ষকের কাছ থেকে প্রবেশের জন্য অনুমতিপত্র নিয়ে এসেছিল। ওই অনুমতিপত্র অনুযায়ী তারা পার্কের ফটকে কাউন্টারে ৮০০ টাকা ফি জমা দিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে প্রতেক্যের পরিচয়পত্র দেখতে চায় ইজারাদারদের লোকজন। ’

এদিকে হামলার ঘটনায় অন্য দর্শনার্থীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পৌঁছে হামলায় জড়িত রেহেনা বেগম, আবদুল লতিফ মোড়ল, খবির হোসেন, মোস্তফা কামাল ও সাইফুল ইসলামকে আটক করে। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পার্কের ফটকের ইজারাদার শ্রীপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শফিকুল ইসলামসহ অন্যরা পালিয়ে যায়।

পার্কের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শাহাব উদ্দিন দাবি করেন, ‘পার্কের কোনো কর্মী ওই হামলায় জড়িত ছিল না। ইজারাদারের কিছু অশিক্ষিত লোকজন ওই হামলা চালিয়েছে। ’

শ্রীপুর মডেল থানার পরিদর্শক (ওসি) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনা জেনে পুলিশের পৃথক কয়েকটি দল ঘটনাস্থল পৌঁছে অভিযান চালায়। হামলায় জড়িত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। অন্য সন্ত্রাসীদেরও আটকের চেষ্টা চলছে। ’

হামলার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বাদী হয়ে শ্রীপুর থানায় একটি এজাহার দিয়েছেন। এতে ইজারাদার শফিকসহ তিনজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে থানার এসআই হেলাল উদ্দিন বলেন, ওই ঘটনার একটি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে। ভিডিও দেখে দোষীদের আটকের চেষ্টা চলছে।

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম সবুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈধ অনুমতিপত্র থাকা সত্ত্বেও ইজাদারদের লোকজন বাড়াবাড়ি করেছে। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ’

সাফারি পার্ক সূত্র জানায়, ইজারার নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কার্যালয়ে আবেদন করার পর বন সংরক্ষক অনুমতিপত্র দেন। পার্কে প্রবেশ ফি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা, শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ জনের জন্য ৪০০ টাকা এবং ১০০ জনের বেশি হলে ফি ৮০০ টাকা।


মন্তব্য