kalerkantho


রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের আবেদন

প্রতিবন্ধী গৃহকর্মী হত্যার মামলাও বাদ যাচ্ছে না

ওমর ফারুক ও আলম ফরাজী   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রতিবন্ধী গৃহকর্মী হত্যার মামলাও বাদ যাচ্ছে না

একটি কাচের গ্লাস ভাঙার দায়ে রাজধানীর একটি বাড়িতে ২০১১ সালের ২০ জানুয়ারি অকথ্য নির্যাতন চালানো হয় বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী গৃহকর্মী জেসমিনের ওপর। মারাত্মক আহত গৃহকর্মীকে চিকিৎসা না করিয়ে বরিশালে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পরে স্বজনরা তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ইহলোক ত্যাগ করে জেসমিন (২০)।

ন্যক্কারজনক ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুব মহিলা লীগের নেত্রী ইসরাত জাহান নাসরিনের নাম। তিনি ও বাবুগঞ্জ উপজেলা যুব মহিলা লীগের কর্মী নাজমা আক্তার সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলার আসামি।

এই দুজনকে আসামি করে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ সেটিকে অপমৃত্যু মামলা হিসেবে রেকর্ড করে। পরে জেসমিনের বাবা এস্কান্দার মুন্সি বাদী হয়ে আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। তারা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

মামলাটিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করানোর জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন প্রধান আসামি নাসরিন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দোহাই দিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রভাবিত করারও চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

শুধু এ মামলাই নয়, ২০১৪ থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত দুই শর বেশি মামলা রাজনৈতিক মামলা হিসেবে প্রত্যাহার করানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তদবিরও চলছে জোরেশোরে। এসব মামলার মধ্যে সাবেক এক মন্ত্রী ও বর্তমান এক মন্ত্রীর আত্মীয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির মামলাও রয়েছে। রাজনৈতিক মামলা হিসেবে সেটিকে প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। সূত্র জানিয়েছে, দুর্নীতির যত মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কিছু মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। সেগুলোর প্রত্যাহার বিষয়ক আবেদন এখন যাচাই করা হচ্ছে না। ওই মন্ত্রীদের আত্মীয়দের একটি মামলাও দুদকের তদন্তাধীন।

সূত্র জানায়, দুই শতাধিক মামলার জন্য চার শতাধিক আবেদন পড়েছে প্রত্যাহারের জন্য। প্রতিদিন প্রত্যাহারের জন্য চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বাছাই কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি খতিয়ে দেখবে কোনটি রাজনৈতিক, আর কোনটি নয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এর আগে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনায় কয়েক হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেসবের মধ্যে কয়েক শ খুনের মামলাও ছিল। ২০১৪ সালে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি ১৯৮টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করে। সেগুলোর মধ্যে ৪০টি ছিল হত্যা মামলা। এসংক্রান্ত খবর মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের আবেদন এসেছে অনেকগুলো। আবেদন পাওয়ার পর মামলা প্রকৃতই রাজনৈতিক কি না তা যাচাইয়ের জন্য জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে পাঠিয়ে থাকি। তাঁদের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে প্রত্যাহারের বিষয়টি। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চাপ থাকলেই তো হবে না। যেটা রাজনৈতিক মামলা নয় সেটা প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। ’

যুবলীগ নেত্রী নাসরিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি রাজনৈতিক হিসেবে প্রত্যাহারের আবেদন পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি খতিয়ে দেখার জন্য গত জুনে চিঠি পাঠায় বরিশালের পিপি অ্যাডভোকেট গিয়াসউদ্দিন কাবুলের কাছে। একই চিঠি পাঠানো হয় বরিশালের ডিসি ও এসপির কাছে। সেখান থেকে মামলাটি রাজনৈতিক নয় বলে অভিমত দেওয়া হয়। এরপর ওই মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি আটকে যায় বলে জানা গেছে।

তার পরও হাল ছাড়ছেন না যুবলীগ নেত্রী। মামলা প্রত্যাহারের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন তিনি, অনবরত চাপ দিচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যলয়ের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। ’

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। পুলিশ তাদের খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তদবির করছে।

ঈশ্বরগঞ্জের একটি হত্যা মামলা

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল নাসির উদ্দিন ভুঁইয়া রাজু। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর ভাড়ার মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফেরার পথে যাত্রীবেশী দুর্বৃত্তের গুলিতে রাত ৮টার দিকে ইসলামপুর গাফুরিয়া মাদরাসার প্রধান ফটকের সামনে নিহত হয় সে। তার বাড়ি সদর ইউনিয়নের বালিশিতা গ্রামে।

রাজুর বাবা মাদরাসা শিক্ষক মাওলানা নুরুদ্দিন ভুইয়া জানান, তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিল সে। ঘটনার দিন ঈশ্বরগঞ্জ শহরের কাঁচামাটিয়া নদীর সেতুর কাছে নিচতুলন্দর গ্রামের নজরুল ইসলামের মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল সে। তার পেছনে অজ্ঞাতপরিচয় আরেক যাত্রী ছিল। ইসলামপুর মাদরাসার প্রধান ফটকের সামনে এসে ওই যাত্রী নেমে ভাড়া দেয় চালককে। চালক অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিতেই পেছন থেকে পিস্তল ঠেকিয়ে রাজুকে গুলি করে পালিয়ে যায় সে।

পরদিন ঈশ্বরগঞ্জ থানায় ৯ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন রাজুর চাচা আব্দুল জলিল ভুঁইয়া। থানা থেকে পনেরো দিন পর মামলাটি ময়মনসিংহ ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তাতে এক নম্বর আসামিসহ তিন অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাদী আদালতে নারাজি দেন। আদালত তা গ্রহণ করে পুনঃ তদন্তের নির্দেশ দেয়। পুনঃ তদন্ত শেষে আবারো ওই তিনজনকে বাদ দিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। গত ২৩ জানুয়ারি শুনানির সময় বাদী তাতে আবার নারাজি দেন। আর আসামিপক্ষ সময়ের আবেদন করে। সোয়া তিন বছর পর চাঞ্চল্যকর এ মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেছেন এক নম্বর আসামি আমিনুল ইসলাম। এ খবরে রাজুর পরিবারের সদস্যরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে।

পরিবারের লোকজন জানায়, মামলাটি বিচারাধীন। এ অবস্থায় প্রত্যাহার করা হলে রাজু হত্যাকাণ্ডের মতো আরো কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটাবে হত্যাকারীরা। তারা জানায়, রাজু হত্যার ঘটনা কোনো রাজনৈতিক ঘটনা নয়।

পেছনের ঘটনা : রাজুর পরিবারের সদস্যরা এবং এলাকাবাসী জানায়, ২০১৩ সালের ঈদুল ফিতরের তিন দিন পর রাস্তায় বালু ফেলাকে কেন্দ্র করে রাজুর ফুপা আব্দুল মজিদ আজাদীর সঙ্গে পাশের জাটিয়া ইউনিয়নের নিচতুলন্দর গ্রামের আমিনুল ইসলামের বাগিবতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আমিনুল আজাদীকে লাঞ্ছিত করেন। সপ্তাহখানেক পর গ্রামের লোকজন মীমাংসার জন্য সালিস দরবারের আয়োজন করে। কিন্তু দরবারের ফয়সালা মানতে রাজি হননি আমিনুল। দরবারের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তিনি চলে যেতে চাইলে রাজু তাঁকে দরবারে উপস্থিত রাখার চেষ্টা করে। তখন তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়।

রাজুর চাচা আব্দুল জলিল জানান, আমিনুল তাঁর ভাতিজার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়। প্রতিশোধ নিতেই আমিনুল লোকজন দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

মামলার এক নম্বর অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম বলেন, নিহতের পরিবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি দায়ের করে। তারা বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে জড়িত। এ কারণে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন।


মন্তব্য