kalerkantho


৬২ বছর পর ছাত্রত্ব ফেরত পেয়ে গর্বিত

আজিম উদ্দিন

মিজানুর রহমান নান্নু, নেত্রকোনা   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



৬২ বছর পর ছাত্রত্ব ফেরত পেয়ে গর্বিত

‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে পড়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি প্রান্তরে। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভাষার দাবিতে ছাত্রদের বের করা মিছিলের ওপর গুলি চালালে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। নেত্রকোনায় আমিও সেই আন্দোলনে শরিক হই। তখন আমি নেত্রকোনার আঞ্জুমান স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। সে বছর ডিসেম্বরে বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোনা মহকুমা আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে তত্কালীন মুসলিম লীগ সরকারকে বিদ্রূপ করে স্বরচিত ব্যঙ্গাত্মক কবিতা আবৃত্তির জন্য আমাকে স্কুল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়। তারপর আর পড়ালেখা হয়নি। তবে সেই ছাত্রত্ব ফিরে পেয়েছি ৬২ বছর পর, ২০১৪ সালে; তত দিনে বয়স হয়ে গেছে ৮১। ’

ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলাপ উঠতেই কথাগুলো বললেন আজিম উদ্দিন। তাঁর বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া গ্রামে। জানালেন, তাঁর বাবা প্রয়াত শেখ শমসের আলী ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। বাবার মৃত্যুর পর লেখাপড়ার জন্য নেত্রকোনা শহরের ইসলামপুরে মামার বাড়িতে চলে যান।

১৯৫০ সালে শহরের আঞ্জুমান স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। বায়ান্নতে ছিলেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সে সময় নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের সদস্য হন। তখন মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন প্রয়াত এমএলএ আব্দুল খালেক তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাবেক এমপি প্রয়াত ফজলুর রহমান খান।

আজিম উদ্দিন বলেন, “ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরই আমি প্রগতিশীল সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শুরু করি। স্কুলের মিটিং-মিছিলেও নেতৃত্ব দিয়েছি। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টি, ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে সংগ্রাম কমিটি গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছি। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে আমার লেখা বিভিন্ন কবিতা তখনকার পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হতে থাকে। ১৯৫১ ও ’৫২ সালে আমার লেখা ‘পকেট ভারী’ ও ‘ঘুষের থলি’ শিরোনামে দুটি কবিতা স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলোও ছিল তত্কালীন সরকারকে বিদ্রূপ করে লেখা। ১৯৫২ সালে স্বরচিত ‘আজব ভুঁড়ি’ কবিতা পাঠের কয়েক দিন পরেই কারণ দর্শাও নোটিশ পাই। কেন সরকারকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে কবিতা লিখেছি এবং আবৃত্তি করেছি—তত্কালীন মুসলিম লীগ সরকার আমার কাছে কৈফিয়ত তলব করে। আমি জবাবও দিয়েছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব সন্তোষজনক মনে হয়নি। পর পর তিনবার আমাকে নোটিশ দেওয়া হয়। আমিও একই জবাব দিয়ে গেছি। শেষে ১৯৫৩ সালে স্কুল থেকে আমাকে রাস্টিকেট (বহিষ্কার) করা হয়। এরপর আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ভাষার দাবিতে বায়ান্নতে ছড়িয়ে পড়া দাবানল পরে দেশজুড়ে আরো বেগবান হলো। শেষে ১৯৫৪ সালে তো সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতও দিল। কিন্তু ছাত্রত্ব আর ফিরে পাইনি। ”

এই ভাষাসংগ্রামী জানান, ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর বর্তমান নেত্রকোনা আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ড. তরুণ কান্তি শিকদার আমাকে বিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেন। তত দিনে পেরিয়ে গেছে ৬২ বছর। আমার বয়স হয়ে গেছে ৮১। তবে প্রতীকী অর্থে হলেও এমন সম্মান পাওয়ায় গর্বিত বোধ করেছি। ওই অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলকসহ বিশিষ্টজনরা।   

এখন বয়স চলছে ৮৩। বয়সের ভারে কাবু হয়ে গেছেন। নিজের তেমন সঞ্চয়ও নেই। সন্তানরাই দেখাশোনা করে। আজিম উদ্দিন বলেন, ‘আগে থেকেই রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তাই করেছি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পেশা আর বেছে নেওয়া হয়নি। এভাবে পুরো জীবনটাই পার করে দিলাম। তবে একটা আকাঙ্ক্ষা আছে। একুশে পদকের জন্য আবেদন করেছি। সরকারের কাছে আমার আবেদন, যেন মৃত্যুর আগে এ সম্মান নিয়ে যেতে পারি। ’


মন্তব্য