kalerkantho


ক্ষতিগ্রস্তরা বললেন

মিথ্যাচার যারা করেছে তাদের আজ কী জবাব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মিথ্যাচার যারা করেছে তাদের আজ কী জবাব

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠায় ২০১১ সালে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। এরপর একাধিকবার তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

অবশেষে তাঁর দাবিই সত্য হলো। কানাডার আদালতও এ প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পায়নি। রায় শোনার পর গতকাল শনিবার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছেন, ‘আমার সততা উচ্চকিত হয়েছে। সরকার, পদ্মা সেতু ও আমার বিরুদ্ধে যারা মিথ্যাচার করেছে, আজ তাদের জবাব কী?’

একই অভিযোগের কারণে তত্কালীন সেতুসচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞাকে কারাবাস করতে হয়েছে। রায় শোনার পর তিনি বলেছেন, ‘এ অভিযোগের কারণে আমাকে কারাবাস করতে হয়েছে। আমার মানহানি হয়েছে। তবে এ জন্য মামলা করব না। পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হলে তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাব, সেদিনই আমার চূড়ান্ত বিজয় হবে। এ বিজয় সততার।

’ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বর্তমানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব।

আর দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এক মাসেরও বেশি সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে সেতু বিভাগের তত্কালীন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ ফেরদৌসকে। রায়ের পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, কী হবে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে? যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করবে কে? তিনি বর্তমানে ঢাকা উড়াল সড়ক প্রকল্পের পরিচালক পদে কাজ করছেন।

‘আমার সততা উচ্চকিত হলো’ : সৈয়দ আবুল হোসেন প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘আমার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সাকো-কে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে জড়ানো হয়েছিল। পরামর্শক নিয়োগে ৩৭ মিলিয়ন ডলার দর প্রস্তাবের ৩৫ মিলিয়ন ডলার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে, টক শোতে এ নিয়ে বিশিষ্টজনরা রাতের ঘুম হারাম করে আলোচনায় অংশ নেন, অথচ তা ছিল মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক। বাংলাদেশে এসে বিশ্বব্যাংকের আইন উপদেষ্টা ওকাম্পো যে আইনবিরোধী লম্ফঝম্প দেখালেন; সরকার, পদ্মা সেতু ও আমার বিরুদ্ধে যে মিথ্যাচার করলেন, তা ষড়যন্ত্রের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। ’

সাবেক এই যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘মিথ্যা অভিযোগে আমাকে, আমার পরিবারকে হেনস্তা হতে হয়েছে। সরকারের সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বিনা দোষে জেল খাটতে হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের স্বার্থে আমাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে। আমাকে জনগণের কাছে ছোট হতে হয়েছে। কানাডায় আমার জামাতার ব্যাংক হিসাব চেক করা হয়েছে। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনসহ আমার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তদন্ত করা হয়েছে। যেসব মিডিয়ার মিথ্যা রিপোর্ট, অতিশয় বাড়াবাড়ি লেখা, কার্টুন প্রকাশ, সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লেখায় প্রভাবিত হয়ে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আমাকে অভিযুক্ত করা হলো, আমার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলো—তাদের আজকের জবাব কী? আমার পদত্যাগের পরও পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন না করা প্রমাণ করে যে বিশ্বব্যাংক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কাজ করেছে। ’

সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘কতিপয় পত্রিকা শুধু পদ্মা সেতু নিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট করেই ক্ষান্ত দেয়নি। আমার মন্ত্রিত্বকালীন কাজ নিয়ে, সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে, আমার ব্যক্তিগত পাসপোর্ট নিয়ে, আমার গ্রামের বাড়ি নির্মাণ নিয়ে, যোগাযোগমন্ত্রীর গাড়ি ক্রয় নিয়ে, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক নির্মাণের সারসংক্ষেপ নিয়ে, বিএনপির শ্বেতপত্রের অভিযোগের মিথ্যা প্রমাণিত বিষয় নিয়ে এবং আওয়ামী লীগ থেকে আমি পদত্যাগ করেছি—এই মর্মে আমার স্বাক্ষর জাল করে একটি চিঠি পত্রিকায় প্রকাশ করে, সবই ছিল উদ্দেশ্যমূলক। আমি জীবনে সৎ থেকে, ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করেছি, জনগণের জন্য ব্যয় করেছি। আমার আফসোস—মিথ্যা অভিযোগে পদ্মা সেতু চালু করার প্রক্রিয়া দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বিলম্বিত হলো। আমি তখন বলেছিলাম, পদ্মা সেতুর অভিযোগে আমি অভিযুক্ত নই, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আজ কানাডার আদালতের মাধ্যমে আমার সততা উচ্চকিত হলো। আমি নির্দোষ প্রমাণিত হলাম। ’

গতকালই চীনে গেছেন সৈয়দ আবুল হোসেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর দেশে ফেরার কথা।

এ বিজয় সততার : সাবেক সেতুসচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘বিদেশের আদালতে যে রায় আমরা পেয়েছি তাতে আমি, আমার আরো দুই কর্মকর্তা, সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দায়মুক্ত হলাম। এর সঙ্গে প্রমাণিত হলো, পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি। এ বিজয় সততার। এ বিজয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ’

বর্তমানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন অভিযোগ তুলে সামাজিকভাবে-পারিবারিকভাবে আমাকে হেয় করার চেষ্টা ছিল। আমাকে কারাগারেও থাকতে হয়। বিশ্বব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতু নিয়ে সংশয়ে পড়ে যায়। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সব ষড়যন্ত্র কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। আদালতের রায়ে সরকার আরো দায়মুক্ত হলো। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে যে কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েছে, তা লজ্জার। দুর্নীতি দমন কমিশন পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে আমি জড়িত কি না তা যাচাইয়ে বিভিন্ন কৌশলে তদন্ত করেছে। একসময় তারাও স্বীকার করেছে যে আমি জড়িত নই। বিদেশি আদালতেও স্বীকার করা হয়েছে আমি দুর্নীতিতে জড়িত নই। আমাকে কারাবাসও করতে হয়। আমার দেশপ্রেমের এই পুরস্কার? অনেক সময় ভেবেছি, সত্যের কাছে তবে কি হেরে গেলাম? তবে সময় লাগলেও শেষ পর্যন্ত আমরা জিতেছি। ’

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিদেশি আদালতে কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। শুধু কতগুলো সংবাদমাধ্যমের কাটিং দেওয়া হয়েছে। আরো যেসব তথ্য-প্রমাণ দেওয়া হয়েছে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কে বা কারা পদ্মা সেতু নির্মাণ করবে, তা নির্বাচনে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে দিই, এটাই ছিল আমার অপরাধ। ’

সেতু বিভাগের সাবেক এই সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, মনে করেন এটি আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে। পদ্মা সেতু আমরা নির্মাণ করবই। ’ তিনি বলেন, ‘যারা আমার মানহানি করেছে তাদের বিরুদ্ধে আমি মামলা করব না। কারণ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে আজ পরিষ্কার, পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি। এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে। যেদিন পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে সেদিন এ সেতুর ওপর দিয়ে রাতের আঁধারে একা একা হাঁটব। সেতু স্পর্শ করে দেখব। কত রাত জেগেছি, কত পরিশ্রম করেছি, সব মনে পড়বে। আজকে একটি অধ্যায়ের বিজয় হলো। আরেকটি বিজয় হবে সেতু নির্মাণ শেষ হওয়ার পর। ’

আজ সত্য পরিষ্কার হয়েছে : সেতু বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ ফেরদৌস রায়ের পর বলেছেন, ‘আজ সত্য পরিষ্কার হয়েছে। এক মাস ১০ দিন জেল খাটতে হয়েছে। টিভিতে টক শোতে নানা কথা শুনতে হয়েছে। তবে আমার ক্ষত শুকিয়ে গেছে। অভিযোগ করব কার কাছে? আমি পরামর্শক নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব ছিলাম। সে সময় আমার সঙ্গে কোনো সাংবাদিক কথা না বলেই নানা কথা লিখেছেন। আমার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করবে কে?’


মন্তব্য