kalerkantho


সুপ্রিম কোর্ট চত্বরের ভাস্কর্য

জাস্টিশিয়া ন্যায়বিচারের প্রতীক না বুঝেই অপসারণ দাবি

আশরাফ-উল-আলম   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জাস্টিশিয়া ন্যায়বিচারের প্রতীক না বুঝেই অপসারণ দাবি

সুপ্রিম কোর্টের সামনে ভাস্কর্য জাস্টিশিয়া, যা ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। ছবি : কালের কণ্ঠ

জাস্টিশিয়া। রোমান শব্দ। যার অর্থ বিচারক এবং তিনি একজন নারী। পৃথিবীর অনেক দেশের সর্বোচ্চ আদালতে জাস্টিশিয়ার ভাস্কর্য রয়েছে। একে ন্যায়বিচারের প্রতীক বিবেচনা করা হয়। আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখতে সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশের আদালতগুলোর সৌন্দর্য বাড়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের সামনে সম্প্রতি স্থাপন করা হয়েছে জাস্টিশিয়ার দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যটি। কিন্তু কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠন একে ‘গ্রিক দেবীর  মূর্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে অপসারণের দাবি জানাচ্ছে।

এই দলে আছে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন প্রমুখ। গত শুক্রবার বিক্ষোভেরও চেষ্টা হয়েছে। সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।

আবার ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে বলে কর্মসূচি দিয়েছে একটি দল।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, মূর্তি ও ভাস্কর্যের পার্থক্য না বুঝেই কেউ কেউ সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত জাস্টিশিয়া অপসারণের দাবি তুলছে। মূলত এই ভাস্কর্যটি ন্যায়বিচারের প্রতীক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভাস্কর্য একটি শিল্প। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সংঘাত নেই। ইসলাম ধর্মে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে সেটি তো কোনো মূর্তি নয়। আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, সুপ্রিম কোর্ট সব ধর্মের মানুষের জায়গা। তা ছাড়া আমাদের রাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছে। এখানে কোথায় কী হবে তা নির্ধারণ করবে মুক্তিযোদ্ধারা। কোনো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কথায় কর্ণপাত করার কিছু নেই। ’ তবে তিনি বলেন, যেখানেই যে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হোক না কেন তা যেন উন্নতমানের ও শিল্পসম্মত হয়। যে ভাস্কর্য নিয়ে কথা উঠেছে তা মানসম্মত হয়নি। এর জন্য একটি জাতীয় পরামর্শ কমিটি করা যেতে পারে।

ইউনাইটেড ইসলামিক পার্টির চেয়ারম্যান মাওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট চত্বরের ভাস্কর্যটি রাষ্ট্রীয় ও সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে স্থাপন করা হয়েছে। এই ভাস্কর্য পূজা অর্চনার জন্য নয়। কাজেই এটি মূর্তি নয়। এ নিয়ে আন্দোলনের উদ্দেশ্য দেশে অশান্তি সৃষ্টি করা।

ইরান গভীর ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন একটি মুসলিম রাষ্ট্র। সে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ‘তেহরান কোর্ট হাউস’-এর সামনেও জাস্টিশিয়ার ভাস্কর্য রয়েছে। ইরানে ইসলামী শরিয়াহ আইন প্রচলিত। এমন একটি দেশের আদালত চত্বরে একই ভাস্কর্য স্থান পাওয়ায় ইরানিদের ধর্মীয় অনুভূতিতে কোনো আঘাত লাগেনি। ইরানিরা এই ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে কখনো আন্দোলন করেনি, বিক্ষোভ দেখায়নি। অথচ ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে জাস্টিশিয়া ভাস্কর্য ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রচার চালাচ্ছে কয়েকটি সংগঠন।

জাস্টিশিয়া কোনো দেবী নন। বরং জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে ন্যায়বিচার তথা বিচারসংশ্লিষ্ট মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বে স্বীকৃত। ইরান ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, হংকং, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, হাঙ্গেরিসহ অনেক দেশেই এ ভাস্কর্য আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে একাধিক ভাস্কর্য। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের সামনে ওয়াটার লিলি ফোয়ারা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরে জাগ্রত চৌরঙ্গী, বাংলা একাডেমি চত্বর, বাংলামোটর, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মাসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে স্থাপিত জাস্টিশিয়াও তেমনই একটি শিল্পকর্ম। একে মূর্তি হিসেবে চিহ্নিত করা বিভ্রান্তিমূলক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ভাস্কর্য মূলত নান্দনিকতা ও সৌন্দর্যতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।

একেক দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিবেচনায় জাস্টিশিয়ার অবয়ব ও পোশাক একেক রকম। বাংলাদেশের জাস্টিশিয়ার পরনে আছে শাড়ি। তার ডান হাতে রয়েছে একটি খোলা তলোয়ার, যা কর্তৃত্ব, শক্তি ও সামর্থ্যের প্রকাশ। এ তলোয়ার আদালতের রায় বাস্তবায়ন ও আইনের আশ্রয় লাভের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। বিশিষ্ট লেখক হ্যাকেল, ফারম্যানের লেখায় ও ল জার্নালে এর উল্লেখ আছে। ভাস্কর্যের বাঁ হাতে আছে একটি দাঁড়িপাল্লা, যা ন্যায় ও পক্ষপাতহীনতার প্রতীক। আইনবিষয়ক ইয়েল জার্নালের মতে, এটি মামলার কোনো পক্ষের প্রতি রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে নিরপেক্ষভাবে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য বিবেচনার প্রতীক হিসেবেও পরিচিত।

আইনবিদ টেইলর ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মতে, জাস্টিশিয়ার চোখ কাপড়ে বাঁধা, যা বস্তুনিষ্ঠতার প্রকাশ। এটি আরো প্রকাশ করে যে আদালতের একমাত্র লক্ষ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্যে আদালত সর্বক্ষেত্রে ও সর্বাবস্থায় ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকেন। আদালত ধর্ম-বর্ণ, সামাজিক অবস্থান, প্রভাব-প্রতিপত্তি বিবেচনায় বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না।


মন্তব্য