kalerkantho


পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ গালগল্প

কানাডার আদালতের রায়ে বাংলাদেশের কলঙ্কমুক্তি

পার্থ সারথি দাস ও মেহেদী হাসান   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ গালগল্প

ঘুষ-দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের কপালে কলঙ্ক লাগিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করেছিল বিশ্বব্যাংক সেই অভিযোগ কেবলই গালগল্প। ওই অভিযোগ উত্থাপনের ছয় বছরের মাথায় অবশেষে কানাডার এক আদালত থেকে এমন রায়ই এসেছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ পেতে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ঘুষ সাধার অভিযোগ থেকে কানাডার মন্ট্রিয়লভিত্তিক প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের (আরসিএমপি) দায়ের করা মামলায় গত শুক্রবার অন্টারিওর একটি আদালত রায় দিয়েছেন। গত শুক্রবার কানাডার দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদন মতে, এসএনসি-লাভালিন গ্রুপ ইনকরপোরেশনকে ঘিরে কথিত একটি বিদেশি বড় দুর্নীতির মামলায় প্রতিষ্ঠানটির সাবেক তিন নির্বাহীকে খালাস দিয়েছেন অন্টারিওর আদালত। ওই মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ফোনে আড়ি পেতে পাওয়া কথিত দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণকে বিচারক ‘গুজব’ ও ‘রটনা’ হিসেবে অভিহিত করে উড়িয়ে দিয়েছেন।

দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের ওই অভিযোগের মুখে বাংলাদেশে এক মন্ত্রীকে তখন পদ হারাতে হয়েছিল। হাজতবাস করতে হয়েছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সেতু বিভাগের কর্মকর্তাদের। জেল খাটিয়ে, তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়েছিল। অথচ কানাডার মতো একটি দেশের আদালতের রায়ে এখন বলা হচ্ছে যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের তোলা ঘুষ লেনদেনের যড়যন্ত্রের অভিযোগ শুধুই গালগল্প। এর আগে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) দুই দফা অনুসন্ধান করে ওই অভিযোগের সত্যতা পায়নি।

আইনজ্ঞরা বলছেন, কানাডার আদালতের রায়ের পর বাংলাদেশ সরকার কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা চাইলে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারেন।

২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির যড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছিল। অভিযোগে বলা হয়েছিল, তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা এবং পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এসএনসি-লাভালিনের কাছে ১০ শতাংশ অর্থ কমিশন চেয়েছিলেন। প্রকল্পে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ছিল চার কোটি ৭০ লাখ ডলার।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের দরপত্রে প্রাক্-যোগ্যতার ক্ষেত্রে অংশ নিয়েছিল ১১ প্রতিষ্ঠান। ২০১০ সালের ২০ জুলাই প্রাক্-যোগ্য বিবেচনায় পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তালিকা বিশ্বব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছিল সেতু বিভাগ। অনুমোদন না দিয়ে বিশ্বব্যাংক তিন মাস পর আবার প্রাক্-যোগ্যতা যাচাইয়ের পরামর্শ দেয়। দ্বিতীয় দফা প্রাক-যোগ্যতার জন্য আবেদন আহ্বান করা দরপত্রে অংশ নেয় ১০টি প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় দফায়ও প্রথমবারে মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ করা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই যোগ্য বিবেচিত হয়। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ওই তালিকা বিশ্বব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক একই বছরের ২৯ মার্চ বিশেষজ্ঞদের যাচাই-বাছাইয়ে অযোগ্য বিবেচিত চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কম্পানি-সিআরসিসিকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করার সুপারিশ করে। কাগজপত্র পুনঃপরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করা যায় না উল্লেখ করে ২০১১ সালের ৩০ মার্চ প্রতিবেদন দাখিল করে সেতু বিভাগ। ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বিশ্বব্যাংক মনোনীত প্রতিষ্ঠানের রেকিং পাইলের অভিজ্ঞতার প্রমাণপত্র পর্যালোচনায় দেখতে পায়, অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ করা সেতুর ছবি পরিবর্তন করে সিআরসিসি নিজের নামে জমা দিয়েছে। ২০১১ সালের ৭ মে ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, সিআরসিসি মিথ্যা তথ্য দাখিল করেছে। এ অবস্থায় ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের ইকোনমিক কাউন্সেলরকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অফিসে ডেকে নিয়ে সিআরসিসির চিঠি দেখানো হলে তিনি জানান, চিঠিতে উল্লিখিত স্বাক্ষর চীনা ভাষায় নকল করা।

সূত্র মতে, ২০১১ সালের ৯ মে সিআরসিসি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে মূল সেতুর প্রস্তাব প্রত্যাহার করে। তারা তাদের স্থানীয় এজেন্ট ভেঞ্চার ইন্টারন্যাশনালের এজেন্সিশিপও বাতিল করে। সেতু বিভাগ বুঝতে পারে সিআরসিসির পক্ষে স্থানীয় এজেন্ট ভেঞ্চার ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন ভুল তথ্য ও জাল প্রমাণপত্র দিয়েছে। আর এই ভুল তথ্যদানকারী এজেন্টের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। সেতু বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা এবং কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ওই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তদবির করে ব্যর্থ হয়ে বিশ্বব্যাংক কথিত অভিযোগ উত্থাপন করেছিল।

কানাডার আদালতের রায়ের সংবাদ শোনার পর ওই অভিযোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে গতকাল শনিবার তাঁরা বলেন, সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কী হবে? সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন তাঁর প্রতিক্রিয়ায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কানাডার আদালতের এই রায় প্রমাণ করে, পদ্মা সেতু নিয়ে আমাকে জড়িয়ে বিশ্বব্যাংক যে অভিযোগ করেছে তা সর্বৈব মিথ্যা। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের তত্কালীন প্রতিনিধি গোল্ড স্টেইন এবং এ দেশের কতিপয় পত্রিকার অসত্য রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংক যে কাল্পনিক অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করেছিল তা ছিল শুধু মিথ্যা নয়, ষড়যন্ত্রমূলক। আমি বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশি কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের শিকার। এ ষড়যন্ত্র আমার দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম, মর্যাদা নষ্ট করে দিয়েছে। সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পথকেও বাধাগ্রস্ত করেছে। আমাকে সমাজে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। ’ সৈয়দ আবুল হোসেন আরো বলেন, “বিশ্বব্যাংকের তত্কালীন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চীনে এক আন্তর্জাতিক ফোরামে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি—পদ্মা সেতু ও আপনি ষড়যন্ত্রের শিকার। বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বিশিষ্ট কতিপয় লোকের কথায় প্রভাবিত হয়েছেন। এ জন্য আমি অনুতপ্ত। ’”

অভিযোগ ছিল কথিত ঘুষ লেনদেনে মুরব্বি হিসেবে কাজ করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ছেলে আবুল হাসান চৌধুরী গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বিশেষ মন্তব্য করতে চাই না। আমার সম্পৃক্ততার বিষয়টি বহু আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। কানাডার আদালতে আমার উপস্থিতির দরকারই হয়নি। তবে আজ পরিষ্কার হয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগটি ছিল ভিত্তিহীন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কথাই সত্য প্রমাণিত হলো। ’

মামলায় আসামি হয়ে এক মাস ১০ দিন কারাগারে ছিলেন সেতু বিভাগের তখনকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌস। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে চাই না। আমি কি ক্ষতিপূরণ পাব?’

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রধান বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ওই সময় মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ছিলাম। আমরা যে কোনো ভুল করিনি তা আবার প্রমাণ হলো। বেনামি ই-মেইলের সূত্র ধরে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ছিল ভিত্তিহীন। কানাডার আদালতের রায় শুনে তাই ভালো লাগছে। ’

২০১১ সালে প্রকল্পে ঋণ সহায়তা হিসেবে ঋণচুক্তির ছয় মাসের ব্যবধানে অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি স্থগিত করেছিল। ২০১২ সালের জুনে ওই ঋণচুক্তি বাতিল করে। পরে প্রকল্প থেকে একে একে সরে দাঁড়িয়েছিল এডিবি, জাইকা, আইডিবি। দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ঘুষ লেনদেনের ওই অভিযোগের পর একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণ করার উদ্যোগ নেন। তাঁরই দৃঢ় মনোবলের কারণে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মূল সেতুর পাইলিং ও নদীশাসনের কাজ উদ্বোধন করেন। দেখতে দেখতে মাওয়া ও জাজিরায় পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়েছে ৪০ শতাংশ। এ অবস্থায় কানাডার আদালত থেকে রায়ের মধ্য দিয়ে শতভাগ কলঙ্কমুক্তি ঘটল বাংলাদেশের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ তোলায় প্রকল্পের কাজ কমপক্ষে তিন বছর পিছিয়েছে। তাতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। এ জন্য আর্থিক ক্ষতি এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্রিমিনাল মামলার শতভাগ অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয় না। এ ক্ষেত্রে সবাই তো আর ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের মামলা করার ঘটনা খুব একটা শোনা যায় না।

দুদকের সাবেক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপপু কালের কণ্ঠকে বলেন, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি এখানে শতভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূলত কারা কেন ওই অভিযোগ তুলেছিল, সে বিষয়ে তদন্ত হওয়া দরকার।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প দ্রুত শুরু করার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকসহ চারটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা অর্থায়নে সহযোগিতার জন্য ঋণচুক্তি করেছিল সরকারের সঙ্গে। তাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চুক্তি করে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল। চুক্তির প্রায় ছয় মাসের ব্যবধানে বিশ্বব্যাংক চুক্তি স্থগিত করে দেয়। কারণ বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ গিয়েছিল ই-মেইলযোগে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে হইচই শুরু হয়। সমালোচনার মুখে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পদ থেকে সরানো হয় যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতুসচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা এবং সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌসকে। এঁদের মধ্যে মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা, কাজী ফেরদৌসকে গ্রেপ্তার এবং সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল। মোশাররাফ, কাজী ফেরদৌস এবং এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তাসহ সাতজনকে অভিযুক্ত করে ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বনানী থানায় মামলা করে দুদক। প্রধান আসামি করা হয় সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মো. মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞাকে। অন্য আসামিরা হলেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড প্ল্যানিং কনসালট্যান্ট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশে কানাডীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ মোস্তফা, এসএনসি-লাভালিনের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল, আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস।

ওই ঘটনায় তদন্তে নেমেছিল দুদকও। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জবানবন্দি নেওয়া এবং যাচাই-বাছাই করে তদন্ত শেষ করে দুদক। ২০১৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুদক মামলার সাত আসামির সবাইকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে উপস্থাপনের জন্য চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুমোদন করে। তদন্ত শেষে দুদক জানায়, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

গুজব ও অনুমানের পক্ষে কোনো তথ্য-উপাত্ত ছিল না : কানাডার অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্টের বিচারক ইয়ান নর্ডহেইমার তাঁর রায়ে বলেন, ২০১১ সালে আরসিএমপি ফোনে আড়ি পাতার জন্য আদালতের অনুমোদন পেতে যে তিনটি আবেদন করেছিল তা নিয়েই তাঁঁর প্রবল আপত্তি ছিল। আরসিএমপির আবেদনে অনুমান, গুজব ও রটনার বাইরে কিছুই ছিল না। তদন্ত করার মতো এবং গুজব ও অনুমানের পক্ষে কোনো তথ্য-উপাত্তও ছিল না।

বিচারক ইয়ান নর্ডহেইমার বলেন, আড়ি পাতার জন্য আবেদনের অনেক তথ্য এসেছিল বিশ্বাসযোগ্য নয় বা অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তির কাছ থেকে ইমেইলের মাধ্যমে। তিনি বলেন, তথ্যদাতারা কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ করলেও পুলিশ তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেনি। তাদের সঙ্গে পুলিশের কথা বলা উচিত ছিল। আরসিএমপি দাবি করেছিল, কিছু ব্যক্তি ঘুষের বিষয়ে পরিকল্পনা করার জন্য দুবাই গিয়ে একটি বৈঠকে অংশ নিয়ে থাকতে পারেন। বিচারক এ বিষয়টির সমালোচনা করেছেন। কারণ আড়ি পাতার অনুমতির জন্য আবেদনে ওই তিন ব্যক্তির ভ্রমণ ইতিহাস উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁরা তিনজনই ২০১১ সালের মার্চ মাসে কানাডার বাইরে গিয়েছিলেন বলে সেখানে তথ্য রয়েছে। বিচারক বলেন, ওই ব্যক্তিরা কোথায় গিয়েছিলেন সে ব্যাপারে আরসিএমপির আবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। কেভিন ওয়ালেস দুবাইয়ে কখনো যাননি—এ বিষয়টি জানা সত্ত্বেও আরসিএমপি তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় আবেদনে এটি উল্লেখ করেনি এবং প্রথম আবেদন সংশোধনও করেনি।  

কানাডার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, আরসিএমপি শুরুতে পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিল। তবে মোহাম্মদ ইসমাইল ও আবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পরে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। অন্য তিনজন এসএনসি-লাভালিনের জ্বালানি ও অবকাঠামো শাখার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ এবং বাংলাদেশি-কানাডিয়ান ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী ভুঁইয়া রায়ে খালাস পেলেন।

শতভাগ স্বচ্ছতা আছে প্রকল্পে : যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরানোর পর একই দায়িত্ব নিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। গতকাল বিকেলে কক্সবাজার স্টেডিয়ামে জনসভায় তিনি বলেছেন, শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গেই তা শেষ হবে।

প্রধানমন্ত্রীপুত্র জয় বললেন, তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত : পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ তোলার পর বাংলাদেশের যারা দুর্নীতির কথা বলে গলা চড়িয়েছিল, তাদের এখন সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। বড় এ প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ কানাডার আদালতে নাকচ হয়ে যাওয়ার পর ফেসবুকে লেখা প্রতিক্রিয়ায় এই মত প্রকাশ করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা জয় লিখেছেন, ‘এই মিথ্যা তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংক। পুরো উপাখ্যান চলাকালে আমি তাদের এসব প্রমাণাদি দেখেছি। এতে সুনির্দিষ্ট বিস্তারিত কিছু নেই, যা সুস্পষ্টভাবেই বানানো। রয়েছে কেবল একটি বেনামি সূত্র, যা এমনকি কানাডার আদালতের কাছেও প্রকাশ করা হয়নি। সুতরাং তারা অভিযোগ দায়ের করেছে, কিন্তু দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে অস্বীকার করেছে। আমার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সুনামহানি করতে বিশ্বব্যাংক এই ষড়যন্ত্র করেছে। ’

আইনমন্ত্রী মো. আনিসুল হক আজ রবিবার এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেবেন।  

অভিযোগ খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিল বিশ্বব্যাংক : বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মেহরীন মাহবুব গতরাতে কালের কণ্ঠকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমরা (ঢাকা কার্যালয়) মামলার বাদী ছিলাম না। অভিযোগকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। আমাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর কিমিয়াও ফান এর বক্তব্য হলো এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের তদন্তকাজও শেষ হয়েছে। কোন দেশের মামলার প্রক্রিয়া কেমন হবে তা সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তাব্যক্তিরাই বলতে পারেন। ’

অর্থায়ন আটকে রেখেছিলেন ইউনূস : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে আসছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ তোলা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ। এতে বাংলাদেশিরাও জড়িত ছিল।


মন্তব্য