kalerkantho


প্রধান বিচারপতি বললেন

প্রতিটি আইন ত্রুটিপূর্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রতিটি আইন ত্রুটিপূর্ণ

ফাইল ছবি

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘বিচার বিভাগকে বিচার বিভাগের মতো কাজ করতে দিলে আদালতগুলোয় হাজার হাজার মামলার জট থাকত না। ’ মামলার বাড়তি চাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি আইন ত্রুটিপূর্ণ। এই ত্রুটিপূর্ণ আইন হওয়ায় মামলা বেড়ে যাচ্ছে। ’

মৌলভীবাজার আইনজীবী সমিতি আয়োজিত বার্ষিক নৈশভোজ সভায় গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, দেশের ক্রান্তিকালে বিচার বিভাগই দেশকে রক্ষা করে। সংবিধান রক্ষা করে। তাই আইনের সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁরা যদি সামান্য বিচ্যুত হন, তা হলে সেই দেশের ভবিষ্যত্ অন্ধকার।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরেল আহমদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসিন, হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার সৈয়দ দিলজার আহমদ, মৌলভীবাজার জেলা ও দায়রা জজ শফিকুল ইসলাম, সিলেট জেলা ও দায়রা জজ মনির আহমদ পাটোয়ারী, সিলেট মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধা, মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম এ কিউ এম নাসির উদ্দিন, জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহজালাল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও আইনজীবী এবায়দুর রহমান, আইনজীবী শান্তিপদ ঘোষ, আইনজীবী মুজিবুর রহমান মুজিব প্রমুখ।

সাম্প্রতিক সময়ে নিজের বিভিন্ন বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি একটিও কথা বলতে চাই না। কিন্তু বিচার করতে গেলেই আমরা খেই হারিয়ে ফেলি।

কোনো আইন আমরা ঠিকমতো পাচ্ছি না। প্রতিটি আইন ত্রুটিপূর্ণ। ’

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, আইন প্রণেতারা ঠিকমতো তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আইনের ত্রুটির কারণে গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হাজার হাজার রিট হয়েছে। আইন প্রণেতারা যদি দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করতেন তবে বিচার বিভাগের ওপর এই দায়িত্ব আসত না। ’

প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের যে দায়িত্ব-কর্তব্য তাতে হস্তক্ষেপ না করা হলে বিচার বিভাগকে বিচার বিভাগের মতো কাজ করতে দিলে আজ এই হাজার হাজার মামলার জট থাকত না।

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, দেশ গঠনে আইনজীবীদের মেধা, প্রজ্ঞার অবদান এটি কোনো মতেই অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি  বলেন, ‘আমেরিকার প্রথম কংগ্রেসে চার ভাগের তিন ভাগের ছিল আইন ব্যাকগ্রাউন্ড। আমাদের দেশের সংবিধানকে বলা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংবিধান। এই সংবিধান রচনায় ছিলেন বিশিষ্ট কয়েকজন আইনজীবী। আজ আমাদের দেশে সংসদে খুব কমসংখ্যক আইনজীবী আছেন। ’ দেশ গড়তে হলে প্রত্যেকের আইন নিয়ে পড়াশোনা ও জানাশোনা থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এটি ভারত, চীন উপলব্ধি করছে। চীনের টাকা আছে। চীন ভাবছে তাদের আইনের শাসন যদি গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে আমেরিকার পর্যায়ে যেতে পারবে না। তাই তারা আইনের শাসনের প্রতি মনোযোগী হচ্ছে। তারা আমেরিকা, ভারত থেকে সহযোগিতা নিচ্ছে। ’

প্রধান বিচারপতি বলেন, সারা পৃথিবীতেই বিচার বিভাগকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। দেশের আইন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে বিচার বিভাগ ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। দেশের ক্রান্তিকালে বিচার বিভাগই দেশকে রক্ষা করে। যে দেশে আইনের শাসন আছে, সে দেশে জ্ঞানের মাত্রা আছে, সম্পদ আছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা আদালত আটকে দেওয়া প্রসঙ্গ তুলে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘পৃথিবী এখন এক অরাজকতার মধ্যে কাটাচ্ছে। ইমিগ্রেশনে (অভিবাসন) কী হচ্ছে? সবাই কিন্তু চেয়ে আছে আমেরিকার বিচার বিভাগের দিকে। বিচার বিভাগ কী রায় দিচ্ছে। তাই বিচার বিভাগকে অবহেলা করা নয়। বিচার বিভাগকে শ্রদ্ধা করতে হবে। ’

এক আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘বার কাউন্সিলের পরীক্ষার বিলম্বের কারণ বার কাউন্সিল তাঁদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছেন না। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারছেন না। এটি বিচারকদের দেখতে হচ্ছে। এটি বিচার বিভাগের ওপর বাড়তি চাপ। এই পরীক্ষা বিজ্ঞ আইনজীবীদের নেওয়ার কথা ছিল। ’ আইনজীবীরা যাতে তাঁদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেন সে জন্য আগামীবার কাউন্সিলে সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধান বিচারপতি জানান, কয়েকটি আদালত ডিজিলাইটেশন করায় বিচারকাজে সময় লাগছে কম। আগের চেয়ে এক-চতুর্থাংশ সময় লাগছে। তিনি বলেন, সারা দেশে এটি করা গেলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। তাই এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা দরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে আদালতের স্বল্পতা, বিচারক স্বল্পতা এবং অবকাঠামো সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


মন্তব্য