kalerkantho


ডা. আবদুল মানাফ

প্রথম শহীদ মিনার গড়তে মেয়ের গলার হার খুলে দেন মা

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রথম শহীদ মিনার গড়তে মেয়ের গলার হার খুলে দেন মা

‘বিকেল সাড়ে ৩টার মতো হবে, আমি তখন চার নম্বর ব্যারাকের সামনে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ শুলির শব্দ শুনি।

কে যেন বলে ওঠে, ফাঁকা আওয়াজ। কিন্তু ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্যারাকের দিকে তাকিয়ে শরীর অবশ হয়ে গেল। দেখি, লুটিয়ে পড়েছে কয়েকটি তরুণ; রক্তে ভেসে যাচ্ছে তাদের শরীর। ওরা জব্বার, রফিক উদ্দিন ও বরকত। সহপাঠী গোলাম মওলা (তৎকালীন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের সভাপতি) রক্তে ভেজা একটি শার্ট লাঠি দিয়ে উঁচুতে তুলে পতাকার মতো করে প্রতিটি ব্যারাকের বারান্দা দিয়ে ঘুরতে লাগল। অনেকেই বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি মিছিলে গুলি হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে মিছিলে গুলি হয়নি। ১৪৪ ধারা ভাঙতে চারজনের দল করে রাস্তায় বেরিয়েছি আমরা। প্রথমদিকে যারা ছিল, তাদেরই পুলিশ ধরে নিয়ে গাড়িতে তুলেছে। যখন তাদের আর গাড়ি ছিল না, তখন ছাত্রদের পিটিয়েছে। আমাদের গ্রুপটি ছিল মাঝামাঝি জায়গায়, সে কারণে মার খাইনি। তবে টিয়ার গ্যাসের শেল খেয়েছি। ’ কথাগুলো ভাষাসৈনিক ডা. আবদুল মানাফের। বায়ান্নতে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

এখন বয়সের ভারে কাবু হয়ে পড়েছেন। বেশ কয়েক বছর আগে স্বেচ্ছা অবসরে গেছেন। এখন সময় কাটে ঘরে বসেই। তবে চারপাশের খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করেন। নিজের ফেলে আসা সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। তবে অতীতের অনেক স্মৃতির আজ আর স্পষ্ট করে মনে নেই। তবে ২১ ফেব্রুয়ারির সেই উত্তাল ঘটনা স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বলে।

ডা. আবদুল মানাফ বলেন, ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মেডিক্যালের ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র আবুল হাশেমের নেতৃত্বে রাতারাতি শহীদ মিনার তৈরি হয়। ডিজাইন করেন একই শ্রেণির বদরুল আলম। একদিনে পুরোটা গাঁথলে ভেঙে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় মিনারের পুরোটা গাঁথা হয়নি। ওই মিনারের চারদিকে দড়ির ঘেরা দিয়ে একটি চাদর পেতে রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের জন্য মুক্তহস্তে দান করার আহ্বান জানানো হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই অনেক মানুষ আসে শহীদ মিনার দেখতে। এক মা তাঁর কন্যা সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন। সহায়তার আবেদনটি পড়ে তিনি মেয়ের গলার হারটি খুলে চাদরে রেখে দেন। পরে আট বছর হারটি সযত্নে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র সংসদে রাখা ছিল। সেটি ছিল মানুষের ভালোবাসার নিদর্শন, ভাষার প্রতি মমত্ববোধ; শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা।

এই ভাষা সংগ্রামী জানান, ১৯৪৮ সালের পর প্রতিবছর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালিত হতো। মাঝে বছর চারেক কিছুটা স্তিমিত ছিল। উর্দুই হবে পাস্তািনের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা—১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমউদ্দিনের এ বক্তৃতা যেন বারুদে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের পাশাপাশি মিছিল ও ছাত্র-জনতার মিলিত সমাবেশ হয়। ওই দিনই সিদ্ধান্ত হয়, ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পূর্ণ সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হবে। এর আগে ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালিত হবে। ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল সহজে হয়নি। বড় বড় রাস্তা ও বাজারে যথেষ্ট পুলিশ ছিল। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও হোস্টেল থেকে সলিমুল্লাহ হল পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। ১৪৪ ধারা জারি সত্ত্বেও স্কুল-কলেজ বর্জন করে ছাত্রছাত্রীরা কলাভবনে জড়ো হয়। গেটের বাইরে পুলিশ ট্রাক ও বাস নিয়ে প্রস্তুত ছিল। সমাবেশে প্রশ্ন ওঠে, ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন করা হবে কি না। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, চারজনের দল করে বেরোনো হবে। সেভাবেই দলে দলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। আর পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে গাড়িতে তোলে। পরে লাঠিচার্জ শুরু করে, টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। সবই হচ্ছিল ক্যাম্পাসের মধ্যেই। আমি ছিলাম ছাত্রদের জমায়েতের মাঝামাঝি জায়গায়। এ কারণে লাঠির পিটুনি খাইনি; তবে টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজ চোখে জ্বালা ধরিয়েছে। গুলির ঘটনা ঘটে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে।

ডা. মানাফ বলেন, “আমি তখন থাকতাম মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে। গজারির খুঁটি, বাঁশের বেড়া ও বাঁশের ছাউনিযুক্ত মেঝে। একেবারে ব্যারাকের মতো। আমিসহ আরো কয়েকজন বসে একটু দম নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। এমনি সময় গুলির ঘটনা আমাদের হকচকিত করে দেয়। এ সম্পর্কে আমি ‘বায়ান্নর একুশে আজও মনে পড়ে’ শীর্ষক লেখায় লিখেছি, ‘বন্ধ করা গেটের বাইরে থেকে ভেতরে খোঁয়াড়ে আটকে পড়ার মতো অবস্থায় বস্তুত ঘরের মধ্যের লোকদের গুলি করে মারা হয়েছে। ’ তখন মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের দুটো মাইক ছিল। গুলি চলার পর মাইকের একটা জগন্নাথ হলের দিকে মুখ করে, অন্যটা হাইকোর্টের দিকে মুখ করে অবিরাম এই হত্যাকাণ্ডের কথা প্রচার করা হয়, যাতে একুশের রাতেই আন্দোলনের কথা, হত্যাকাণ্ডের কথা দেশের সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। ছাত্রকর্মীরাও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা অমান্য করে সারা ঢাকা থেকে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হয়। অফিস-আদালত ও ইডেন বিল্ডিং থেকে লোকেরা বেরিয়ে আসে। গায়েবানা জানাজা শেষে শেরে বাংলার নেতৃত্বে নগরীতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল হয়। হাইকোর্টের সামনে মিছিলের ঠিক মাঝামাঝি লাঠিচার্জ করা হয়। লাঠিচার্জে মিছিল দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। আমি দ্বিতীয় ভাগে পড়ি। এরপর হোস্টেলে ফিরে আসি। ”

ডা. মানাফের মতে, ‘ভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকেই হয়েছিল স্বাধিকার ও স্বাধীনতার লড়াই। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার লড়াই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা ভাষা নিয়ে আরো চর্চা, গবেষণা হওয়া প্রয়োজন ছিল, কিন্তু হয়নি। বলা হলো, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চর্চার কথা। যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় ইংরেজিকে উপেক্ষা করা হলো। আর এখন ইংরেজিতে পিছিয়ে পড়ায় জাতি পিছিয়ে পড়েছে, এই ধুয়া তুলে মাতৃভাষাকেও এক প্রকারের উপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষার বিকাশ ও চর্চার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। ’

ডা. মানাফ জানান, মেডিক্যালের পাঠ শেষ করে তিনি খুলনায় এসে প্র্যাকটিস শুরু করেন। তাঁর জন্ম ১৯২৯ সালের ১ জুন। এখন খুলনার মুজগুন্নী আবাসিক এলাকার নিজ বাড়িতে সময় কাটে। জীবনে একটাই শখ ছিল, বই সংগ্রহ করা। সংগ্রহও করেছেন প্রচুর বই। সাড়ে সাত হাজার বই দিয়েছেন উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরিতে। স্ত্রী হাসনাহেনার সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে ছয় কন্যাসন্তানের গর্বিত বাবা তিনি। এক মেয়ে ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। মাঝেমধ্যে অন্য মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা এসে সারা বাড়ি মাতিয়ে তোলে। বয়সের কারণে অনেক স্মৃতিই আজ ঝাপসা। তবে ভাষা আন্দোলন ও একুশের কথা মনে হলে আজও এক বুক গর্ব নিয়ে ফিরে যান সেই উত্তাল দিনগুলোতে।


মন্তব্য