kalerkantho


শিশু আরমান হত্যাকাণ্ড

সাড়ে তিন বছর গেছে, বিচারই শুরু হয়নি

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সাড়ে তিন বছর গেছে, বিচারই শুরু হয়নি

‘ছোটবেলা থেকেই চট্টগ্রামে আছি। এখানেই আমার নিরপরাধ ছেলেটা সন্ত্রাসীদের গুলি খেয়ে মরল।

অথচ আজ পর্যন্ত বিচারটাও পেলাম না। আমি আরমান হত্যার বিচার চাই। প্রয়োজনে আমার জীবন দিয়ে হলেও খুনিদের বিচার চাই। বিচার দেখার জন্যই কষ্ট করে চট্টগ্রামে পড়ে আছি। ’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন আরমানের মা আছিয়া বেগম। নগরে মানুষের বাসায় ঝিয়ের কাজ করে সংসার চলে তাঁর।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপ হয় আছিয়া বেগমের। জানা গেল আরমানের বাবা ছিদ্দিক আহমদ কিশোরগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে গেছেন। সকালে অন্যের বাসায় কাজ সেরে নিজের বাসায় ফেরার পর কালের কণ্ঠ’র মুখোমুখি হন আছিয়া বেগম।

আছিয়া বেগম জানান, তাঁর চার সন্তান ছিল। এর মধ্যে দেড় বছর বয়সে বড় মেয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। এরপর এমরানের জন্ম। এমরান এখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তার ছোট ছিল আরমান। তাকে ভর্তি করা হয়েছিল মাদ্রাসায়।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৪ জুন সিআরবি এলাকায় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী যুবলীগের ক্যাডার হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমন গ্রুপের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয় আট বছরের আরমান হোসেন। যুবলীগ সদস্য সাজু পালিতও গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে মারা যান। শিশুসহ দুজন নিহতের ঘটনায় কোতোয়ালি থানার পুলিশ যুবলীগ-ছাত্রলীগ ক্যাডার এবং নেতাকর্মীসহ ৮৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে অনেকটা চাপের মুখে পুলিশ তালিকাভুক্ত ক্যাডার হেলাল আকবর বাবর এবং লিমনসহ বেশ কিছু আসামিকে গ্রেপ্তার করে। একই সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া দুই পক্ষের নেতা বাবর ও লিমনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়।

এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ সময়, এখনো আরমান হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়নি। মামলাটি পুনঃ তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আর এখনো বিচার না পেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে আরমানের পরিবার।

আছিয়া বেগম বলেন, ‘আরমানের বাবা আগে রিকশা চালাত। এখন রিকশাও চালাতে পারে না। এ কারণে আমি বাসায় বাসায় ঝিয়ের কাজ করছি। আরমানের বাবাও দিনমজুরি করে। ভাড়া বাসায় থাকি। সব মিলিয়ে মাসে প্রায় এক হাজার ৭০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আরমানের কোনো যোগসূত্র ছিল না। কোনো কারণ ছাড়াই ওরা আমার ছেলেকে গুলি করেছে। অথচ এখনো বিচার পেলাম না। ’

আছিয়া বেগম বলেন, ‘আরমান অন্যদের চেয়ে ভদ্র-শান্ত ছিল। পড়ালেখায়ও ভালো ছিল। গলা জড়িয়ে ধরে মা মা করে ডাকত। খিদে পেলেই আমার কাছে চলে আসত। ভাত খেতে চাইত। এখন তো আর আরমান ভাত চায় না। মা মা বলে ডাকেও না। আমার বুকের শূন্যতা কেউ বোঝে না। সারাক্ষণ ছেলেটার কথা মনে পড়ে। কোনোভাবেই ভুলতে পারি না। ঘুমের মধ্যেও মাঝেমধ্যে ওর মা ডাক শুনি। ’

অসহায় এই মা বলেন, ‘ছেলে হত্যার বিচার চেয়েছিলাম; কিন্তু মামলা হয়েছে সরকার বাদী হয়ে। এখন মামলার সর্বশেষ অবস্থাও জানি না। তবে বিচারের আশা ছাড়িনি। এখন দুই ছেলে আছে এমরান ও শান্ত। একজন চতুর্থ শ্রেণিতে, আরেকজন শিশু শ্রেণিতে পড়ে। খুনিদের বিচার দেখে যেতে চাই। তাই এত কষ্ট করেও এখানে পড়ে আছি। এখন আল্লাই আমাদের শেষ ভরসা। বুকের মানিককে যারা কেড়ে নিছে, তাদের ফাঁসি চাই। ’

পিবিআই চট্টগ্রামের পরিদর্শক আবু জাফর মো. ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে জানান, আদালতের নির্দেশে অধিকতর তদন্ত হয়েছে। শিগগিরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।


মন্তব্য