kalerkantho


বিচার শুরু হয়নি আসামিরাও জামিনে

মায়ের গর্ভে গুলিবিদ্ধ

শামীম খান, মাগুরা   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিচার শুরু হয়নি আসামিরাও জামিনে

মা নাজমা বেগমের কোলে শিশু সুরাইয়া। গর্ভে থাকতে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় শিশুটির একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়

পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মায়ের গর্ভে গুলির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল মেয়েটির। মরতে মরতে বেঁচে গেছে সে। বয়স এখন দেড় বছর। ডান চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ঝুঁকিতে আছে বাম চোখও। তবে ২০১৫ সালে সারা দেশে আলোড়ন তোলা সেই ঘটনার বিচার শুরু হয়নি আজও। অথচ ঘটনার প্রায় ছয় মাসের মধ্যেই মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। এরপর দুই দফায় পিছিয়েছে চার্জ গঠনের শুনানির তারিখ। ফলে শুরু হয়নি ৫৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণসহ অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম। মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামির সবাই জামিনে আছে। এলাকায় ফিরে তারা মামলার বাদী ও সাক্ষীদের হমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

২০১৫ সালের ২৩ জুলাই মাগুরা সদরের দোয়ারপাড়ে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষে নেতৃত্ব দেয় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ভূঁইয়া, যুবলীগের সদস্য আজিবর হোসেন, মাগুরা এজি একাডেমি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমএলএসএস ও আওয়ামী লীগ কর্মী আলী আকবর আলী। উভয় পক্ষের বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে পড়ে মমিন ভূঁইয়া নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ওই রাতেই মাগুরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম ও মিরাজ নামের আরেক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়। কামরুল ভূঁইয়ার বড় ভাইয়ের স্ত্রী নাজমার পেটে গুলি লাগে। ওই রাতেই মাগুরা সদর হাসপাতালে নাজমা বেগমের অস্ত্রোপচার হয় এবং তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। তবে মাতৃগর্ভেই গুলিবিদ্ধ শিশুটির জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতারে পাঠানো হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসরা তাকে চিকিৎসা দেন। ধীরে ধীরে শঙ্কামুক্ত হয় শিশুটির জীবন। তার নাম রাখা হয় সুরাইয়া। ওই বছরের ২০ আগস্ট সুরাইয়াকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন নাজমা বেগম।

মায়ের গর্ভে এভাবে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় হয়। ঘটনার পর অভিযুক্তরা গা ঢাকা দেয়। হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা শেখ আজিবর ও মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তারের জন্য রেড অ্যালার্ট জারি করে পুলিশ। ২০ আগস্ট রাতে নিজ বাড়ির অদূরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধ নিহত হয় আজিবর। আরেক আসামি আলী আকবর ১৬ সেপ্টেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করে। তার আগে ঢাকা থেকে ধরা পড়ে ১ নম্বর আসামি ছাত্রলীগ নেতা সেন সুমন। তবে বর্তমানে আসামিদের সবাই জামিনে আছে। আসামিদের মধ্যে আলী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

জানা যায়, সংঘর্ষের তিন দিন পর ২৬ জুলাই নিহত মোমিন ভূঁইয়ার ছেলে রুবেল ভূঁইয়া বাদী হয়ে মাগুরা সদর থানায় খুন ও মাতৃগর্ভে শিশু গুলিবিদ্ধের ঘটনায় ১৬ জনের নামে মামলা করেন। পরে গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তোতা, আয়নাল ও মুন্না নামে আরো তিনজনের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নাম-পরিচয় ভুলের কারণে রানা নামের এক আসামির নাম বাদ পড়ে। এ অবস্থায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর ১৭ আসামির নামে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। মামলায় নাজমা বেগমসহ ৫৮ জনকে সাক্ষী করা হয়। তাঁদের মধ্যে নাজমা বেগম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। 

যোগাযোগ করা হলে নাজমা বেগম বলেন, ‘এখন অপেক্ষায় আছি সুবিচারের। আমরা দোষীদের ফাঁসি চাই।’ তবে সুরাইয়ার বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া এবং মামলার বাদী রুবেল ভূঁইয়ার অভিযোগ, মামলার বিচারিক কাজে বিলম্ব করা হচ্ছে। সব আসামি জামিনে মুক্ত হওয়ায় তাঁরা উদ্বিগ্ন। তাঁরা বলেন, মামলা দায়েরের পর প্রায় দেড় বছর হয়ে গেল। চার্জ গঠনের শুনানির তারিখ দুই দফা পিছেয়েছে। যার কারণে বিচারিক কাজ শুরু হচ্ছে না। 

বাচ্চু ভূঁইয়া বলেন, ‘চার্জশিটভুক্ত সব আসামিই জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তাদের অনেকেই বাদী ও সাক্ষীদের হুমকি দিচ্ছে। এ কারণে আমরা এ মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইছি।’

মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ ফিরোজুর রহমান বলেন, মামলাটি বর্তমানে মাগুরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আফজাল হোসেনের আদালতে বিচারাধীন। মামলার চার্জ থেকে অব্যাহতি পেতে সেন সুমন, আয়নাল হোসেন ও তৈয়বুর রহমান আদালতে আবেদন জমা দিয়েছে। দুই দফা তারিখ পিছেয়ে আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি চার্জ গঠনের শুনানির পরবর্তী তারিখ নির্ধারিত হয়েছে।

কেমন আছে সুরাইয়া : সুরাইয়ার ডান চোখটি নষ্ট হয়ে গেছে, এ চোখের কারণে ঝুঁকিতে পড়বে বাম চোখও। এ চোখটি ভালো রাখতে হলে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর পর পরীক্ষা করতে হবে। গত বছরের মার্চে ঢাকার চিকিৎসকরা তার চোখ পরীক্ষা করে এ কথা জানান।

মেয়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন সুরাইয়ার মা-বাবা। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে গত বৃহস্পতিবার মা নাজমা বেগম বলেন, ‘শুধু চোখ নয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুরাইয়ার শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। এ কারণে আমরা বর্তমানে ঢাকায়।’

সুরাইয়ার বাবা বলেন, ‘আক্রান্ত হওয়ার পর এ পর্যন্ত এক লাখ ৮০ হাজার টাকার সহযোগিতা পেয়েছেন তাঁরা। সবই সুরাইয়ার পেছনে খরচ হয়েছে। মাঝে দেনাও হয়েছে। অর্থের অভাবে শহরের নতুনবাজারে থাকা চায়ের দোকানটি নতুন করে বরাদ্দ নিতে পারেননি। ফলে বর্তমানে একবারেই বেকার। সামনের দিনগুলো কিভাবে যাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।


মন্তব্য