kalerkantho


সুদ তলানিতে, তবু ব্যাংকে টাকা রাখা

বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা হারাচ্ছেন আমানতকারীরা

শেখ শাফায়াত হোসেন   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা হারাচ্ছেন আমানতকারীরা

আমানতের ওপর সুদ কমতে কমতে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। ব্যক্তি বিনিয়োগের আরেকটি প্রধান খাত পুঁজিবাজারও ওঠানামার মধ্যে রয়েছে।

তাই নগদ টাকার নিরাপত্তায় ব্যাংকেরই দ্বারস্থ সাধারণ মানুষ। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের লেনদেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ সঞ্চয়ের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানই প্রধান আস্থার জায়গা। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ব্যাংকে আসতে হচ্ছে সবাইকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে কার্যরত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ লাখ আট হাজার কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল আট লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। সেই হিসেবে এক বছরে আমানত বেড়েছে ১৩.১ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ সালেও আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩.১ শতাংশ। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে আমানত ছিল সাত লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসেবে আমানতের প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকলেও এই হার না বাড়ায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, গত দুই বছর একই হারে প্রবৃদ্ধি হলেও এই হার বাড়ছে না। এটা দুশ্চিন্তার বিষয়। তা ছাড়া ঋণের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে প্রায় ১৬ শতাংশ, যা আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। ঋণ বাড়লে ওই অর্থ বিনিয়োগ হয়ে আবার ব্যাংকিং চ্যানেলেই ফিরে আসত। এটাও আমানতের প্রবৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

ব্যাংকের হাতে ঋণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন করে আমানত নিতে উৎসাহ পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। এ কারণে ব্যাংকগুলো আমানত নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। এই ধারা শুরু হয়েছে ২০১৩ সাল থেকে। ওই বছরের জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের ওপর সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যেত। আমানতের গড় সুদহার ছিল ৮.৬১ শতাংশ। এরপর থেকে একটু একটু করে কমে গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৫.২২ শতাংশ। ২০১৩ সালের আমানতের গড় সুদহার ৮.৬১ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকলে গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত ৯ লাখ আট হাজার কোটি টাকা আমানতের ওপর সুদ পাওয়া যেত প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমান ৫.২২ শতাংশ গড় সুদহারে এ পরিমাণ আমানতের বিপরীতে আমানতকারীরা সুদ পেয়েছেন প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে ৩০ হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন আমানতকারীরা।

অন্য কথায় বিপুল অঙ্কের এ অর্থ বেঁচে গেল ব্যাংকগুলোর। কিন্তু ঋণের সুদহারে তার প্রতিফলন সামান্যই। ব্যাংকগুলোর ঘোষিত তালিকায় ঋণের গড় সুদহার ১১.৩৪ থেকে ৯.৯৩-এ নেমেছে দেখানো হলেও ভোক্তা ঋণসহ কিছু কিছু খাতে সুদ ১৪ শতাংশ বা তারও বেশি। যদিও আমানতের সুদ ৭ শতাংশের ওপরে নেই বললেই চলে।

এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুদহার ক্ষেত্রবিশেষে ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাচ্ছে উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, এতে করে সঞ্চয় প্রবণতা কমে যাচ্ছে এবং অপচয়মূলক ভোগ ও অন্যান্য অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে দায় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও মনে করছে সংস্থাটি।

এ পরিস্থিতিতে আমানতের সুদহারের নিম্নমুখিতা রোধের বিষয়ে সক্রিয় থাকার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত মঙ্গলবার এক সার্কুলার জারি করে ঋণের সুদহার নিম্নগামী ধারায় রাখার জন্য আমানত ও ঋণের মধ্যবর্তী ব্যবধান (স্প্রেড) সংকোচন করতে বলা হয় ব্যাংকগুলোকে। তবে এ ক্ষেত্রে ঋণের সুদ কম রাখার জন্য আমানতের সুদহার না কমিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়সহ ব্যবস্থাপনা দক্ষতার বিভিন্ন দিকে নজর দিয়ে স্প্রেড কমিয়ে আনতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এখন মেয়াদি আমানতের সুদহার মাত্র ৪.৫ শতাংশ, আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ৬ থেকে ৭ শতাংশ, যা নির্ভর করছে আমানতের মেয়াদের ওপর। এদিকে আমানতে কমলেও ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সুদ খুব একটা কমায়নি। সর্বনিম্ন সাড়ে ১১ এবং সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে তারা।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক অভিযোগ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বর্তমানে আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে নেমে গেছে। এই অবস্থায় ব্যাংকে টাকা রেখে লাভ হচ্ছে না। তাই অনেকেই টাকা তুলে নিচ্ছে।

অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বিনিয়োগ করছে সঞ্চয়পত্রে। এখানে সুদের হার এখনো ১১ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে সঞ্চয়পত্র কিনতে আসেন মো. ফারুক নামের এক গ্রাহক। তিনি জানান, বাবার পেনশনের টাকা ব্যাংকে রেখে এখন খুব একটা অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে আমানতের সুদের দুই গুণেরও বেশি মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। দুই দফায় ২০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন তিনি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) ড. মোজাফফর আহমেদ চেয়ার অধ্যাপক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, আমানতের সুদ মূল্যস্ফীতির ওপরে থাকাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেশি বলে বেশি হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অদক্ষতার কারণে স্প্রেড কমানো যাচ্ছে না। কিন্তু অনেক দেশ আছে যাদের স্প্রেড ২ শতাংশের নিচে। আমাদের এখানে ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ। এই দুটো বিষয়ে নজর দেওয়া গেলে আমানতের সুদহার বাড়ানো সম্ভব।

আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান কমিয়ে আনার বিষয়ে বেসরকারি ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকের স্প্রেড ২ শতাংশীয় মাত্রার নিচে। এ কারণে আমাদের মুনাফাও কমে গেছে। যেসব ব্যাংকের স্প্রেড বেশি তাদের স্প্রেড কমিয়ে আনতে হবে। ’

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ব্যাংকে আমানত রাখলে সুদ পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টাকা দিতে হয়। ওই সব দেশে শুধু নিরাপত্তার জন্যই গ্রাহকরা ব্যাংকে টাকা রাখেন।


মন্তব্য