kalerkantho

দলীয় সংঘাতের বলি নিরীহ মানুষ

নওশীন থেকে শিমুল

► রাজনৈতিক সহিংসতায় ২০১৪ সালে ১৪৭, ’১৫ সালে ১৫৩ এবং ’১৬ সালে ১৭৭ জন নিহত
► দায় নেয় না কেউ, প্রায় ক্ষেত্রেই বিচারহীনতা
► ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রভাবশালীদের চাপে আতঙ্কে থাকে
► রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর তাগিদ বিশিষ্টজনদের

এস এম আজাদ   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নওশীন থেকে শিমুল

২০০২ সালের ৯ মে। রাজধানী ঢাকার উত্তর বাড্ডা এলাকা। যুবদল ক্যাডাররা ওই এলাকার ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা চেয়ে না পেয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করে। এ সময় পাশে নজরুল ইসলামের কোলে থাকা ২০ মাস বয়সী শিশু মেরিয়ান ইসলাম নওশীনের মাথায় গুলি বিদ্ধ হয়। ছোট্ট শিশুটি বাবার সেই ‘নিরাপদ’ কোলেই চিরতরে নিথর হয়েছিল। এই মর্মস্পর্শী ঘটনা হয়তো এখনো মনে রেখেছে দেশবাসী। এর আরেক কারণ তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর এক বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ‘হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন। ’ এ বক্তব্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল তখন।

টাঙ্গাইলের দিনমজুর বাবার সন্তান আবু বকর সিদ্দিক পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে।

এফ রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন তিনি। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষ বাধে। হলের রুমে থাকা আবু বকরকে প্রতিপক্ষ ভেবে আঘাত করে বারান্দা দিয়ে ফেলা দেওয়া হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি মারা যান তিনি।

২০১৫ সালের ২৩ জুলাই মাগুরা শহরের দোয়ারপাড় এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে মোমিন ভুঁইয়া নামে আওয়ামী লীগের এক কর্মী গুলিতে নিহত এবং আট মাসের গর্ভবতী নাজমা বেগম পেটে গুলিবিদ্ধ হন। ওই দিন রাতেই মাগুরা সদর হাসপাতালে নাজমা বেগম চিকিৎসকদের জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাশিশুর জন্ম দেন। গুলিটি ওই শিশুর শরীরেও লেগেছিল।

গত ২ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের জের ধরে মেয়রের গুলিতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আবদুল হাকিম ওরফে শিমুল মারা যান।

রাজনৈতিক হানাহানিতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও যুব সংগঠনের নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ—এসব ঘটনাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, এসব সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে ৩০ শতাংশই সাধারণ মানুষ; যারা বিবদমান কোনো দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। রাস্তায় চলাফেরা, কর্তব্য পালন, এমনকি ঘরের ভেতরেও তারা জীবন দিয়েছে। বাড্ডার নওশীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু বকর বা শাহজাদপুরের শিমুলই শুধু নন—এমন করুণ মৃত্যুর শিকার হয়েছে শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ, নারী, এমনকি শিশুরাও। ‘ক্রসফায়ারে’ পড়ে এসব মৃত্যুর দায় কেউ নেয় না। বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। নেপথ্যে প্রভাবশালীরা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ভয়ে ঠিকমতো বিচারও চাইতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলো এসব মৃত্যুর ব্যাপারে প্রতিপক্ষকে দায়ী করা ছাড়া আর কোনো ভূমিকা কখনো রাখে না।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত এক মাসে রাজনৈতিক হানাহানিতে সাংবাদিক-পথচারীসহ নিহত হয়েছে পাঁচজন। নেতাদের আধিপত্য বিস্তার, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ রাজনৈতিক সহিংসতার ৯০৭টি ঘটনায় ২০১৬ সালে নিহত হয়েছে ১৭৭ জন। আহত হয়েছে ১১ হাজার ৪৬২ জন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংঘর্ষে মারা গেছে ১৪৩ জন। ২০১৫ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৫৩ এবং ২০১৪ সালে ১৪৭। পরিসংখ্যানে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা লেখা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ সাধারণ মানুষ; যারা ওই সব লড়াই-সংঘর্ষের সঙ্গে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট নয়।

মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন—রাজনৈতিক বিরোধ, প্রতিপক্ষকে হটানো, আধিপত্য বিস্তার, জমি দখল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, দরপত্র নিয়ে বিরোধের জের ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এসব ব্যাপারে নীরব ভূমিকা, ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রভাবশালীরা বেপরোয়া হয়ে হামলা চালায়, যার শিকার হয় সাধারণ মানুষ। এমন ঘটনা বন্ধে সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান চালানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

২০০২ সালের বাড্ডার সেই আলোচিত ঘটনার পর ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। গত সোমবার নওশীনদের মধ্য বাড্ডার জিপি-গ ১১১ নম্বর বাড়িতে গেলে তার স্বজনরা এই প্রতিবেদককে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। ওই সময় বিএনপির কর্মীদের গুলিতে নওশীনের মৃত্যু হয়েছিল। ক্ষমতাসীন দল ঘটনায় জড়িত থাকায় শিশু নওশীনের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছিল সে সময়। মামলার বাদীও হয়নি মানবিক বিপর্যয়ে পড়া সেই নিরপরাধ পরিবারটি। কিন্তু ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ায় একপর্যায় আসামিদের ধরতে বাধ্য হয় পুলিশ। অল্প সময়ে মামলার বিচারও হয়। চারজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। এদের মধ্যে একজন পলাতক, আর বাকিরা জেলে। ১৫ বছর ধরে সেই অমানবিক আঘাতের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে ওই পরিবার।

নওশীনের বাবা নজরুল ইসলাম এখন সৌদিপ্রবাসী। মা আছিয়া ইসলাম মেয়ের শোকে অসুস্থ হয়ে আছেন দীর্ঘদিন। নওশীনের দুই চাচা গোলাম কিবরিয়া বাবুল ও গোলাম মাশরুর শাহীন কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা এখনো নওশীনের মায়ের সামনে মেয়ের কোনো কথা তোলেন না। বাড়িতে তার জন্মদিন বা মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেন না। এই দুটি দিনে সবাই নীরবে কাঁদেন আর দোয়া করেন। ভাইবারে এই প্রতিবেদকের কথা হয় বাবা নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনের এমন কষ্ট আর যেন কারো না হয়। আমরা সাধারণ মানুষ, একটা ছোট্ট শিশু কেন এভাবে হারিয়ে যাবে? হানাহানিতে কেউ মারা গেছে শুনলে আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। আপনারা এখনো আমাদের মনে রেখেছেন, এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। ’ জানা গেছে, প্রভাবশালীদের চাপের মুখে মামলাটির বাদী পর্যন্ত হয়নি ওই পরিবার। হয়রানি এড়াতে আসামিদের শনাক্ত করতেও যায়নি তারা।

শিশু নওশীন হত্যার মতো এমন ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। এসব ঘটনাকে বলা হচ্ছে ‘ক্রসফায়ার’। সিংহভাগ ঘটনাই ঘটছে রাজনৈতিক সংঘাতে, যেখানে কোনোভাবে জড়িত থাকছে না ভুক্তভোগীরা। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি দলের দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের হানাহানিতে ঝরে গেছে বেশ কিছু তাজা প্রাণ। আহত হয়ে ধুঁকছে অনেক সাধারণ মানুষ। নওশীনের ঘটনায় কয়েকজন শাস্তি পেলেও বেশির ভাগ ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না অপরাধীদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া রহমান বলেন, মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতাসম্পন্ন ও উদার মানুষ রাজনীতিতে আসছে না। সুবিধাবাদী, পেশিশক্তি ও অশিক্ষিত লোকজন রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটছে। দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা বাড়ানো এবং প্রভাবমুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করলে এসব ঘটনা কমে আসবে। জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটে এমন ঘটনা এবং এর বিচার না হওয়া অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তোলে বলেও মনে করেন তিনি। আসকের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন কালের কণ্ঠকে বলেন, গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় সরকারি দলের মধ্যে অনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছে। তারা আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এসব সহিংসতায় হতাহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বিচার হচ্ছে না। ফলে হানাহানির ঘটনা বেড়েই চলছে। বেশি হানাহানি হওয়ায় তার শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেও। আইনের শাসন এবং সুস্থ ও আদর্শিক চর্চা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল মারা যান। নাতির মৃত্যুর খবর শুনে তাঁর নানি রোকেয়া বেগমও মারা যান। এ ঘটনায় রবিবার পৌরসভার মেয়র হালিমুল হক মিরুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জে এর আগেও রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিরপরাধ মানুষ নিহত হওয়ার নজির আছে। ২০১৩ সালে সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার জগাই মোড়ে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে ছাকমান হোসেন (৩৫) নামের এক পথচারী নিহত হন। এ ঘটনার দায় নেয়নি কেউ। পুলিশ বলছে, সংঘর্ষের সময় পালাতে গিয়ে পানিতে পড়ে ছাকমান মারা গেছেন।  

২০০২ সালের ৮ জুন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দরপত্র জমা নিয়ে ছাত্রদলের দুই পক্ষের গোলাগুলির সময় নিহত হন সাবেকুন্নাহার সনি নামের এক ছাত্রী। ছাত্রদলের ক্যাডার মুকি গ্রুপের গুলিতেই বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের ওই মেধাবী ছাত্রীর মৃত্যু হয়। এই মামলার বিচার হলেও জড়িত অনেকেই রেহাই পেয়েছে বলে সনির পরিবারের দাবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘাতে নিহত হন। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারির ওই ঘটনার পর মামলাটির তদন্ত শেষে এফ রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুকসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় শাহবাগ থানা পুলিশ। পরে বাদীর নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে সিআইডি মামলাটির অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর অভিযোগপত্র দেয়। তাতে আগের আটজনসহ আরো দুজনকে অভিযুক্ত করা হয়। আসামিদের সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তদন্তে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে আবু বকর মারা যান বলে জানানো হলেও সেই অস্ত্রটি কী, তা উল্লেখ করা হয়নি। ঘটনার কোনো আলামত রাখা হয়নি। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। উল্লেখ্য, আবু বকরের মৃত্যুর দুই মাস পর তাঁর দ্বিতীয় বর্ষের সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে জানা যায় তিনি প্রথম হয়েছিলেন।

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর খুলনা মহানগরীর দোলখোলা এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা জেড এ মাহমুদ ডনের ওপর প্রতিপক্ষের সদস্যরা হামলা চালায়। এতে ডন রক্ষা পেলেও শিপ্রা কুণ্ডু নামের এক পথচারী নারী নিহত হন। তিনি ওই সময় পূজার ফুল কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। এ ঘটনায় পুলিশ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পুলিশের দাবি, তারা হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে পেরেছে। এ হামলার কারণও উদ্ঘাটন করা গেছে। খুলনা সদর থানার ওসি শরিফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জের ধরেই আওয়ামী লীগ নেতা ডনের ওপর হামলা করা হয়। ’

গত বছরের ২৯ জুন রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে আবদুর রহমান নামে এক রিকশাচালক গুলিবিদ্ধ হন। চরবাজারের বাসিন্দা আবদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। কষ্ট করে সংসার চালাই। মাসের পর মাস হাসপাতালে পইড়া আছি। আমার কী অবস্থা, কেউ খোঁজ নেয়নি। তারা ক্ষমতাবান মানুষ। তাগো কী বিচার হইবো?’  স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন মিয়ার মদদে ঘটনাটি ঘটলেও তাঁরা রয়েছেন আড়ালে। চকবাজার থানার ওসি শামীমুর রশীদ বলেন, এ মামলার তদন্ত চলছে।

২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র রকিব আল ফারুক। তৎকালীন কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাকিবুল হাসান সুইন গ্রুপ ও উজ্জ্বল নামে আরেক ছাত্রলীগ নেতার গ্রুপের সংষর্ষে প্রাণ দিতে হয় সাধারণ ছাত্র ফারুককে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক এবং সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।

গত বছরের ৩১ মার্চ ঢাকার কেরানীগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শুভ কাজী নামের ১০ বছরের এক স্কুল ছাত্রের মৃত্যু হয়। সে উপজেলার হযরতপুর ইউনিয়নের মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল।

চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের (সিআরবি) টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ-যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে শিশু আরমান হোসেন টুটুুল (৮) নিহত হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৪ জুন। একইভাবে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাতকানিয়া পৌরসভা নির্বাচন চলাকালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাধারণ ভোটার নুরুল আমিন। চাঞ্চল্যকর এই দুই হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।

২০১৫ সালের ২৩ জুলাই মাগুরা শহরের দোয়ারপাড় এলাকায় মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিতে আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ নিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আট মাসের গর্ভবতী নাজমা বেগম পেটে গুলিবিদ্ধ হন। গুলির আঘাত লেগেছিল মায়ের পেটের ওই শিশুটির শরীরেও। ওই দিন রাতেই মাগুরা সদর হাসপাতালে নাজমা বেগম চিকিৎসকদের জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাশিশুর জন্ম দেন। দেশব্যাপী এ ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে ওই শিশুকন্যা সুরাইয়া ও মা নাজমা বেগমকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিশেষ তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়। তবে একটি চোখের দৃষ্টি হারায় মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ সুরাইয়া। এখনো শুরু হয়নি এই ঘটনার বিচার।

এসব বিষয়ে কথা হলে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল বলেন, সামগ্রিকভাবে আগের চেয়ে এ ধরনের পরিস্থিতির অনেক উত্তরণ ঘটেছে। দুই দশক আগেও রাজনৈতিক সংঘর্ষে যে পরিমাণ প্রাণহানি ঘটত সে তুলনায় এখন অনেক কম। এখন যেটুকু ঘটছে সেটুকু কমাতে হলে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে।

ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফজলুল করিম চৌধুরী আবেদ বলেন, ‘আট বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে। এ কারণে রাজনীতিতেও মনোপলি হয়েছে। বিরোধী দলকে রাজনীতি করতে দেওয়া হচ্ছে না। নিজেদের দলের লোকজন এখন নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সহিংস হয়ে উঠেছে। ’ তিনি দাবি করেন, ‘জনকল্যাণের জন্য রাজনীতি। অথচ এখন রাজনীতির কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা ছাড়া এ অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়। ’

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইউম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বচ্ছ রাজনীতির চর্চা না থাকায় এমন ঘটনা ঘটছে। সুবিচার বা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এটা নিশ্চিত করা গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এসব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অপরাধীরাও তখন ধরা পড়বে। ’

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন : খুলনা ব্যুারো প্রধান গৌরাঙ্গ নন্দী ও চট্টগ্রামের নিজস্ব প্রতিবেদক এস এম রানা]


মন্তব্য