kalerkantho


স্লোগান ধরতেই পুলিশ টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে

শাহাদাত হোসেন

আলম ফরাজী, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্লোগান ধরতেই পুলিশ টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে

কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে প্রতিবাদ সভা শেষে ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাস্তায় নেমে পড়েন তিনি। মিছিলে যোগ দিয়ে স্লোগান তোলেন ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’।

সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ তাঁকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর ওপর মানসিক পীড়ন চালানো হয়। ভাষা আন্দোলনে নেমে এমন নির্যাতনের শিকার শাহাদাত হোসেন তখন ছিলেন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের বিলরাউল গ্রামের সেই তরুণের বয়স এখন ৮৪ বছর।

শিক্ষাজীবন শেষে এলাকার বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। এখন তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করেন আঠারবাড়ী ইউনিয়নের আঠারবাড়ী গ্রামে। এখনো সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে রাখলেও বয়সের ভারে তিনি ন্যুব্জ। ভাষার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে কারাভোগ করলেও ঈশ্বরগঞ্জের নিভৃতচারী ভাষাসৈনিক শাহাদাত হোসেনের খোঁজ কেউ নেয় না। বর্তমানে অনেকটা অনাদরে আর অবহেলায়ই কাটছে তাঁর অবসর জীবন।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আঠারবাড়ী ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ির পাশে ভাষাসৈনিক শাহাদাত হোসেনের নিজ বাড়ি। সম্প্রতি আলাপকালে তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, ১৯৪৮ সালে উপজেলার জাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তাঁর প্রিয় শিক্ষক রাজেন্দ্র কিশোর ভৌমিক ও প্রগতিশীল স্থানীয় নেতা ভাষা আন্দোলনের বিষয়ে সচেতন করে তোলেন তাঁকে। বাংলা ভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই ১৯৫০ সালে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও মূল্যবোধ জন্ম নেয় তাঁর ভেতর। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কঠিন সময়ে নিজেকে মেলে ধরেন বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে। বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রাজপথে গুলিতে সালাম, রফিক, জব্বার ও শফিউরের মতো অনেকে শহীদ হন। এ খবর শুনে ওই দিন রাতেই গুরুদয়াল কলেজের ছাত্রনেতা আবু তাহের খান পাঠানের নেতৃত্বে রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন তাঁরা। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদদের স্মরণে শোকসভায় ছাত্র হত্যার নিন্দা জানানো হয় এবং হত্যার বিচার চেয়ে আলোচনা সভা হয়। এরপর আবারও বিশাল মিছিল বের করেন তাঁরা। মিছিলটি পুলিশের বাধার মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আবু তাহের খান পাঠান ও তাঁকে আটক করে কিশোরগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ভাষাসৈনিক শাহাদাত হোসেন আরো জানান, আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সারা রাত জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি তাঁদের ওপর পীড়ন চালানো হয়। পরে সকালে সম্মিলিত ছাত্র পরিষদের বিক্ষোভের মুখে তাঁদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। ছাড়া পেয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি আবু তাহের খান পাঠান ও তাঁর নেতৃত্বে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাঁদের নেতৃত্বেই সে সময় কিশোরগঞ্জ সদরে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে।

ভাষাসৈনিক শাহাদাত হোসেন বলেন, তাঁদের সঙ্গে সাধারণ ছাত্রছাত্রীসহ সর্বস্তরের মানুষ একত্র হয়ে আন্দোলনে যোগ দেয়। এদিকে ওই সময় তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী; অন্যদিকে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই দুইয়ের মাঝে তিনি বেছে নিলেন বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনকেই। ১৯৫২ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হলেও ভাষা রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি পাস করেন ১৯৫৪ সালে। পাস করার পর একই কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হন। ডিগ্রি পাস করেন ১৯৫৯ সালে। এরপর থেকে তিনি নেমে পড়েন জীবন সংগ্রামে।  

নিভৃতচারী এই ভাষাসৈনিক বলেন, শিক্ষা গ্রহণ শেষে শিক্ষকতার মতো মহান পেশা দিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। ১৯৫৯ সালে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার জাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৬৪ সালে আঠারবাড়ী মহিম চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে একই বিষয়ে শিক্ষকতা করে ১৯৯৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষকতা করার সময় তিনি নানা ‘সাংস্কৃতিক পরিষদ’ গঠন করেন। গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে বাংলা সংস্কৃতিচর্চা ও গণ আজাদী শিল্পীগোষ্ঠী তাঁকে ভাষাসৈনিক হিসেবে সংবর্ধনা দেয়।

এই ভাষাসৈনিক বর্তমানের ক্ষোভ-কষ্ট প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি তো এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসেছি। আমার সাথী যোদ্ধারা কেউ বেঁচে নেই। নিজের প্রচার আর করতে চাই না। ’ তবে জীবন সায়াহ্নে এসে সরকারিভাবে একটু স্বীকৃতি ও সম্মান প্রত্যাশা তিনি করতেই পারেন।


মন্তব্য