kalerkantho


প্রতিবেদন দিতে পাঁচ বছরে ৪৭ বার সময় প্রার্থনা

বিচার না পেয়ে স্বজনরা চরম হতাশ

এস এম আজাদ   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রতিবেদন দিতে পাঁচ বছরে ৪৭ বার সময় প্রার্থনা

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি। পুলিশের ব্যর্থতায় মামলার তদন্তভার র‌্যাবকে দেওয়া হলে তাতেও কোনো সুফল আসেনি।

বিভিন্ন সময়ে তদন্ত নানা দিকে ডালপালা ছড়ালেও ফল কার্যত শূন্যই রয়ে গেছে। র‌্যাব আদালতের কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে বারবার সময় প্রার্থনা করে আসছে। পাঁচ বছরে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এমন সময় দেওয়া হয়েছে ৪৭ বার। সর্বশেষ গত বুধবার নির্ধারিত তারিখে কোনো প্রতিবেদন দাখিল না করায় আগামী ২১ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন আদালত। ওই দিন তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হতেও নির্দেশ দেন আদালত। নথিপত্রে দেখা গেছে, অগ্রগতি প্রতিবেদনে ‘গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলছে’ বলে আদালতকে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।

দীর্ঘ পাঁচ বছরে মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় চরম হতাশায় রয়েছে সাগর-রুনির স্বজন ও সহকর্মীরা। তারা বলছে, ঘটনার কোনো কার্যকর তদন্তই হয়নি। প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে এই

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল সাগর-রুনি খুনের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এবারও এই দিনে বিচারের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবেন সাংবাদিকরা।

তদন্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘এই মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তকাজ এখনো চলছে। এর বাইরে আসলে কিছু বলার নেই। ’ তিনি আরো জানান, মামলায় আট আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনজন জামিনে রয়েছে। এরা হলো তানভীর রহমান, পলাশ রুদ্র পাল ও মিন্টু। তদন্তের ব্যাপারে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে।

আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনগুলোতে বলা হচ্ছে, ১৫৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলেও এখনো কোনো আসামিকে শনাক্ত করা যায়নি। এখন সন্দিগ্ধ আসামিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে তাদের নাম ও ঠিকানা যাচাই এবং পূর্ব ইতিহাস জানার জন্য নিজ নিজ থানা এলাকায় কয়েকজনের গতিবিধি, চালচলন গভীর ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, চুরি যাওয়া ল্যাপটপ পাওয়া যায়নি। মামলাটির তদন্তের বিষয়ে প্রতিনিয়ত বিশেষ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত তদারকি করে দিকনির্দেশনা প্রদান করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন পেশ করা হবে।  

এসব প্রতিবেদনে অগ্রগতির কিছুই নেই বলে মনে করছে নিহতদের স্বজনরা।

মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বলেন, ‘মামলাটির পাঁচ বছরেও কোনো কূল-কিনারা না হওয়ায় হতাশ আমাদের পরিবার। আমরা বিচারের আশায় পথ চেয়ে আছি। সরকারের কাছে আমাদের পরিবারের প্রশ্ন, তদন্ত শেষ করতে আর কত সময় লাগবে? আমরা কি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার পাব না?’ তিনি আরো বলেন, ‘সাগর-রুনি হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন করতে আর কত সময় লাগবে এ বিষয়ে র‌্যাব আমাদের কিছুই জানাচ্ছে না। আমরা চাই এ হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার। ’

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে অসুস্থ হয়ে কষ্টে বেঁচে আছেন সাগরের মা সালেহা মনির। তিনি বলেন, ‘বিচার চেয়ে আর কী হবে? আমি আর বিচার দেখে যেতে পারব না। খুনি কে তাও জানা হবে না? কী বলব আর...?’ এতটুকু বলেই বিলাপ করে কেঁদে ওঠেন সালেহা মনির।

সাগর-রুনি খুনের সময় পাঁচ বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ ওই বাসায় ছিল। সেই মেঘের বয়স এখন সাড়ে ১০ বছর। রাজধানীর ইন্দিরা রোডে মামার সঙ্গে থাকছে সে। পড়ছে চতুর্থ শ্রেণিতে। স্বজনরা জানায়, চিকিৎসকের পরামর্শে তারা মেঘকে মা-বাবার স্মৃতি আঁকড়ে থাকতে দেয় না কখনোই। সে স্বাভাবিকভাবে অন্য শিশুদের মতোই বেড়ে উঠছে। তবে মাঝেমধ্যেই মা-বাবার কথা মনে করে চুপসে যায়। মেঘ বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চায়। মা-বাবার কথা জানতে চাইলে বলে, ‘মামণিকে মিস করি। আব্বুকে মিস করি। ’

তদন্ত ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৪৪ বার অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের জন্য সময় আবেদন করেন র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা। প্রতিটি প্রতিবেদনেই তিনি ‘গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলছে’ বলে উল্লেখ করেন। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দাখিল করা প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার থেকে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টগুলো সমপ্রতি পাওয়া গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট ও অপরাধচিত্রের প্রতিবেদন (ক্রাইম সিন রিপোর্ট) পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দুজন পুরুষের ডিএনএর পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে সেই নমুনা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলাটি অত্যন্ত আলোচিত, স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। তাই অতি সতর্কতার সঙ্গে গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলছে। তদন্ত কার্যক্রম শেষে তদন্তের ফলের ওপর ভিত্তি করে যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন পেশ করা হবে। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে অবহিত করে বলেন, ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজন, নিহতদের স্বজন, সহকর্মীসহ ১৫৮ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করে পর্যালোচনা করছে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদের তালিকায় ২৭ জন সাংবাদিকও আছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত আট আসামি, নিহত দুজন এবং স্বজন মিলিয়ে মোট ২১ জনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল।

সূত্র জানায়, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্তে নেমে খেই হারিয়ে ফেলে। ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল আদালতে তদন্তে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে তারা। এরপর আদালতের নির্দেশে র‌্যাবের কাছে তদন্তভার স্থানান্তর করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর ওই বছরের ২৬ এপ্রিল ভিসেরা আলামতের জন্য সাগর-রুনির লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে র‌্যাব। সেই ভিসেরা পরীক্ষায় নিহতদের শরীরে বিষক্রিয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে মামলার আলামতের নমুনা পাঠানো হয় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য।

এই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আটজনের মধ্যে পাঁচজন রফিকুল, বকুল, সাইদ, মিন্টু ও কামরুল হাসান ওরফে অরুণ মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণচন্দ্র রায় হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত। গ্রেপ্তার দেখানো হয় পারিবারিক বন্ধু তানভীর এবং বাসার নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল ও হুমায়ূন কবীরকে। এদের মধ্যে তানভীর, মিন্টু ও পলাশ হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। অন্যরা কারাগারে আছে।

পুলিশের পর র‌্যাবে মামলার তদন্তভার গেলে র‌্যাবও তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে। এক বছর আগে জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার ওয়ারেস আলী মিয়ার কাছ থেকে সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহম্মেদের কাছে তদন্তভার হস্তান্তর করা হয়। তিনিও বেশ কয়েকবার আগ্রগতি প্রতিবেদন দিয়েছেন। গত বুধবার নির্ধারিত তারিখে কোনো অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল না করায় আগামী ২১ মার্চ আদালতে হাজির হয়ে মহিউদ্দিন আহম্মেদকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম মো. মাজহারুল ইসলামের আদালত। জানতে চাইলে সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহম্মেদ  বলেন, ‘সাগর-রুনি হত্যা মামলাটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্ত করছি। মামলাটির তদন্ত কবে শেষ হবে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছুই বলা যাচ্ছে না। ’

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) কার্যালয়ে কল্যাণ সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘মামলার তদন্তের অগ্রগতি এই মুহূর্তে কতটুকু তা আমার জানা নেই। প্রথমে পুলিশ তদন্তকাজ করেছে। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে এখন র‌্যাব মামলাটি তদন্ত করছে। ’ মন্ত্রী আরো বলেন, সাগর-রুনিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তাঁরা দুজনই আমার নির্বাচনী এলাকায় থাকতেন। আমি আশাবাদী, র‌্যাব সঠিক রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবে এবং আপনারা (সাংবাদিকরা) তা জানতে পারবেন। ’

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির লাশ।


মন্তব্য