kalerkantho


ধর্মঘট করেছি পুলিশের হাতে নিগৃহীত হয়েছি

বিমল রায় চৌধুরী

ফখরে আলম, যশোর   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ধর্মঘট করেছি পুলিশের হাতে নিগৃহীত হয়েছি

‘বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল দেশভাগের পরই। যশোর এমএম কলেজের ছাত্রী হামিদা রহমান ১৯৪৭ সালে প্রথম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পত্রিকায় চিঠি লিখেছিলেন।

আমরা যশোরের ছাত্র-জনতা বাংলা ভাষার জন্য ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ধর্মঘট করেছি। পুলিশের হাতে নিগৃহীত হয়েছি। রাজনৈতিক ইতিহাসে যশোরের ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল একটি সফল আন্দোলন। ’ যশোরের ভাষাসৈনিক বিমল রায় চৌধুরী জানালেন এসব কথা।

এই ভাষাসংগ্রামীর জন্ম যশোর শহরতলির বিরামপুরে। ভাষা আন্দোলনের সময় তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর। ১৯৪৮ সালে ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হন। ১৯৬৬ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

স্থানীয় নওয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে তিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত টানা ২৫ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন বয়স ৯৩, থাকেন শহরের বেজপাড়া এলাকায়।

বিমল রায় চৌধুরী বলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’—১৯৪৮ সালের মার্চে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এ ঘোষণার পরদিন থেকেই আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল-মিটিং শুরু করি। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে যশোরে আমরা ছাত্র ধর্মঘট করি। আমাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ আমাদের লাঠিপেটা করে, গুলিও চালায়। ভাষার দাবিতে আন্দোলনে সম্ভবত যশোরেই প্রথম পুলিশ গুলি চালায়।

বিমল রায়ের ভাষ্য মতে, ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘আজাদ’ পত্রিকায় বাংলা ভাষাবিরোধী একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। এর প্রতিবাদে যশোর এমএম কলেজের তত্কালীন ছাত্রী হামিদা রহমান (গুপি আপা) বাংলা ভাষার দাবিতে একটি চিঠি লেখেন। ১০ জুলাই কলকাতার ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা’ শিরোনামে চিঠিটি ছাপা হয়। গুপি আপা শুধু চিঠিই লেখেননি, তিনি আমাদের সঙ্গে রাজপথের কর্মসূচিতেও ছিলেন।

স্মৃতিচারণা করে এই ভাষাসংগ্রামী কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলা ভাষার দাবিতে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে যশোরের ছাত্রনেতাদের একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়। ওই বিবৃতিতে সই করেন ডা. জীবন রতন ধর, মশিয়ূর রহমান, আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার সিদ্দিকী, হামিদা খাতুন, অনন্ত মিত্র, জালাল আহমদ, ইমান আলী, নাজিমউদ্দিন, হায়বাত উল্লাহ জোয়ারদারসহ আরো কয়েকজন। এরপর আমরা অনেকগুলো সভা করেছি। ২৬ ফেব্রুয়ারি শহরের চুড়িপট্টি এলাকার আলমগীর সিদ্দিকীর বাসায় জরুরি সভা বসে। সেখানে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ১৫-২০ জন ছাত্রনেতা উপস্থিত ছিলেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি কলেজে আয়োজিত ছাত্র সমাবেশ থেকে গঠন করা হয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এর যুগ্ম আহ্বায়ক হন আলমগীর সিদ্দিকী ও হামিদা রহমান। সভাপতি ছিলেন ডা. জীবন রতন ধর। সদস্য ছিলেন আফসার আহমেদ সিদ্দিকী, কাজী আব্দুর রাকীব, আব্দুল হক, সৈয়দ আফজাল হোসেন, হায়বাত উল্লাহ জোয়ারদার, শেখ আমান উল্লাহ, সুধীর রায় প্রমুখ। এর পর আমরা ২ মার্চ কলেজে পূর্ণ ছাত্র ধর্মঘট পালন করে মিছিল বের করি। জিলা স্কুল থেকে ছাত্রদের বের করে আনি। ১১ মার্চ পূর্ববঙ্গে ঢাকার রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ ধর্মঘট আহ্বান করলে আমরাও ওই দিন যশোরে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিই। ১০ মার্চ পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে। ১১ মার্চ আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করি। শত শত মানুষ মিছিলে যোগ দেয়। পুলিশ আমাদের ২০ সহযোদ্ধাকে আটক করে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অ্যাডভোকেট মশিয়ূর রহমান, সৈয়দ আফজাল হোসেন, এইচ এম জিন্নাহ, ইমান আলী, রণজিৎ মিত্র, কাজী আব্দুর রাকীব, অনন্ত মিত্র, পবিত্র কুমার ধর, ববি কুমার সাহা, লুত্ফর রহমান, হাবিবুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, গোলাম মোর্তুজা, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন আমরা ছাত্র ধর্মঘট পালন করি। ১৩ মার্চ সকালে আমরা ফের মিছিল বের করি। বিশাল সেই ছাত্র-জনতার মিছিল নিয়ে আমরা কালেক্টরেট অফিস ঘেরাওয়ের জন্য এগোতে থাকি। এসডিও কোর্টের সামনে পৌঁছলে আমাদের কেউ কেউ পুলিশের উদ্দেশে ইট মারা শুরু করে। ইটের আঘাতে শহর কোতোয়াল ফাম উদ্দিনের মাথা ফেটে যায়। একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার একাংশ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট নোমানীর অফিস ভাঙচুর  করে। এ সময় পুলিশ লাঠিপেটার পাশাপাশি কয়েকটি গুলি করে। কয়েকজন ছাত্রকে তারা আটক করে। শতাধিক ছাত্র-জনতা আহত হয়। তাদের মধ্যে আলমগীর সিদ্দিকীও ছিলেন। থানায় অবাঙালি সিপাহিরা আটক ব্যক্তিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। গুলিবর্ষণ ও নেতাকর্মীদের আটকের প্রতিবাদে ১৪ মার্চ শহরে হরতাল পালিত হয়। ১৮ মার্চ পালিত হয় বন্দি মুক্তি দিবস। যশোরের খবর ঢাকায় পৌঁছে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক ছাত্র এসে আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দেন। আইনজীবী অনিল চট্টোপাধ্যায় বন্দিদের জামিনের চেষ্টা চালান। তবে বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়নি। এরপর ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ টেলিগ্রামের মাধ্যমে যশোরের ঘটনা মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনকে জানায়। ২৪ মার্চ আইন পরিষদে যশোরের ভাষার জন্য আন্দোলনের ঘটনাটি আলোচিত হয়। পরে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিতে বন্দিরা মুক্তি পায়।


মন্তব্য