kalerkantho


১২ অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী
► হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি ৭ মার্চ
► এভাবে বিচার বিভাগ চলতে পারে না : আপিল বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



১২ অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে দিয়ে করা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের শুনানি আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। আদালত বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে শুনানি মুলতবি করা হলো।

৭ মার্চ আবার শুনানি হবে।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ গতকাল বুধবার এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের করা আট সপ্তাহের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মার্চ শুনানির দিন ধার্য করা হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। রিট আবেদনকারীপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।

আপিলের ওপর এই শুনানিতে আদালতকে সহযোগিতার জন্য সুপ্রিম কোর্টের ১২ জন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালত বন্ধু) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে সব পক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত বক্তব্য দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অ্যামিকাস কিউরিরা হলেন সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া, ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, এ এফ হাসান আরিফ, এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি ও অ্যাডভোকেট এম আই ফারুকী।

গতকাল শুনানিতে আদালত বলেছেন, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের শৃঙ্খলার বিষয়ে কোনো আইন নেই।

একটি দেশে বিচার বিভাগ এভাবে থাকবে? আপনারা (অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে) বিচার বিভাগকে এভাবে ফেলে রেখেছেন। এভাবে বিচার বিভাগ চলতে পারে না।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ বলে হাইকোর্টের দেওয়া রায় প্রকাশের পর তা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য রিট আবেদনকারীপক্ষে গত বছর ২৮ নভেম্বর আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। আপিল বিভাগে ওই আবেদনের ওপর ৫ জানুয়ারি শুনানির দিন ছিল। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষ চার সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করে। আদালত ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন। এ অবস্থায় গতকাল নির্ধারিত দিনে রাষ্ট্রপক্ষ আবারও সময়ের আবেদন করে।

গতকাল শুনানির শুরুতেই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, হাইকোর্টের রায় অনেক বড়। মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে অনেক আইনি বিষয় জড়িত। তাই শুনানির প্রস্তুতির জন্য আট সপ্তাহ সময় প্রয়োজন।

আদালত বলেন, ‘দেশের বিচার বিভাগের জন্য আইন থাকবে না? আইন করার জন্য আপনারাই তো অস্থির হয়ে গেলেন। এখন আবার পিছনে চলে যাচ্ছেন, সময় চাচ্ছেন। আপনারা কি ২০১৭ পার করতে চান?’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতির জন্য সময় দরকার। ’

এ পর্যায়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, উচ্চ আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তির কোনো আইন নেই। তাই এটা তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

এ সময় আদালত বলেন, ‘আমরা এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছি। আমরা এটি বেশি দিন শুনব না। লিখিতভাবে যুক্তিতর্ক দাখিল করতে হবে। ’ জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আট সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। আদালত বলেন, দুই মাস সময় চাইলেন। কেন চাইলেন, তা বলবেন না? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘প্রস্তুতির জন্য সময় দরকার। এক সপ্তাহে হবে না। ’

আদালত বলেন, ‘হাইকোর্টে আপনারা শুনানি করেছেন। সব আপনার জানা। তাই আপনি লিখিতভাবে যুক্তিতর্ক দাখিল করবেন। আপনারা (উভয় পক্ষ) এক ঘণ্টা করে শুনানি করবেন। আর আমরা অ্যামিকাস কিউরির বক্তব্য শুনব। ১২ জন সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছি। তাঁরাও লিখিতভাবে তাঁদের বক্তব্য দাখিল করবেন। তাঁদের বক্তব্য ১০ মিনিট করে শুনব। ’

এ পর্যায়ে আদালত ২৭ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘আমি আট সপ্তাহ সময় চেয়েছি। আর আপনারা দিচ্ছেন দুই সপ্তাহ। ’

আদালত বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষে কোনো কিছু আটকে থাকে না। আপনারা হাইকোর্টে বিস্তারিত শুনানি করেছেন। আপনি সব জানেন। আপনি অনেক বড়মাপের আইনজীবী। সরকারের আস্থাভাজন। আট বছর ধরে এ পদে আছেন। আমাদের কোনো সমস্যা হলে আমরাও আপনাকে ডাকি। আপনার ওপর আস্থা রয়েছে। আপনি যুদ্ধাপরাধের মামলা, জমিজমা-সংক্রান্ত মামলা, ডেথ রেফারেন্স, সাংবিধানিক মামলা—সবই করেন। আপনি একজন দক্ষ আইনজীবী। ’ এরপর আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য ৭ মার্চ দিন ধার্য করে আদেশ দেন।

গতকাল আদালত থেকে বেরিয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের বিষয়ে একটা আইন পাস করে সরকার। এর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের একটি পদ্ধতি দিয়েছে। কিন্তু হাইকোর্ট সেটা বাতিল করেছেন। মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল। এর সঙ্গে আইনগত বিষয় জড়িত রয়েছে। এ কারণে আট সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করি। আদালত ৭ মার্চ পরবর্তী দিন ধার্য করে ওই দিন পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেছেন। ’

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে প্রণীত মূল সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পণ করা হয়। পরে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে। আপিল বিভাগের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যবস্থা রেখে দেওয়া হয়। পরে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পুনরায় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস করা হয়। এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৯ আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। গত বছর ৫ মে হাইকোর্ট ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ বলে রায় দেন।


মন্তব্য