kalerkantho


ইসি নিয়ে কৌশলগত অবস্থান

‘সহায়ক সরকারে’ গুরুত্ব বিএনপির

এনাম আবেদীন   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘সহায়ক সরকারে’ গুরুত্ব বিএনপির

নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন নিয়ে ক্ষোভ, অসন্তোষ, হতাশা থাকলেও এখনই এ ইস্যুতে কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না বিএনপি। বরং কিছুটা ‘কৌশলগত’ অবস্থানে থেকে দলটি সরকার ও ইসিকে চাপে রাখতে চায়। বিশেষ করে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি পৌর নির্বাচন এবং ৬ মার্চ তিনটি উপজেলা নির্বাচন দেখে নতুন কমিশনকে মূল্যায়ন করতে চায় দলটি। পাশাপাশি বিএনপি দিতে চায় নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকারের’ প্রস্তাব, যা নিয়ে দলটির থিংকট্যাংকের পাশাপাশি শীর্ষ নেতারাও  কাজ করছেন।

বিএনপি নেতাদের ধারণা হলো, সহায়ক সরকারের প্রস্তাবনার কিছুটাও যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে নির্বাচনের আগে ‘মাঠে’র পরিস্থিতি তাঁদের অনুকূলে যাবে। নেতাদের বিশ্বাস, তাঁদের পক্ষে জনগণের ব্যাপক সমর্থন এখনো আছে।

সদ্য পুনর্গঠিত ইসি বিএনপি যেমন গ্রহণ করেনি, তেমনি প্রত্যাখ্যানও করেনি; এটাই হলো দলটির কৌশলগত অবস্থান। বিএনপি নেতারা কালের কণ্ঠকে বলেন, ইসি প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান ‘প্রশ্নবোধক’ রাখা হয়েছে ইচ্ছা করেই। কারণ এ ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করার সময় এখনো আসেনি। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা কী থাকে তার ওপরই মূলত নির্ভর করছে বিএনপির নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি। নির্ভর করছে বিএনপির পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকৌশলও; যোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার নিজ পক্ষের ছোট দলগুলোকে দিয়ে কমিশন গঠনের জন্য নাম পাঠিয়েছে। তাদের এ কৌশল আমাদের অজানা নয়, যে কারণে আমরা নতুন ইসিকে গ্রহণ করিনি। তবে চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি আসবে তাদের (ইসি) পরবর্তী ভূমিকা দেখে। ’ তিনি আরো বলেন, কাজের মধ্য দিয়ে আস্থা অর্জন করলে তাদের স্বাগত জানানো হবে। আর সরকারের ‘রিমোট কন্ট্রোল’ হিসেবে কাজ করলে জনগণই তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত তারা কী করে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতির আলোকেই বিএনপি কর্মকৌশল ঠিক করবে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার ওপর আগামী দিনের পুরো রাজনীতি নির্ভর করছে। স্থায়ী কমিটির আরেক প্রবীণ সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতে, নির্বাচনের সময় দলীয় সরকার থাকলে বর্তমান কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। ফলে ওই সময় কোন ধরনের সরকার থাকবে তার ওপরই মূলত নির্বাচন কমিশনের সফলতা নির্ভর করবে। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত সহায়ক সরকার নিয়ে কাজ চলছে।     

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুনর্গঠিত ইসি দেখে আমরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। তার পরও কিছুদিন দেখব তাদের ভূমিকা। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নেব। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সহায়ক সরকারের প্রস্তাব আমরা যথাসময়ে জাতির সামনে উপস্থাপন করব। এ নিয়ে কাজ চলছে। ’

প্রসঙ্গত, ইসি পুনর্গঠন নিয়ে ১৩ দফা সুপারিশসংবলিত প্রস্তাবনা গত ১৮ নভেম্বর জাতির সামনে উপস্থাপন করেন খালেদা জিয়া। ওই দিন তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেশবাসীর সামনে যথাসময়ে উপস্থাপন করা হবে।

এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে অটল থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও এই প্রথম দলটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি সামনে নিয়ে এসেছে।

জানা যায়, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা করেই দলটির ওই অবস্থান নির্ধারণ করেন খালেদা জিয়া। কারণ বিএনপি সমর্থক সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি শুভানুধ্যায়ীরাও মতামত দেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটানো আর সম্ভব নয়। ফলে ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় ফিরে আসার পাশাপাশি এমন একটি প্রস্তাবনা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়, যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

সূত্র মতে, বিএনপি ও এর বাইরে এমন আলোচনার পরই গত বছর ১৯ মার্চ দলটির জাতীয় কাউন্সিলে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ঐকমত্যের রাজনীতির কথা বলেন খালেদা। পাশাপাশি ইসি পুনর্গঠন ও সহায়ক সরকারের প্রস্তাবনা তৈরির কাজ শুরু হয়।

জানা গেছে, সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সহায়ক সরকারের একাধিক প্রস্তাবনা দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হওয়ার বিধান রয়েছে। বিএনপি এখন বর্তমান সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরেই নির্বাচন চায়। কারণ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর সরকার সাধারণত কিছুটা দুর্বল অবস্থায় থাকে বলে মনে করা হয়।

সংবিধানে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে এবং পরে দুই ভাবেই নির্বাচন হওয়ার সুযোগ আছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮১-এর (৩) এ বলা হয়েছে, ‘মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। ’

একই অনুচ্ছেদের (৪)-এ বলা হয়েছে, ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদের কোনো সদস্য পদ শূন্য হইলে পদটি শূন্য হইবার ৯০ দিনের মধ্যে উক্ত শূন্য পদ পূর্ণ করিবার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। ’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সহায়ক সরকারের প্রস্তাবনা তৈরিতে বিএনপির আইনজীবী নেতারা সংশ্লিষ্ট এই অনুচ্ছেদ নিয়েই কাজ করছেন এবং তৈরি করছেন একাধিক প্রস্তাবনা বা ফর্মুলা।


মন্তব্য